২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯

বাড়ছে পেঁয়াজের ঝাঁজ, পেঁয়াজের অজানা তথ্য

পেঁয়াজ নেই, এমন কোন রান্না ঘর হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ কোন রান্না শুরু করার আগে, কড়াইতে তেল দেয়ার পরপরই সাধারণত: যে উপাদানটি ব্যবহার করা হয় সেটি পেঁয়াজ। শুধু অন্য রান্নার অনুষঙ্গ নয়, কাঁচা খেতেও পেয়াজ বেশ সুস্বাদু। এছাড়া সরাসরি কাঁচা পেঁয়াজ, ভর্তা, আচার এবং সালাদ হিসেবেও পেঁয়াজের কদর কম নয়।

পেঁয়াজের রয়েছে বেশ কিছু স্বাস্থ্যগুণও। সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ তো বটেই বিশ্বের প্রায় সব দেশেই চাহিদা রয়েছে পেঁয়াজের। তবে, বেশ কয়েক দিন ধরেই বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজারে ঝাঁজ বাড়ছে।

রোববার, ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের রপ্তানি নীতি সংশোধন করে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর বাংলাদেশের বাজারে ঘণ্টার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পেয়াজের দাম।

পেঁয়াজ আসলে কী?
পেঁয়াজ আসলে কোন সবজি নয়। এটি আসলে একটি মশলা জাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম এলিয়াম সেপা। এই বর্গের অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে রসুন, শ্যালট, লিক, চাইব এবং চীনা পেঁয়াজ। রসুনের মতোই এর গোত্র হচ্ছে লিলি।

পেঁয়াজ কোথায় উৎপন্ন হয়?
এটি এমন একটি উদ্ভিদ যা বিশ্বের প্রায় সব দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় ভারত এবং চীনে।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের শিক্ষক এ এফ এম জামাল উদ্দিন বলেন, 'সেসব দেশগুলোতেই প্রধানত পেঁয়াজ হয় যেখানে বেশি বৃষ্টি হয় না। পাশাপাশি হাল্কা শীত থাকে। সেজন্যই বাংলাদেশে পেঁয়াজ হয় শীতকালে। সেসময় দামও কম থাকে'।

বাংলাদেশে কী ধরণের পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়?
বাংলাদেশে যে সব এলাকায় শীত বেশি থাকে সেসব এলাকায় পেঁয়াজ বেশি জন্মায়।

জামাল উদ্দিন বলেন, "বাংলাদেশ এলিয়াম সেপা বা পেঁয়াজ যা মূলত একটি বাল্ব সেটাই উৎপাদিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশের পেঁয়াজ তেমন বড় হয় না"।

আকারে বড় না হলেও বাংলাদেশের পেঁয়াজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি ঝাঁজালো বেশি হয়। কারণ এতে এলিসিনের মাত্রাটা বেশি থাকে। যা রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এর জন্য আমাদের রান্নাটাও অনেক বেশি মজা হয়।

হর্টিকালচারের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকায় সারা বছর পেয়াজ উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এর জন্য বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পলি-টানেল বা গ্রিন হাউজ তৈরি করে পেঁয়াজ উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

পেঁয়াজের খাদ্যগুণ কী কী?
পুষ্টিবিদ চৌধুরী তাসনিম বলেন, পেঁয়াজ আসলে মশলা জাতীয় খাবার। এর মূল উপাদান পানি, কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার। তবে পেঁয়াজে পানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি-প্রায় ৮৫ শতাংশ। এছাড়াও পুষ্টিগুণ বলতে গেলে, ভিটামিন সি, বি এবং পটাসিয়াম থাকে।

তিনি বলেন, "পেঁয়াজের খোসা ছাড়ালে যে গাঢ় বেগুনি রঙের একটি আস্তরণ পাওয়া যায় এতে বেশি পরিমাণে এ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। জ্বালাপোড়া বা প্রদাহ নিবারণ করে এমন উপাদানও রয়েছে পেঁয়াজে। এটি হাড়েরও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে"।

জামাল উদ্দিন বলেন, শরীরে পটাসিয়াম এবং মিনারেল বা খনিজের চাহিদা পূরণের একটি ভালো উৎস পেয়াজ। এই উপাদানগুলোই পেয়াজে অনেক বেশি পরিমাণে থাকে।

প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। ডায়েটারি ফাইবার থাকে অনেক বেশি যা প্রায় ১২ শতাংশ। পেয়াজে মধ্যে কোন ফ্যাট নাই। এছাড়া পেঁয়াজে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি এবং আয়রন পাওয়া যায়।

রান্নায় পেঁয়াজ কী স্বাদ যোগ করে?
পুষ্টিবিদ চৌধুরী তাসনিম , "পেয়াজ যেহেতু সালফার উপাদান থাকে তাই এটি রান্নায় এক ধরণের ঝাঁজালো স্বাদ যোগ করে"।

তবে নিজস্ব স্বাদ যোগ করার ছাড়াও রান্নায় পেঁয়াজের সব চেয়ে বড় কাজ হচ্ছে, রান্নার অন্যান্য উপকরণের স্বাদ অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়।

