১৯ আগস্ট ২০১৯

বাংলাদেশের নিরাপত্তা ভাবনা ও প্রিয়া সাহার নালিশ!

বাংলাদেশের নিরাপত্তা ভাবনা ও প্রিয়ার সাহার নালিশ! - সংগৃহীত

সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের নাম বারবার উঠে আসছে। প্রথমে রোহিঙ্গা সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের মানচিত্র পরিবর্তন করে আরাকানকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করতে মার্কিন কংগ্রেসের এশিয়া প্রশান্ত-মহাসাগরীয় উপকমিটির চেয়ারম্যান ব্রাড শেরম্যানের মন্তব্য। এরপর প্রথানমন্ত্রীর চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়াটা টপ অব দ্য কান্টিতে পরিণত হয়। এদিকে ১৬ জুলাই মার্টিন পররাষ্ট্রনীতিতে সংখ্যালঘুবিষয়ক আলোচনায় প্রিয়া সাহার বক্তব্য বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে ব্যাপক ভাবে ভাবিতে তুলেছে।সেখানে বাংলাদেশ থেকে ৩ কোটি৭০ লাখ সংখ্যালঘুরা ‘নাই’ হয়ে যাওয়াসহ অসংখ্য নির্যাতনের কথা বলেন। এ ধরণের হামলা সব আমলেই রাজনৈতিক শেল্টারে হয় বলে মন্তব্য করেন এবং তাদেরকে রক্ষা করার জন্য মার্কিন সহায়তা কামনা করেন। এ বিষয়ের সত্যতা ও বাস্তবতা বাংলাদেশের সকল সচেতন মানুষের জানা থাকার কথা।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের পুরো আলোচনাটি সুক্ষ্মভাবে অনুধান ও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,এখানে যারা এসেছে সবাই ছিলো সংখ্যালঘু শরণার্থী। যাহারা নিজ দেশে আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় হয়রানির শিকার। পরিচয়ের শুরুতেই অধিকাংশ প্রতিনিধি নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে সরাসরি ‘রিফিউজি’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রিয়া সাহাই শুধু কোনো শরণার্থী ছিলেন না।তিনি সরাসরি বাংলাদেশ থেকে গিয়েই ‘আই অ্যাম কাম ফ্রম বাংলাদেশ’ বলে শুরু করেই সরাসরি বাংলাদেশ নামক স্টেট’কে দোষারোপ করেছেন। আরেকটা বিষয় হলো যারা নিয়মিত বিশ্ব রাজনীতির খবর রাখেন তারাও জানেন যে ওই আলোচনায় যেসব প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছে।

বিশেষ করে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, চীনের উইঘুর, পাকিস্তানের আহমেদিয়া মুসলমান, উত্তর কোরিয়া ও কিউবায় নন-কমিউনিস্ট, ইরানি খ্রিষ্টান, ইরাকে আইএস ও তুরস্কে কুর্দিরা আসলেই নির্যাতিত হচ্ছেন। ওই অঞ্চলগুলোতে এখনো যে হামলা-সহিংসতা চলতে তা গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে সকলেই জানে। এখনো প্রতিদিন উইঘুরদের কনসেন্টেশন ক্যাম্পে আটক রাখা হচ্ছে,রোহিঙ্গা গণহত্যা, মধ্যপ্রাচ্যে আইএস ও কুর্দি সমস্যা বিরাজ করছে। উত্তর কোরিয়ায় মানুষকে উনের ইশারায় যখন যা ইচ্ছা তাই করা হচ্ছে।

সমসাময়িক বিশ্বে-সংঘাত ও আঞ্চলিক সহিংসতার সাথে ভিড়িওটি বিশ্লেষণ করলে সহজেই দেখতে পাবেন, ‘একমাত্র বাংলাদেশের প্রিয়া সরকার যে অভিযোগ করছে এ সমস্যাটি এ মুহূর্তে বাংলাদেশের কোথাও চলমান বা বিরাজনমান নয়।সর্বশেষ বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উপর দৃশ্যমান হামলা হয়েছে বি বাড়িযার নাসির নগরে।তারপরে কোনো বড় ঘটনা ঘটেছে? তার মানে একটা বিষয় স্পষ্ট যে একমাত্র বাংলাদেশি প্রিয়া সরকারই দেশের ‘শান্তিকালীন সময়ে’(In peacetime) এমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্য করেছে।

