২০ নভেম্বর ২০১৯

প্রহরীহীন ২১শ’ অরক্ষিত রেলক্রসিং

প্রহরীহীন ২১শ’ অরক্ষিত রেলক্রসিং - ছবি : সংগৃহীত

অরক্ষিত, অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশের রেলওয়ের বেশির ভাগ রেলক্রসিং। রেল চলছে নিরাপত্তাহীনতায় আর পথচারীরা চলছে ঝুঁকির মধ্যে। এক দিকে যেমন পুরাতন বগি অন্য দিকে পশ্চিমাঞ্চলের ৮৩ শতাংশ লেবেল ক্রসিংগুলোতে নেই গেটকিপার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। পাশাপাশি রয়েছে অনুমোদনহীন রেল ক্রসিং। ফলে প্রতি নিয়তই দুর্ঘটনা ঘটছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কোচ ও ওয়াগন কেনা হলেও রেলের লেবেল ক্রসিংগুলো অরক্ষিতই রয়ে গেছে। বর্তমানে রেলের দুই অঞ্চল মিলে ৬৭২টি ক্রসিংয়ের মানোন্নয়ন, প্রহরী ও সিগন্যালিং জরুরি হয়ে পড়েছে। এখন রেলওয়ে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রহরী নিয়োগের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে। এ দিকে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পটি চলছে ঢিমেতালে। দুই বছরের প্রকল্পটির মেয়াদ চার বছর বাড়ানো হয়েছে। 

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে রেলের লেবেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা দুই হাজার ৪৯৪টি। এর মধ্যে ৪০০টি ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিবন্ধক ও প্রহরী (গেটম্যান) আছে। বাকি দুই হাজার ৯৪টি রেলক্রসিং অরক্ষিত। প্রহরী ছাড়াই চলছে এ রেল ক্রসিংগুলো। কিছু ক্রসিংয়ে নামমাত্র প্রতিবন্ধক থাকলেও সেগুলো দেখার মতো কেউ নেই। বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে এক হাজার ২৪৯টি ক্রসিং গেট রয়েছে। যার মধ্যে অনুমোদিত ৯৭৮টি। আর ২৭১টি অনুমোদনহীন। অনুমোদিত ৯৭৮টি ক্রসিং গেটের মধ্যে মাত্র ২৭১টিতে প্রহরী রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের এক হাজার ২৮টি প্রহরীহীন অরক্ষিত বা ৮৩ শতাংশে কোনো প্রহরী নেই। 

অন্য দিকে রেলের পূর্বাঞ্চলের লেবেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা হলো এক হাজার ২৪৫টি। যার মধ্যে ৪৩৪টি অনুমোদিত এবং ৮১১টি অনুমোদিত। এখানেও প্রায় ১৩০টি ছাড়া বাকিগুলোতে কোনো ধরনের প্রহরী নেই। ফলে এসব বেশির ভাগ গেটে নিরাপদ ট্রেন চলাচলের জন্য কোনো গেটম্যান বা প্রহরী এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ রেললাইনের উপর দিয়ে সড়ক তৈরির সময় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে যেসব ক্রসিংয়ের সৃষ্টি করেছে, সেটাই অননুমোদিত লেবেল ক্রসিং। তবে রেলওয়ের অনুমোদিত রেলক্রসিংয়েরও ৮০ শতাংশ কোনো ধরনের প্রহরী ছাড়াই চলছে। এক দিকে রেল আসছে আবার অন্য দিকে গাড়িও চলাচল করছে। ফলে প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। আবার ক্রসিংগুলো যাও আছে সেগুলোতে গেট ব্যারিয়ার, চেক রেল, চেক ব্লক নেই।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন, জেলা পরিষদ এবং অন্যান্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্বারা রাস্তা বা সড়ক নির্মাণের সময় অধিকাংশ লেবেল ক্রসিং নির্মিত হয়েছিল। রেলওয়ের অ্যাক্ট ১৮৯০ এবং রেলওয়ের ম্যানুয়েল অনুযায়ী অন্য ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক রেলপথ অতিক্রমকারী সড়কগুলোর জন্য লেবেল ক্রসিংগুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থে ডিপোজিট ওয়ার্ক হিসেবে গেটগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেসব ডিপার্টমেন্টগুলো তা করছে না। ফলে এসব লেবেল ক্রসিংগুলো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে না পারায় এবং প্রহরী না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে রেলওয়ের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে : ‘এখানে কোনো গেটম্যান নাই। পথচারী ও সব যানবাহন চালক নিজ দায়িত্বে পারাপার করিবেন এবং যেকোনো দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে নিজেই বাধ্য থাকিবেন’। 

সূত্র জানায়, সারা দেশে ৩৭১টি রেলক্রসিংয়ে প্রহরী আছেন। তাদের অন্তত ২৫০ জনই চুক্তিভিত্তিক। অনেকে দৈনিকভিত্তিক মজুরিতে কাজ করেন। তাদের প্রশিক্ষণও নেই। ২০০৫ সালের পর থেকে প্রহরী নিয়োগ বন্ধ আছে। সম্প্রতি নিয়োগের উদ্যোগ নিলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা মামলা করে তা আটকে দেন।

রেলের তথ্যানুযায়ী, এ ক্রসিংগুলোর মধ্যে থেকে ২৭৩টি অনুমোদিত ক্রসিং দ্রুত মেরামত ও উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রহরী নিয়োগ এবং ৫৩টি অননুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ের জন্য অনুমোদিত গেট রূপান্তর করতে ২০১৫ সালে প্রকল্প নেয়া হয়। আগাই বছরের এই প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৪৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত হওয়ার কথা। নির্ধারিত মেয়াদে সমাপ্ত না হলেও ব্যয় ১৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৬৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় উন্নীত করে মেয়াদ আরো দু’বছর বাড়ানো হয়। বর্ধিত মেয়াদেও তারা প্রকল্পটি সমাপ্ত করতে পারেনি। ৯০ শতাংশের কিছু বোিশ শেষ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় পর্যালোচনা সভায়। এখন নতুন করে অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রহরী নিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়িয়ে ব্যয় ১০০ ভাগের বেশি অর্থাৎ ৯৫ কোটি ৯৭ লাখ ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে। বাকি কাজসহ প্রকল্প শেষ হবে আগামী ২০২১ সালের জুনে। 

এ ব্যাপারে রেলের একজন কর্মকর্তা জানান, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মোট ৬৭২টি ক্রসিংয়ের উন্নয়ন ও প্রহরীর জন্য একটি পৃথক দু’টি প্রকল্প শিগগরিই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এটি পাস হলে আমরা দ্রুত কাজ শুরু করতে পারব।

রেলক্রসিং প্রকল্পের ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ ও আইএমইডি বলছে, এই কাজের জন্য দুই বছর পরপর আবার মেয়াদ বাড়ানো সমীচীন নয়। পাশাপাশি দুই বছর সময়কে যথাসম্ভব কমিয়ে আনার ব্যাপারে রেলওয়ে ও রেল বিভাগকে উদ্যোগ নিতে হবে। গেটকিপারের পদগুলো স্থায়ী করার ব্যাপারে চূড়ান্ত হলেই দ্রুত প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করতে হবে।

 


আরো সংবাদ