তিনি বলেন, "পেয়াজ তিতা, টক, মিষ্টি বা ঝাল এমন ধরণের কোন স্বাদ যোগ করে না। তবে সালফার কম্পোনেন্ট থাকায় পেয়াজ খাবারের যেকোনো স্বাদকে অনেক বেশি তীব্র করে"।

বেশিক্ষণ রান্না করলে পেঁয়াজে থাকা ভিটামিন নষ্ট হলেও অন্য উপাদানগুলো ঠিক থাকে।

পেঁয়াজ দীর্ঘক্ষণ রান্না করলে খাদ্যগুণ কি নষ্ট হয়ে যায়?
পেঁয়াজে নানা ধরণের ভিটামিন ও প্রাকৃতিক তেল থাকে যা রান্নার পর নষ্ট হয়ে যায় বলে ধারণা করা হয়।

তবে পুষ্টিবিদরা বলছেন, পেয়াজে ভোলাটাইল কিছু উপাদান রয়েছে যেগুলো নাকে-মুখে লাগে সেগুলো হয়তো নষ্ট হয়। কিন্তু পেঁয়াজের অন্য উপাদানগুলো নষ্ট হয় না।

খোলা রান্না করলে বা কেটে খোলা রাখলে পেয়াজের খাদ্যগুণ নষ্ট হয় না। তবে সালফার কম্পোনেন্ট কমে আসে। রান্নার পর খোলা অবস্থায় রাখলে কোন সমস্যা হয় না।

পুষ্টিবিদ চৌধুরী তাসনিম বলেন, "বেশিক্ষণ ধরে রান্না করা হলে ভিটামিন ও পটাসিয়াম কমে আসতে পারে। এছাড়া বাকি সব খাদ্য উপাদান নষ্ট হয় না"।

তবে উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলে খাদ্যগুণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে মধ্যম তাপমাত্রায় পেঁয়াজ রান্না করার পরামর্শ দেন তাসনীম চৌধুরী। পেঁয়াজের গুনাগুণ পেতে হলে কাঁচা পেয়াজে খাওয়ার অভ্যাস বেশি করতে হবে বলেও জানান তিনি।

পেঁয়াজ কাটলে চোখ দিয়ে পানি পড়ে কেন?
পেঁয়াজ কেটেছেন কিন্তু চোখে পানি আসেনি এমনও কাউকে খুঁজে পাওয়া বেশ দুরূহ। কৃষিবিদ জামাল উদ্দিন বলেন, "পেঁয়াজের ভলাটাইল কম্পাউন্ড যা এলিসিন নামে পরিচিত, এটি পেঁয়াজের ঝাঁঝের জন্য দায়ী। আর কাটার সময় এটি চোখে লাগে বলেই চোখ জ্বালাপোড়া করে এবং পানি পড়ে"।

তিনি বলেন, জাপান বা অন্য দেশে পেঁয়াজ বড় মাপের হয় এবং সেগুলোতে এলিসিনের মাত্রা কম থাকার কারণে সেখানে পেঁয়াজ কাটলে চোখ জ্বলে না। এসব দেশে পেয়াজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাঁচা খাওয়া হয় সবজি হিসেবে।

পেঁয়াজের ঔষধি গুণ কী?
বিবিসি গুড ফুড তাদের প্রতিবেদনে বলছে, ঐতিহাসিকভাবে পেঁয়াজের রয়েছে ঔষধি ব্যবহার। প্রাচীন আমলে কলেরা এবং প্লেগের প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার করা হতো পেঁয়াজ। রোমান সম্রাট নিরো ঠাণ্ডার ওষুধ হিসেবে পেঁয়াজ খেতেন বলেও শ্রুতি রয়েছে।

বাংলাদেশে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জামাল উদ্দিন বলেন, পেঁয়াজে থাকা এলিসিন নামের উপাদান অ্যান্টি-ফাঙ্গাল এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে।

অনেক সময় এটি কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখা, ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে পেঁয়াজের ব্যবহার দেখা যায়।

তিনি বলেন, পেঁয়াজ কাঁচা খেলে সর্দি-কাশি খুব কম পরিমাণে হয়। এটা মানুষের শরীরকে রোগ-প্রতিরোধক হিসেবে হিসেবে করে।

পেঁয়াজের গন্ধ দূর করবেন কীভাবে?
অনেক সময় পেঁয়াজ কাটলে বা কাঁচা পেঁয়াজ খেলে হাতে এবং নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হয়। এর জন্য অনেক সময়ই পেঁয়াজকে এড়িয়ে চলি আমরা। তবে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করলেই পেঁয়াজের এই দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

হাতে গন্ধ হলে পেঁয়াজ কাটার পর প্রথমে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে। তার পর লবণ দিয়ে হাত কচলে আবার ধুয়ে ফেলতে হবে। এবার সাবান এবং গরম পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিলে থাকবে না কোন গন্ধ।

নিঃশ্বাসের গন্ধ দূর করতে হলে ধনিয়াপাতা বা একটি আপেল খেয়ে নিলে দূর হবে তাও। বিবিসি।


আরো সংবাদ