১৯ আগস্ট ২০১৯

অন্ধকার থেকে আলোয়

-


‘আগে চোহে মুহে অন্ধকার দেখতাম, এখনে আলোর মুখ দেখতাছি। বাজান কইতো পড়ালেহা করণের দরকার নাই। পড়ালেহা বড় মানষেরগো জন্যে, আমাগো দেশে মাইয়া মানষের পড়ালেহার দরকার নাইকা। নাম সই কিছুই লেখবার পারতাম না। টিপ দেয়া লাগত। এখন পড়বার পারি, লেখবার পারি।’ কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামের বয়স্ক নারী শিক্ষার্থী পারুল বেগম (৪২)। তার মতো এই গ্রামে বহু নারী-পুরুষ এখন বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপানুষ্ঠানিক ব্যুরোর মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের আওতায় ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের নারী এবং পুরুষা পাচ্ছে শিক্ষার আলো।
পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে স্কুলে যেতে পারেনি। বিভিন্ন অফিস আদালতে টিপসই ছিল একমাত্র অবলম্বন। বিভিন্ন প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যখন স্বাক্ষর করার জন্য কাগজ-কলম দেয়া হতো তখন তিনি লজ্জায় পড়ে যেত। আর এ লজ্জাবোধ থেকে মুক্তি পেতেই লেখাপড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয় তাদের মধ্যে। ব্যুরো অফ হিউম্যান ফ্রেন্ডশিপের (বিএইচ এফ) পরিচালনায় ছয় মাস মেয়াদি এ শিক্ষা প্রকল্পের অধীনে ৩০০টি শিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে দিনে ৩০ জন নারী শিক্ষার্থীরা এবং রাতে ৩০ জন পুরুষ শিক্ষার্থীকে সাক্ষরতা প্রকল্পের আওতায় প্রতিদিন শিক্ষাদান করা হয়। মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৮ হাজার, নারী শিক্ষক সংখ্যা ৩০০ জন এবং পুরুষ শিক্ষক ৩০০ জন। প্রতি কেন্দ্রে নারী শিক্ষক একজন এবং পুরুষ শিক্ষক একজন কর্মরত আছেন। শিক্ষাকার্যক্রম ঠিকমতো চলেছে কি না তা দেখভাল করার জন্য রয়েছেন ১৫ জন সুপার ভাইজার। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে।
মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের আওতায় মানিকগঞ্জের ঘিওরে বহু নারী পুরুষ শিক্ষার আলোতে আলোকিত হয়ে তাদের চোখেমুখে হাঁসির ঝিলিক দেখা দিয়েছে। কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা যায়, চট বিছিয়ে শিক্ষার্থীরা বসে আছে। শিক্ষিকা জুঁই ও রানু তাদের চাট দেখিয়ে সুন্দরভাবে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছেন। প্রতিটি কেন্দ্রে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো থেকে বই, ফ্লিপ, চার্ট, খাতা, কলম, ব্ল্যাকবের্ড, বসার চট, কেন্দ্রের সাইন বোর্ডসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রদান করা হয়েছে। নারীদের কেন্দ্রগুলো বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এবং পুরুষদের রাত ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চালু থাকে। রাতের কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুতের পাশাপাশি বিকল্প আলোর ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি কেন্দ্রে ছয়টি করে হারিকেন দেয়া হয়েছে।
শিক্ষণ স্কুলের ছাত্র বৃদ্ধ গফুর মিয়া হোসেন জানালেন, আমার বয়স অনেক হইছে বাজান। আগে আমরা দোকানে বাকি খাইছি। দোকানদার দাম বলছে একটা আর খাতায় লেখছিল আরেকটা। আমাকে সহজে ঠকাইতে পারছিল। আমি এখন লেখবার পারি, লেখা বুঝি। এখন আমাকে আর কেউ ঠকাইতে পারব না। বয়োবৃদ্ধ শিক্ষার্থী মো: মুন্তাজ বেশ গর্বের সাথেই বলল, এখন লিখতে পারি, পড়তে পারি। রাস্তার সাইন বোর্ড পড়ে বলতে পারি কোথায় আছি। ব্যাংক হিসাবেও সই দেই। যোগ-বিয়োগও পারি।
