১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ভেজাইল্যা! চারাগল্প

-

রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে খুক খুক করে কাশি দেয়া মানুষটির দিকে আবার ফিরে চাইলাম। খুব পরিচিত মনে হলো। বয়সের ভারে নুয়ে গেছেন। দুর্বল শরীর নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে হেঁটে যাচ্ছেন। হাতে একটা বাজারের পুরানো থলে। বাজারের পরিমান খুব অল্প তা বোঝাই যাচ্ছিল।
নিজের প্রাইভেট কার থেকে নেমে খুব দ্রুত ছুটে গেলাম। পা ধরে সালাম করলাম। আমার কখনোই ভুল হতে পারে না। ভুল হওয়ার নয়! স্যার হাত দিয়ে চোখের ঘোলা কাচের চশমাটা ঠিক করলেন। তার পর চোখ বড় বড় করে আমাকে কিছুক্ষণ দেখলেন। তার পর কাঁপা গলায় বললেন, ‘কেমন আছ বাবা?’
স্যার ধরেই নিয়েছেন আমি নিশ্চয় স্যারের কোনো প্রাক্তন ছাত্র। এ রকম ভাবাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাকে এক্ষুনি মনে করিয়ে দিতে হবে আমি স্যারের কাছে বাকি সব ছাত্রের মতো ছিলাম না! আমি ছিলাম ব্যতিক্রম কেউ!
ক্লাসে ছেলে ছোকরাদের সাথে আমার প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকত। তাই স্যার আমার নাম দিয়েছিলেন ‘ভেজাইল্যা’। আমার রোল ক্লাসে এক ছিল। স্যার আমাকে খুব আদর করে ভেজাইল্যা ডাকতেন।
স্যারের বাড়ি প্রাইভেট পড়তে যেতাম। আমি যখন দশম শ্রেণীতে তখন স্যারের মেয়ে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। স্যারের মেয়ের সাথেও আমার প্রায় খুনসুটি লেগে থাকত। স্যার এতে বিরক্ত হতেন না! তিনি মুচকি মুচকি হাসতেন। স্যারের মেয়ের নাম ছিল সানজিদা। খুব লম্বা আর ফর্সা মেয়ে ছিল সে। সানজিদার সাথে ঝগড়ার শাস্তি হিসেবে স্যার আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিলেন। প্রাইভেট শেষে সানজিদাকে নিরাপদে তার ক্লাসে পৌঁছে দিয়ে তবেই আমাকে নিজের ক্লাসে যেতে হতো।
এভাবে একসময় সানজিদার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো হয়ে গিয়েছিল। এসএসসি পাস করার পরে আমাকে লেখাপড়া করার জন্য শহরে চলে যেতে হয়েছিল। এরপর অনেক বছর স্যার আর সানজিদার সাথে যোগাযোগ ছিল না। এর মাঝে সানজিদার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। আচমকা একদিন স্যারের স্ত্রী মারা গেলেন অসুখে। দূর থেকে এসব খবর শুনে শুনে শুধুই খারাপ লাগত। ব্যস্ততার ঝামেলায় হাত-পা বাঁধা ছিল। ছুটে আসতে মন চাইলেও আসতে পারতাম না।
আজ আমি প্রতিষ্ঠিত। সেই স্যারের সামনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ। ‘স্যার আমি আপনার ভেজাইল্যা’! শুনেই স্যার চোখ বড় করে সাথে সাথে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। জানতে চাইলেন আমি কেমন আছি?
আমি স্যারের কাছে সানজিদার খবর জানতে চাইলাম। এবার স্যার উচ্ছ্বাস হারিয়ে ফেললেন। স্যারের চেহারায় ঘোর অন্ধকার নেমে এলো। স্যার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘মা মরা মেয়েটার পোড়া কপাল! সংসার ভেঙে গেছে। স্বামী প্রায়ই অশান্তি করত তাই ওকে নিয়ে এসেছি!’
আমি স্যারকে বিদায় দিতে দিতে বললাম, ‘বিকেলে আপনার বাড়ি আসব আর সানজিদাকে দেখে যাবো’।
পথে যেতে যেতে ভাবছিলাম, ‘সময় এসেছে আজ স্যারের জন্য কিছু করার’!
পূর্ব শিলুয়া, ছাগলনাইয়া, ফেনী


আরো সংবাদ