সাক্ষাৎকারে আরেকটা বিষয় অনেকে খেয়াল করে থাকবেন, সে আলোচনায় সারাবিশ্বে মার্কিন মিত্রদেশগুলোর হয়রানির বিপক্ষে বলার মতো কোন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।যেমন সৌদি জোটের হামলা ইয়েমেনে দূর্ভিক্ষকবলিত মানুষের পক্ষের কোনো প্রতিনিধি ছিলো না। ইসরাইলি দখলদারিত্বে সর্বস্ব হারানো কোনো ফিলিস্তিনি উপস্থিত ছিলো না।এমনকি ভারতে জয়শ্রীরাম বলানো,তাবরিজ হত্যাসহ মুসলিম সংখ্যালঘুরা আরএস অনুসারীদের হাতে নির্যাতিত-হত্যা হওয়ার পরেও ভারতের পরিস্থিতি তুলে ধরার মতো কাউকে দেখা যায়নি। অথচ অমর্ত্য সেনের মতো সর্বজনশ্রদ্ধেয়রাও সংখ্যালঘুদের হয়রানির সত্য কথা বলে আরএসএস তোপ থেকে মুক্তি পায়নি।আমার কাছে এ আলোচনায় ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ভারতের প্রতিনিধি না রাখা বিষয়টি দূরভিসন্ধিমূলক ও কৌশলগত বিষয় বলে মনে হয়েছে।

তবে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি স্থাপন ও মৌলবাদ দমনের বিষয়টি প্রশংসিত হয়ে আসছে।অনেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির জন্য বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার আইড়লও মনে করছে। এ ঘটনার পরে বাংলাদেশের মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিলারও এ বক্তব্যকে অসত্য ও অতিরঞ্জিত বলেছে। সরকার থেকেও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।বলা হয়ে থাকে আওয়ামীলীগ সরকার বরাবরই প্রো-মাইনোরিটি অর্থাৎ সংখ্যালঘুবান্ধব।এসময়ে এসে অতিরঞ্জিত মিথ্যাচার কেন সেটিও ভাবার বিষয়।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটা বড় দুর্বলতা হলো একদল অন্য দলের ষড়যন্ত্র দেখে,তবে কৌশলগত কারণে কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতির কারণে বৈদেশিক শক্তির ষড়যন্ত্রও যে ভয়াবহ রমক থাকতে পারে তা নিতান্ত কমই ভাবা হয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।এখানে কোন বৈদেশিক হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।সাম্প্রদায়িকতার কিছু উপাদান তো আছেই,এখানে অস্বীকার করার কিছু নাই।এটা দক্ষিণ এশিয়ার কমন সিনারিও।সব কিছুর জন্য,নালিশ দেয়ার জন্য বাংলাদেশের আইন আদালত আছে।আর কোন অঞ্চলে বা রাষ্ট্রে কোন সহিংসতার বিষয় থাকলে বিষয়টি জাতিসংঘ বা মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন ও বিবৃতি থাকে।

বিবেচনার বিষয় হলো,তবে কেন এসবকে তোয়াক্কা না করে প্রিয়া সাহা দেশের ‘শান্তিকালীন সময়ে’ মার্কিনীদের কাছে দ্বারস্থ হলেন?কেন,কোন ইন্দনে গেলেন?কারণ দুনিয়াতে এখনও কোন বিশ্ব সরকার(Global government)ও গঠন হয়নি যে,একটি স্বার্ধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নামে সো-কল্ড সাম্প্রদায়িকতার বিচার দেয়া যায়?হ্যাঁ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কিছু তাত্ত্বিক ‘ওয়ার্ল্ড ফেড়ারালিমজ’নামে বিশ্ব সরকারের কথা বলে?যা এখন বাস্তবায়ন যোগ্য নয়,আমার কাছে কাল্পনিকই মনে হয়। তো রাষ্ট্রের উপর যেহেতু এখনও পৃথিবীতে কোন ‘সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ’(Suprime authority)নেই সেখানে অন্যরাষ্ট্রের কাছে আগ বাড়িয়ে নালিশ দেয়া মানে কি দাড়াঁলো? একধরনের নগ্ন হস্তক্ষেপ কামনা করা? যা দেশী কিংবা আন্তর্জাতিক আইনে অন্যায় হিসেবেই গন্য।