২০১৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর তারিখে ঘিওর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ৩০০টি শিক্ষণ কেন্দ্রে একযোগে উদ্বোধন করা হয়। কেন্দ্রগুলো উদ্বোধন করেন জেলা উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো পরিচালক নিখিলচন্দ্র কর্মকার এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান খন্দকার লিয়াকত হোসেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীমা খন্দকার ও ব্যুরো অফ হিউম্যান ফ্রেন্ডশিপ (বিএইচএফ) পরিচালক আলহাজ আব্দুল কাদের টিপু প্রমুখ। ১৫ থেকে ৪৫ বছরের প্রায় ১৮ হাজার বয়সের নিরক্ষর নারী এবং পুরুষকে শনাক্ত করে বিএইচএফ বেসরকারি সংস্থাটি মৌলিক সাক্ষরতা কার্যক্রমটি নিবিরভাবে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি কেন্দ্রে উপ-আনুষ্ঠানিক এই প্রকল্পটি এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তবে শিক্ষা কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা নিবিড়ভাবে দেখাশোনা করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তারা, উপজেলা চেয়ারম্যান মাঝে মধ্যে শিক্ষণ কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন। তারা শিক্ষার্থীদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মতবিনিময় করেন এবং তাদের স্বল্প সময়ের শিক্ষা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
শিক্ষণ স্কুলের সাক্ষরতার সুফল ভোগ করছেন করিম শেখ। ৪২ বছরবয়সী করিম কৃষিকাজ করেন। তিনিও পাঠ গ্রহণ করেছেন। এখন মোটামুটিভাবে লিখতে-পড়তে পারেন। রুহুল জানান, আগে দোকানে গিয়ে প্যাকেটের গায়ে ছবি দেখে সার, কীটনাশক চিনতেন। এখন পড়েই সরাসরি সব চিনতে, জানতে ও কিনতে পারছেন। নিরক্ষরতার অন্ধকার থেকে সাক্ষরতার আলোয় এসেছেন রুবি বেগম। তিনি জানান, স্বাবলম্বী হতে তিনি একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। আর এ ঋণ নেয়ার জন্য লেখাপড়া শিখেছেন। সই করতে জেনেছেন।
তেরশ্রী গ্রামের রুনু দাশ, দীপালি দাশ, সাথী দাশ, সূচনা দাশ, টগর দাশ, চায়না রানীসহ অসংখ্য নারী শিক্ষার্থী জানান, বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি। সরকারর এই মহৎ উদ্যোগ নেয়ার ফলে আমরা শিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হয়ে আমাদের নাম ঠিকানা লেখাসহ ছোটখাটো হিসাব নিকাশ করতে পারছি।
শিক্ষণ স্কুলের শিক্ষার্থী বীথি রানী ও শিলা হালদার জানান, ‘এখন পড়বার পারি, লেখবার পারি। এখন আমাগো কেউ আর মূর্খ বলতে পারবে না। এই বয়সে এসে যে আমরা লেখাপড়া শিখব, তা আগে ভাবি নাই। মনের আফসোস দূর হইছে।’
মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের কর্মরত শিক্ষক জুঁই সাহা ও রানু আক্তার জানান, বর্তমান সরকার এই প্রকল্পের আওতায় এলাকার অনেক নিরক্ষর মানুষের উপকার হচ্ছে। আজকে অনেকেই নাম ঠিকানাসহ ছোটখাটো বিষয়গুলো লিখতে পড়তে পারছে।
ব্যুরো অফ হিউম্যান ফ্রেন্ডশিপের (বিএইচএফ) প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার চেয়ারম্যান আলহাজ সৈয়দ মো: আব্দুল কাদের টিপু জানান, সরকারের নিয়মনীতি অনুসরণ করে যথাসময়ে সঠিকভাবে আমাদের কার্যক্রমটি পরিচালনা করেছি। সব শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সুপারভাইজার গুরুত্বসহকারে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে প্রকল্পের মেয়াদ, সব সুপারভাইজার ও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আইরিন আক্তার জানান, বর্তমান সরকারের মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পটি একটি মহৎ উদ্যোগ। এই প্রকল্পটির মাধ্যমে এলাকার লোকজনের অনেক উপকার হয়েছে।


আরো সংবাদ