২১ নভেম্বর ২০১৯
নয়া দিগন্তকে ফরহাদ মজহার

ভোলার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ

ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা শুধু নয় বরং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে এ ঘটনায় সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি মন্দির ও কিছু বাড়িঘরে হামলার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তাতে গভীর শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে অনেকের মনে। ভোলার ঘটনার কারণ যাই হোক না কেন আধিপত্যবাদী শক্তি এ ধরনের ঘটনাকে হাতিয়ার করে বাংলাদেশকেও কাশ্মিরের পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে অনেকে শঙ্কিত।

বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও সমাজচিন্তক ফরহাদ মজহার ভোলার ঘটনা ও মন্দির ভাঙচুরের খবর প্রসঙ্গে দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি বারবার বলেছি এবং বলে যাবো, বাংলাদেশে অমুসলিম, বিশেষত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর যেকোনো প্রকার হামলা মূলত উপমহাদেশে নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদকে শক্তিশালী করে এবং বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) তৎপরতা ও অন্তর্ঘাতমূলক কাজের পথকে সুগম করে। বাংলাদেশের সীমান্ত এক দিকে ভারত আর অপর দিকে মিয়ানমার দ্বারা পরিবেষ্টিত। আমাদের স্বাধীনতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সরাসরি সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাথে জড়িত। কারণ বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রতিবেশী দেশের জনগণকে প্রভাবিত করে, তাদের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া ঘটে; যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

ভোলায় বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বিচারের দাবিতে বিক্ষোভে চারজন নিহত এবং পরে মন্দিরে হামলার বিষয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, যারা অতি উৎসাহী হয়ে নিরীহ হিন্দুর বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে, মন্দির ভাঙচুর করেছে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে তারা স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের হয়ে কাজ করেছে। তারা বাংলাদেশে দিল্লির উদ্দেশ্য সাধন করতে চায়। তারা চায় ভারতে একটা দাঙ্গা হোক। সেখানে হিন্দুরা মুসলমান মারুক। মুসলমান তাড়াক। আর হিন্দুদের রক্ষা করবার জন্য কাশ্মিরের মতো বাংলাদেশেও ভারতীয় সেনাবাহিনী মোতায়েন হোক।

তিনি বলেন, এটা আগুন নিয়ে খেলার শামিল। এতে তারা নিজেরাও পুড়বে বাংলাদেশকেও পোড়াবে।

এক প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ মজহার বলেন, এটা অবিশ্বাস্য মনে হয় যে, বারবার কোনো না কোনো হিন্দু ছেলের আইডি হ্যাক হয় এবং ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। প্যাটার্ন তো একই রকম। এটাও অবিশ্বাস্য মনে হয় যে এই ধরনের হ্যাকিং সরকার প্রতিরোধ বা বন্ধ করতে সক্ষম নয়। আসলে কেন পারে না?

ফরহাদ মজহার বলেন, এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারছে কারণ ক্ষমতাসীন সরকার মনে করে দেশের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাতী শক্তিকে প্রশ্রয় না দিয়ে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। হিন্দুত্ববাদী শক্তির সমর্থন নিয়েই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

ফরহাদ মজহার বলেন, একটি শ্রেণী টুপি পরা কোর্তা পরা মুসলমানদের দাঙ্গাবাজ প্রমাণ করতে পাগল হয়ে ওঠে পড়ে লেগে গেছে। গুলি করে চারটি মানুষ হত্যা ও শতাধিক মানুষকে আহত করার কারণ খোঁজা বাদ হয়ে গেল। পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকাও বাদ হয়ে গেল। কোন পরিস্থিতিতে পুলিশ গুলি করল সেই আলোচনাও বাদ। ম্যাজিস্ট্রেট গুলির অর্ডার দিয়েছিল নাকি দেয়নি, সেটাও আমরা নিশ্চিত জানি না। কিন্তু এখন টেলিভিশনে ‘গুজব’ নিয়ে তর্ক চলছে। অভিযোগ করা হচ্ছে মুসলমানগুলো গুজব ছড়াল কেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত সবুর করতে পারল না?

তিনি বলেন, মসজিদে পুলিশের ওপর শার্ট-প্যান্ট পরা কিছু ছেলে হামলার ভিডিও দেখেছি। তাদের রক্ষার জন্য আলেম, ওলামা, মুসল্লি ও মাদরাসার ছাত্রদের প্রাণপণ চেষ্টা দেখেছি, মাইকে মসজিদ আল্লাহর ঘর, এখানে হামলা করতে নিষেধ করার আহ্বান বারবার শুনেছি। ক্ষুব্ধ জনতার মধ্য থেকে ‘দরজা ভাঙা হচ্ছে পুলিশ পেটানো হবে’ এই চিৎকারও শুনেছি। আলেম ওলামা ও মাদরাসার ছাত্ররা দরজা ভেঙে ফেলা প্রাণপণ ঠেকানোর চেষ্টা করছেন দেখেছি।

সর্বশেষ দেখছি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ভাঙার খবর। অনেকের বাড়িঘর ভাঙা হয়েছে, একজন মারধরের অভিযোগও করেছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ মজহার বলেন, এ দেশের ইসলাম প্রিয় জনতাকে অনেক সতর্ক থাকতে হবে। সতর্ক হয়ে কাজ করতে হবে। না বোঝে অন্যের পাতা ফাঁদে পা দেয়া যাবে না; যা আমরা প্রায়ই করি। ইসলামী রাজনীতির সাথে যুক্তদের বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা বাদ দিয়ে নিজেদের শক্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। তাদেরকে স্বাধীনভাবে দাঁড়ানোর হিম্মত অর্জন করতে হবে। না হলে অনেক শহীদের রক্তে এই দেশ ভেসে যাবে; কিন্তু কিছুই অর্জিত হবে না।


আরো সংবাদ