২০ অক্টোবর ২০১৯

ত্রাণ

-

বৃষ্টি কমার লক্ষণ নেই। বৃষ্টির পর হঠাৎ বন্যায় পুরো পদিপাড়া ভেসে গেছে বলে মানুষের জীবনযাত্রার মান বড়ই বিপন্ন। গ্রামের সাধারণ পরিবারগুলোর ঘর বাড়ি পানির তলে। গুলশানে কেনা অ্যাপার্টমেন্টে বসে ফেসবুকে নিজের গ্রামের বন্যাকবলিত ছবিগুলো দেখছে ফরিদ। গ্রামের পরিচিত ছেলেগুলো বন্যায় বিধ্বস্ত ছবি আপলোড করছে প্রতিনিয়ত। না, ফরিদের এভাবে বসে থাকলে চলবে না। এখনই বানভাসিদের জন্য কিছু করতে হবে। ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষগুলো যে তারই গ্রামের। এদের সাথে সে একসময় মিলেমিশে বড় হয়েছে। দল বেঁধে স্কুলে গেছে, সুখে দুঃখে পাশে থেকেছে। আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে শহরে চলে এসেছে ফরিদ। কিন্তু প্রিয় গ্রামের সাথে জন্মান্তরের অটুট সম্পর্ক রোজ অনুভব করে সে। চাকরির সুবাদে অনেক বছর ধরে এ শহরের বাসিন্দা ফরিদ। গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় কিনেছে কোটি টাকার অ্যাপার্টমেন্ট। পদিপাড়া গ্রামের সাধারণ এক কুঁড়েঘরের ছেলে ফরিদের ঠাঁই হয়েছে সে অ্যাপার্টমেন্টে। কৃষক বাবা আর পরের ঘরে কাজ করা জনমদুঃখী মাকে নিয়ে আজ শহরের ব্যস্ত নাগরিক ফরিদ।
ফেসবুকে বন্যাকবলিত ছবিগুলো দেখে ফরিদের চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছর আগের নির্মম এক চিত্র। তখন ভরা শ্রাবণ মাস। চার দিকে থই থই বর্ষার পানি। ভরদুপুরে দমকা ঝড় তুফান শুরু। মাতাল হাওয়ায় উড়ে যায় ফরিদদের কুঁড়েঘরের ছাউনি। অসুস্থ বাবা মাকে নিয়ে বিত্তবান খানবাড়িতে ছুটে আসে ফরিদ। খানবাড়ির কাচারি ঘরে একটুখানি মাথা নোয়াবার আশ্রয়ের আশায় ফরিদ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু খানবাড়ির আমজাদ খান ফরিদকে সে আশ্রয় দিতে আপত্তি জানায়।
Ñচাচা, আমরা কয়েকটা দিন আপনাদের কাচারিতে থাকতে পারি না?
Ñনা। এটা খানবাড়ি। এই বাড়িতে ছোটলোকদের আশ্রয় দেয়া হয় না।
উপায় না পেয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ফরিদ চলে আসে বন্ধু সেলিমের দুয়ারে। দুর্দিনে বন্ধুর জন্য সহানুভূতির হাত বাড়ায় সেলিম। নিজেদেরই টানাপড়েনের সংসার হলেও পুরো বর্ষায় ফরিদের পরিবারকে ঠাঁই দিয়ে সেলিম মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে।
তার পর কত দিন, কত বর্ষা নীরবে চলে গেছে। জীবনের নানা বাঁকে হোঁচট খেতে খেতে ফরিদ আজ প্রতিষ্ঠিত। ‘এই বাড়িতে ছোটলোকদের আশ্রয় দেয়া হয় না’Ñ আমজাদ খানের সে দিনের এই অবজ্ঞার কথা আজো চোখ ভেজায় ফরিদের। জীবনের কাছে সে দিন সে কতই না অসহায় ছিল।
২.
আজ বর্ষাÑ বন্যায় ভাসছে ফরিদের সেই সোনারগাঁ। রক্তের বন্ধনের মতো আপন হয়ে থাকা বানভাসি মানুষগুলোর জন্য সহায়তার হাত বাড়াতে হবে। ফরিদ কল দেয় বন্ধু সেলিমকে।
Ñআমি এই দুর্দিনে তোদের জন্য কিছুুুুুুুুুুুুুুু করতে চাই বন্ধু।
Ñকী করতে চাস?
Ñযারা বন্যাকবলিত, তাদের ত্রাণ বিতরণ করতে চাই।
Ñভেরি গুড। তো চলে আয়।
Ñকালই শহর থেকে রওনা দেই তাহলে!
পরদিন অফিসের গাড়ি নিয়ে ফরিদ গ্রামের বাড়ি রওনা দেয়। গ্রামের বটতলায় ত্রাণ বিতরণের সব আয়োজন রেডি করে রাখে সেলিম। ফরিদ এসে সেলিমের কর্মকাণ্ড দেখে খুশি হয়।
ত্রাণ বিতরণ হবে জেনে বন্যাকবলিতরা বটতলায় ভিড় জমায়। ফরিদ ত্রাণ হিসেবে চাল, ডাল, তেল, নুন থেকে শুরু করে সব কিছুর ব্যবস্থা করে। বড় বড় প্যাকেটভর্তি সেসব খাবার দ্রব্য ফরিদ নিজ হাতে ক্রমান্বয়ে বিতরণ করতে থাকে। দলে দলে বানভাসিরা আসছে আর ত্রাণ পেয়ে তৃপ্তির হাসি দিয়ে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ একজনকে দেখে চমকে উঠে ফরিদ। আরে, এ তো আমজাদ খান। তার এই দশা কেন! সেলিমের কাছ থেকে ফরিদ জানল আমজাদ খানদের জমিদারি আচরণ এখন আগের মতো নেই। জীবনভর মানুষের অভিশাপ অর্জন করা খানবাড়ির সবাই আজ অভাব অনটনে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বলা যায় তারা আজ পথের ভিখারি হয়ে গেছে। সৃষ্টিকর্তা কখন কার কী করেন, সেটা বোঝা দায়।
বয়সের ভারে নুয়ে যাওয়া আর বৃষ্টিতে সারা শরীর ভেজা আমজাদ খান লাঠিতে ভর করে কাঁপতে কাঁপতে ফরিদের হাত থেকে ত্রাণের বড় প্যাকেটটি নিয়ে চলে গেল। অহঙ্কারে পা মাটিতে না পড়া এই আমজাদ খান একদিন ফরিদকে ঝড় তুফানের দিনে আশ্রয় দিয়ে করুণা দেখায়নি। ফরিদ সেদিন ভাবেনি কোনো একদিন বন্যায় সে এই আমজাদ খানকে ত্রাণ দিয়ে সাহায্য করবে।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 


আরো সংবাদ