তেলদূষণ থেকে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটের দড়ি ব্যবহার

আশরাফ আলী

প্রতি বছর গালফ অব মেক্সিকোর গভীর সমুদ্রে তেল উত্তোলন করে বিভিন্ন রিগ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আহরণ করা হয়। এ রকম একটি রিগে ২০১০ সালে বড়সড় একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ফলে সমুদ্রের বিশাল এলাকাজুড়ে তেল ছড়িয়ে পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীববৈচিত্র্যসহ বিপুল জলরাশি। এই ভয়াবহ পরিমাণ তেলদূষণ থেকে সমুদ্র ও বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যকে কিভাবে রক্ষা করা যায়, তার চেষ্টা চালাচ্ছিল মাস্ক অ্যাসোসিয়েটস নামে একটি পাট ও পাটজাতপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পাট রফতানিকারী এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ গবেষণার পর সমূদ্র থেকে ভাসমান দূষিত তেল সরিয়ে নেয়ার সৃজনশীল পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। এতে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে পাট ও পাটের দড়ি। ইতোমধ্যে উদ্ভাবনী পদ্ধতিটি পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ‘এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন এজেন্সি’র (ইপিএ) স্বীকৃতিও পেয়েছে।
মাস্ক অ্যাসোসিয়েটসের মূলমন্ত্র ‘গ্রিন বিজ অ্যান্ড গ্রিন এনটিটি’। পরিবেশবান্ধব ব্যবসা করে পৃথিবীকে কিভাবে আরো বাসযোগ্য এবং সুন্দর করা যায় সে জন্য কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ‘সোশ্যাল বিজনেস কনসেপ্ট’-এ কাজ করে যাচ্ছে দীর্ঘ দিন থেকেই। উদ্দেশ্য গবেষণার মাধ্যমে পাটের বাজার বৃদ্ধি করা। পাট পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রাকৃতিক আঁশ। তুলার পর পাট পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাকৃতিক আঁশের বড় উৎস। এই সোনালি আঁশ প্যাকেজিং, কার্পেটসহ নানা প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এখন উন্নত মেশিনের মাধ্যমে পাট থেকে ভালো মানের সুতা তৈরি হচ্ছে, যা থেকে শার্ট ও প্যান্টের কাপড় তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ সোনালি আঁশ তৈরিতে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটের মধ্যে আছে মেছতা, সাদা ও তোষা পাট। বর্তমানে পাট রফতানির ৭০ ভাগ পাটই যায় বাংলাদেশ থেকে। এ ছাড়া ভারত, মিয়ানমার ও চীনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাট উৎপাদন হয়।
১৯৮২ সালে এস বি কাদেরের হাত ধরে মাস্ক অ্যাসোসিয়েটসের জন্ম। তখন তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে লন্ডনের বিখ্যাত পাট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘আরইবি উইলকক্স’-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রতিনিধি থেকে বের হয়ে নিজেই মাস্ক অ্যাসোসিয়েটস প্রাইভেট লিমিটেড গড়ে তোলেন। সিআইপি সুবিধাপ্রাপ্ত সফল এই ব্যবসায়ী মাস্ক অ্যাসোসিয়েটসকে নিয়ে গেছেন একটি সম্মানজনক পর্যায়ে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ সাল থেকে ব্যবসার হাল ধরেন তার সুযোগ্য পুত্র সৈয়দ মুশতাক কাদের। মাস্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বিশ্বজুড়ে একটি বিশাল মার্কেটিং টিম গড়ে তোলেন তিনি। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিয়মিত পাট ও পাটজাতপণ্য রফতানি করে মাস্ক অ্যাসোসিয়েটস। উন্নত মানের পাটজাতপণ্য রফতানির জন্য মাস্ক অ্যাসোসিয়েটস ইতোমধ্যে আইএসও ৯০০১ ও ১৪০০১ সনদও পেয়েছে।
১৯৫১ সালে আদমজী জুট মিলের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে পাট শিল্পের সূচনা হয়। ক্রমশ ষাটের দশকে কলকাতা (ভারত), ডান্ডিকে (স্কটল্যান্ড) পেছনে ফেলে আদমজী হয়ে ওঠে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল। ব্রিটেনের রাজপরিবারের সদস্যরাও তখন আদমজী পাটকল সফর করতে আসেন। স্বাধীনতার পর গত চার দশক ধরে বাংলাদেশ একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে পাটের বিশ্ববাজারে। বর্তমানে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের পাট রফতানি করে বাংলাদেশ। মাস্ক অ্যাসোসিয়েটসের পরিচালক সৈয়দ মুশতাক কাদের বিশ্বাস করেনÑ সবাই যদি সৃজনশীল ও সততার সাথে পাটের বাজারজাত করে এবং সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় সব সাহায্য পাওয়া যায় তবে অচিরেই এর পরিমাণ পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.