১০ ডিসেম্বর ২০১৯

সৌদি ক্যাম্পে শাস্তি দিয়ে অবৈধ শ্রমিকদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে

সৌদি সরকারের ‘অবৈধমুক্ত সৌদি আরব’ (ভায়োলেটর্স ফ্রি কেএসএ) কর্মসূচির আওতায় চলমান ধরপাকড় অভিযানে প্রতিদিন বাংলাদেশীসহ যেসব বিদেশী শ্রমিক ধরা পড়ছেন তাদেরকে ডিপোর্টেশন ক্যাম্পে জেল জরিমানা দেয়ার পরই আউট পাসে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

২০১৭ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ধরপাকড় অভিযানে মোট ৪০ লাখ অবৈধ বিদেশী নাগরিক সৌদি পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। এর মধ্যে ২০ লাখ বিদেশী কর্মসূচির আওতায় জেল জরিমানার পর নিজ নিজ দেশে ফেরত গেছেন। আর বাকিরা দেশে ফেরত যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন বলে সৌদি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যে কী পরিমাণ বাংলাদেশী শ্রমিক গ্রেফতারের পর কারাবরণ করে দেশে ফিরেছেন তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অথবা বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক থেকেও পাওয়া যায়নি। তবে দুই-একদিন পর পরই বিচ্ছিন্নভাবে দেশে ফেরত আসাদের তালিকা দেয়া হচ্ছে বিমানবন্দর প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার রাতে সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের দু’টি ফ্লাইটে অবৈধ হওয়ার অভিযোগে ২১৫ শ্রমিক দেশে ফেরত এসেছেন। যাদের সবাই সৌদি সরকারের অর্থায়নে ফ্রি টিকিটে এক কাপড়ে দেশে ফিরেছেন বলে সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দা কনসাল জেনারেল অফিস সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে।

গতকাল সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে ধরপাকড় অভিযানের বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ভায়োলেটর্স ফ্রি কেএসএ অর্থাৎ অবৈধমুক্ত সৌদি আরব কর্মসূচি ঘোষণা করে। আর এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে দেশটির প্রতি জেলাতেই আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ১০০০ পরিদর্শন দল গঠন করা হয়।

এক প্রশ্নের উত্তরে ওই কর্মকর্তা বলেন, অভিযানে যেসব শ্রমিকের কাছে ইকামায় এক পেশা লেখা রয়েছে কিন্তু তাদের আটকের সময় পাওয়া গেছে অন্য পেশায় তখনই তাদেরকে আটক করে ডিপোর্টেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আবার কোনো শ্রমিক নিয়োগকর্তার অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পরও অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে ধরা পড়লে তারাও অবৈধমুক্ত সৌদি আরব কর্মসূচির আওতায় পড়ছেন। এরপর সৌদি সরকারের ফ্রি টিকিট দিয়ে আউট পাসে এক কাপড়ে বিমানে তুলে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০১৭ সালের নভেম্বরের আগে সৌদি পুলিশ এক চোখ বন্ধ রেখেছে। কিন্তু অভিযান শুরুর পর এখন অভিযানকারীরা দুই চোখ খুলে ফেলেছে। আর এই ধরপাকড় অভিযানের বিষয়টি যারা এ দেশে অবৈধভাবে রয়েছেন তারাও জানেন। যেকোনো সময় ধরা পড়লে দেশে ফিরে যেতে হবে। তিনি সৌদি গেজেটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, সৌদি সরকারের এই অভিযান শুরুর পর ২২ মাসে ৪০ লাখ অবৈধ প্রবাসী পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ডিপোর্টেশন ক্যাম্পে ছিল। তার মধ্যে থেকে ২০ লাখের মতো যার যার দেশে চলে গেছে। বাকি যারা রয়েছে তাদের বিমান টিকিট সরকারিভাবে দেয়া হয়। সেটি পাওয়া গেলেই দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। এটি তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচি। আর ডিপোর্টশেন ক্যাম্পও ৩ স্টার মানের হোটেলের মতো।

গত রাতে জেদ্দা কনসাল জেনারেল অফিসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা ধরপাকড়ের পর বাংলাদেশীদের ধরে ধরে দেশে ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের জেদ্দা অফিসের হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য মোট ৯৫ হাজার আউট পাস ইস্যু করা হয়েছে। ধারণা করছি যারা আউট পাস নিয়েছেন তারা সবাই দেশে ফেরত চলে গেছেন।

ধরপাকড় অভিযান নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে দূতাবাসের অপর এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে আমাদের সাথে সৌদি সরকারের বাই লেটারাল অ্যাগ্রিমেন্ট রয়েছে। ঢাকায় ফিরে শ্রমিকরা যেসব অভিযোগ করছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা ঢাকায় গিয়ে যা বলছে তা সঠিক নয়। এগুলো এনজিওদের শেখানো বক্তব্য বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে।

এ দিকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক তানভীর হাসান গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, বুধবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে সাউদিয়া এযারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইটে ৮৬ জন শ্রমিক দেশে ফেরেন। একইভাবে বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের (এসভি-৮০২) অপর একটি ফ্লাইটে আরো ১২৯ জন বাংলাদেশী ফিরে আসেন। দুই ফ্লাইটে মোট ২১৫ জন ফিরেছেন বলে জানান তিনি।

বিমানবন্দর প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক ও ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা যায়, ফিরে আসা শ্রমিকদের বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বাড়ি যাওয়ার ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয়। সেখান থেকে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের কর্মকর্তাদের কাছে শ্রমিকরা তাদের ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট হস্তান্তর করছেন। এরপর কর্মীদের দেয়া অভিযোগগুলো তারা লিখিতভাবে উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এরপরই শ্রমিকরা যে যার মতো বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দর থেকে বের হলেই বাইরে অপেক্ষমাণ একাধিক এনজিওর প্রতিনিধিদের রোষানলে পড়েন। আরেক দফা তাদের সেখানে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে এরপর অনেকটা খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে বলে দেশে ফেরা শ্রমিকদের কারো কারো কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।


আরো সংবাদ