২১ নভেম্বর ২০১৯

মেয়াদোত্তীর্ণ-মানহীন গ্যাস সিলিন্ডার যেন একেকটি মোবাইল বোমা

-

দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁই ছুঁই। বস্তির শিশুরা খেলায় মগ্ন। এরই মধ্যে হাজির হলেন বেলুন বিক্রেতা। আর এ খবরটা তাদের কানে পৌঁছতেই খেলাধুলা শিকেয় তুলে ছুটে এলো শিশুর দল। বেলুন বিক্রেতাকে ঘিরে তখন শিশুদের হৈহুল্লোড়। কেউ বলছে, আমি লালটা নিবো, কেউবা আমার হলুদটা। গ্যাসে ভরা উড়ন্ত বেলুনে তাদের আগ্রহ, কৌতূহল যে অনেক। বেলুন বিক্রেতা এক দিকে বেলুন বিক্রি করছিলেন অন্য দিকে সিলিন্ডারের গ্যাস দিয়ে বেলুন ফোলাচ্ছিলেন। তখন কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিস্ফোরিত হয় সিলিন্ডারটি।

বেলুনের সুতা হাত ফসকে গেলে যেমন উড়ে যায় আকাশে, ধরাছোঁয়ার বাইরে, ঠিক তেমনভাবেই গ্যাস বেলুনের মতো উড়ে গেল কুসুমকোমল নিষ্পাপ শিশুগুলো। অকালে চিরদিনের জন্য। তবে নিঃশব্দে নয়, বিকট শব্দে। একজন নয়, দুইজন নয়- মুহূর্তেই ঝরে গেল ছয়টি তাজা প্রাণ। মর্মস্পর্শী ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার রাজধানীর রূপনগরে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের শুধু এই ঘটনাই নয়, চলতি বছরের শুরুতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডিতে ৭৮ জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা কেবল বাংলাদেশ নয়, কাঁদিয়েছে পুরো বিশ্বকে।

গেল মাসের মধ্যভাগে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সিলিন্ডারবাহী অ্যাম্বুলেন্সে বিস্ফোরণে নিহত হন তিনজন। ফলে মেয়াদ উত্তীর্ণ ও মানহীন গ্যাস সিলিন্ডার পরিণত হয়েছে এক একটি মোবাইল বোমায়। নির্দিষ্ট সময়ে পূর্ণ পরীক্ষার নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না মালিকেরা। প্রায় পাঁচ লাখ সিএনজিচালিত যানবাহনের মধ্যে এ পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ৯২ হাজার। প্রায় ৮০ শতাংশ সিলিন্ডারই পুনঃপরীক্ষার বাইরে রয়েছে। দিন যত গড়াচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডারের বয়স বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

এ দিকে সিলিন্ডার গ্যাস বাজারজাত ও মান নিয়ন্ত্রণে নেই সরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট সংস্থা, নেই নজরদারি। ফলে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে গ্যাস ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজি, সিএনজিসহ সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে, তাই এখনই ব্যবস্থা না নিলে অপেক্ষা করছে ভয়ঙ্কর আগামী।

সরকারের রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাইভেট কারসহ সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি। প্রতিষ্ঠানটি সিএনজি কনভারশন সেন্টারগুলোর অনুমোদনও দেয়। তারা এ পর্যন্ত ১৮০টির বেশি কনভারশন সেন্টারের অনুমোদন দিয়েছে, তবে কাজ করে মাত্র ১০ থেকে ১২টি। যানবাহন সিএনজিতে রূপান্তর করার পর প্রতি পাঁচ বছরে একবার সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা (রিটেস্ট) করার বাধ্যবাধ্যকতা রয়েছে। তা করা হয় কি না, সেটি দেখার দায়িত্ব বিস্ফোরক অধিদফতরের।

তবে বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক মো: সামসুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, সিলিন্ডারের সমস্যার খোঁজ নেয়া আমাদের কাজ নয়। এলপিজি সিলিন্ডারগুলো টেস্ট করবে বোতলিং প্ল্যান। আর সিএনজির ক্ষেত্রে আমরা কিছু তৃতীয় পক্ষের কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছি।

বিস্ফোরক অধিদফতরের সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডারের আয়ু ১০ থেকে ১৫ বছর হয়ে থাকে। এ মেয়াদে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। তাই আয়ু শেষ হলে সেগুলো বাতিল করা উচিত- এটা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই কাণ্ডজ্ঞানের ঘাটতি অত্যন্ত প্রকট।

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, এগুলো দেখভাল করার কেউ নেই। যদি বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিস থেকে সার্টিফিকেট নিয়েও থাকে তারা সেটির দেখভাল করছে কি না সেটিই প্রশ্ন জাগায়।

তিনি বলেন, যারা সিএনজিগুলো ইনস্টল করেন তারা এটিকে রিটেস্ট করেন। যারা এগুলো লাগাচ্ছে তারা কেউ কিন্তু সার্টিফায়েড নন।

সামছুন নাহার নামে এক বেসরকারি কলেজের শিক্ষিকা বলেন, আমার বাসায় রান্না হয় গ্যাস সিলিন্ডারের মাধ্যমে। আমি প্রথমে গ্যাস সিলিন্ডার ও চুলা নতুন ক্রয় করি; কিন্তু পরে সিলিন্ডারের গ্যাস ফুরিয়ে গেলে ওই সিলিন্ডার জমা দিয়ে নতুন করে যে সিলিন্ডার আনা হয় সেটি কত দিন আগের তৈরি বা ওই সিলিন্ডার কত বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে, ব্যবহারকারীদের কাছে সেই হিসাবও থাকে না।