বাংলাদেশের সরকারের উচিত বিষযটিকে সিরিয়াসলি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা।পাশাপাশি জনগনকে শান্ত রাখা দেশের সম্প্রতি বজায় রাখা।ভবিষ্যতে আরও দৃষ্টান্তমূলক সম্প্রতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা। কারণ কোন এজেন্ডার শিকার হয়ে অসাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেয়ার জন্যও এসব করতে পারে। কারণ সম্প্রতিককালে প্রথমে বাংলাদেশের সাথে আরাকানকে সংযুক্ত করার অবাস্তব মন্তব্য।এখন আবার সংখ্যালঘুর বিষয়ে মার্কিন দপ্তরে আমন্ত্রণ পেয়ে বিচার দেয়ার বিষয়টি অবশ্যই সেনসেটিভ ইস্যু। মার্কিনদের পক্ষ থেকে এধরণের প্রস্তাব একধরণের উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা উস্কে দেয়াা হচ্ছে কিনা তাও দেখতে হবে। এছাড়াও ভারতের জন্যও বিষয়টি ইস্টারেস্টিং। ভারত চায় আসাম,বিহার পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহু মুসলমান অধিবাসীদের এনআরসির নামে বিতাড়ন করতে।তারা বুঝাতে চায় বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাটার হচ্ছে তাই তারা এখানে চলে আসছে।এজন্য বিজেপির জৈনক নেতা সিলেট থেকে খুলনা পর্যন্ত দাবি করেও বসেছেন একবার। সুতরাং এখন আবার প্রিয়া সাহাদের দিয়ে সংখ্যালঘু বিষয়টাকে আরো ঘোলটে করে সুবিধা নিতে এবং এ অপবাদ দিয়ে আসামের মুসলমানদের পুশইন করার ফন্দিও আটতে পারে।

এদিকে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোহিঙ্গা সমস্যা।এবিষয়ে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগও পরিলক্ষিত। তবে কৌশলগত জায়গায় ব্যাপক ঘাটতি আজও রয়ে গেছে। দেখুন,আলোচনায় ট্রাম্প যখন বিভিন্ন প্রতিনিধিদের কাছে শুনছেন এবং নিজেও শেয়ার করছেন। অথচ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশ বিষয়ে সে হা-করে তাকিয়ে বললেন,‘আচ্ছা বাংলাদেশটা কোথায়? এখানে ট্রাম্পের স্বাভাবসুলভ আচরণ পরিলক্ষিত হলেও আমাদের অনুমানের বিষয় হলো,মার্কিন প্রশাসন ও ট্রাম্প রোহিঙ্গা বিষয়ে কতটা অমনোযোগি হলে এমন কথা বলতে পারে?এখানে ট্রাম্পের চেয়ে আমাদের স্ট্যাটেজিক ঘাটতিই বেশি। কারণ অন্যান্য বিষয়ে ট্রাম্প যেভাবে কনসার্ন আমরা সেভাবে প্রচারপ্রচারণার মাধ্যমে তাকেসহ বিশ্বনেতাদের কনর্সান করতে পারিনি।যেখানে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনও আমাদের অসযোগিতা করছে,সেখানে স্বভাবসুরভ চিরপ্রতিদ্বন্ধি যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা আমাদের পক্ষে সায় দেয়া কথা। আমরা তা করতে সক্ষম হয়নি।

কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে প্রায় সময় পরাশক্তিরা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও হেজিমনি তৈরী করার জন্য স্বীয় দেশের লোকদেরকেই ব্যহার করে এবং কখনো কখনো সন্ত্রাসবাদ,সহিংসতা কিংবা সংখ্যালঘুদের উপর হামলার দায় দিয়ে,এসকল জনগণকে বাচঁনোর নামে-R2p (Responsibility to protect)তত্ত্ব ব্যবহারের চেষ্টা করে।এ মানবিক হস্তক্ষেপের নামে আরটুপি’র অপব্যবহার করে পরাশক্তিদের আগ্রাসন কতটা ন্যাক্কারজনক হতে পারে তার সম্প্রতিক-দৃষ্টান্ত গাদ্দাফি পরবর্তী লিবিয়া,সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট।


শিক্ষার্থী,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মাস্টার্স,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ


আরো সংবাদ

সকল