বছরতিনেক আগে বিস্ফোরক অধিদফতর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ১১ হাজার গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা করেছিল। তারা দেখতে পেয়েছিল, আট হাজার সিলিন্ডারই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, তাই সেগুলো তখন বাতিল করা হয়। এ থেকে অনুমান করা যায়, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁঁকির মাত্রা কত ব্যাপক। তাই এ ঝুঁকি যেমন ঘরে তেমন বাইরে। ঘরের ক্ষেত্রে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার আর বাইরে গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার।

জানা গেছে, সরকারি এবং বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে নিজস্ব অনুসন্ধান এবং দুর্ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে সহস্রাধিক। গত ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরীর টাইগারপাস এলাকায় চলন্ত প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। ২৫ জুন চট্টগ্রামের পটিয়ায় মাইক্রোবাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহত হয় ১৬ জন। ১৯ আগস্ট কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলায় একটি বাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে খোরশেদ আলম নামে এক ব্যক্তি নিহত এবং ছয়জন আহত হন।

গত ১৫ আগস্ট হবিগঞ্জ শহরের পোদ্দারহাট এলাকায় বর এবং বরযাত্রী বহনকারী মাইক্রোবাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বর ও শিশুসহ ৩০ জন আহত হন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পুরনো ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৮১ জন নিহত হন। একটি গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঁচ বছর পর পর সিলিন্ডার রি-টেস্ট করার বিধান থাকলেও অনেক ব্যবহারকারী বিষয়টি এড়িয়ে যান। মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকায় গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা করা যায়। বিস্ফোরক অধিদফতরে এই পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেয়ার কথা। সারাদেশে পাঁচ লক্ষাধিক গাড়িতে সংযোজন করা সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডারের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ গাড়ির সিলিন্ডার পরীক্ষা করা হয়েছে। সারাদেশে ৩২টি রিটেস্ট বা পুনঃপরীক্ষা কেন্দ্রের মধ্যে বড় কয়েকটি বাদে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতির সক্ষমতা ও পরীক্ষার মানের ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে।

জানা গেছে, সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার সনদ ছাড়া সিএনজিচালিত গাড়িগুলোতে গ্যাস দেয়া হবে না বলে গত জুলাই মাস থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত মানা হচ্ছে না। পুনঃপরীক্ষা ছাড়াই গাড়িতে গ্যাস দেয়া হচ্ছে।

অবৈধ ও প্রত্যন্ত এলাকায় চলাচল করা গাড়িগুলো থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কেবল ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নেয়ার সময় এগুলোকে শনাক্ত সম্ভব। তাই বিস্ফোরক পরিদফতর সারা দেশের ৬০০টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনকে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে নিবন্ধিত প্রায় পাঁচ লাখ চার হাজার ৩০০ গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। ১৯ বছরে পুনঃপরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র বিরানব্বই হাজার সিলিন্ডার। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের এক কর্মকর্তা বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং নিম্নমানের নকল গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

জানা গেছে, দেশে বছরে এলপিজি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় দেড় লাখ টন। শিল্পায়ন, আধুনিকায়নের ফলে ক্রমেই বেড়ে চলেছে এ চাহিদা। যদিও সিলিন্ডার ব্যবহার বা মান নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো নীতিমালা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের পাশাপাশি গাড়িতে নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। ভালো একটি সিলিন্ডারের দাম ৩০ হাজার টাকার বেশি। সেখানে কম দামে ১৫-২০ হাজার টাকায় একটি সিলিন্ডার লাগানো হচ্ছে। লেগুনা ও ছোট গাড়িগুলোতে গাড়ির সিলিন্ডারের বদলে অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে যাত্রীদের জীবন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩ হাজার পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয়। এই চাপে ভরা গ্যাস সিলিন্ডার যথাযথ না হলে বড় রকমের অঘটন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। বড় বাস-ট্রাকের বিস্ফোরণের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ বাস-ট্রাকে ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার থাকে। তারা বলছেন, আইন করে যদি বিআরটিএ’র ফিটনেস নেয়ার সময় সিলিন্ডার রিটেস্ট করানো বাধ্যতামূলক করা যায় তাহলে এই ধরনের ঝুঁকি কমবে। এখনই সঠিক পদক্ষেপ এবং এ সংক্রান্ত সচেতনা বৃদ্ধি করতে না পারলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকছেই বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।


আরো সংবাদ

প্রাণের উৎসবে মেতেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো সাবেক শিক্ষার্থী বিদেশ থেকে আমদানির ফলে বিপদে পড়বে পেঁয়াজ চাষীরা শাবরা শাতিলার পথ ধরে রোগ তাড়াতে মেয়েকে ‘সাধু বাবা’র ঘরে রাত কাটাতে পাঠালেন বাবা-মা! বাজি ধরে দীঘিতে সাঁতার দিয়ে লাশ হয়ে ফিরলেন পুলিশপুত্র নালিতাবাড়ীতে ইয়াবাসহ ২ সাবেক নারী ইউপি সদস্য গ্রেফতার বাসর রাতে স্বামী জানতে পারেন তার নববধূ অন্তঃস্বত্ত্বা আইনমন্ত্রীর সাথে দেখা করে যা বলেছেন আবরারের বাবা চতুর্থ দিনের মতো খুলনায় বাস চলেনি মুজাহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জামায়াতের পরিবহন শ্রমিকদের দাবিতে অসঙ্গতি আছে কি-না খতিয়ে দেখা হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সকল