১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শৈশব

-

কুঢুরটা (বাতি) নিভাইয়া দে, ঘুমাইতে যা। রাতের বেলা লিখন ভালা না। মা কথাগুলো বলে তার অবশিষ্ট সাংসারিক কাজ করে নিত। বাবা বাজার থেকে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। বাবা এলে তাকে কবিতা /ছড়া মুখস্থ করে লিখে দেখাব। বিনিময়ে দশ/বিশ টাকার চকচকে নোট। পঁচিশের বন্দের একটি চৌচালা ঘর ছিল আমাদের। বেড়াগুলো ছিল ছনের তৈরি ( গোবরের প্রলেপ আর হাতের কাজ।) ঘরে একটি চৌকি আর আমার জন্য একটি ছোট্ট মেঝ (পড়ার টেবিলের অপর নাম), আরেকপাশে খাওয়ার জন্য জায়গাটার পাশেই একটি মিটসেফ, চৌকির বরাবরই একটি আলমারি। আলমারিতে সবার নতুন কাপড় তুলে রাখা হতো, সাথে নেপথালিন দিয়ে। আলমারির সবচেয়ে ভেতরের ড্রয়ারে থাকত বাবার টাকা-পয়সা। আমরা এটাকেই বলতাম, সিন্দুক বা এ পরিবারের সিন্দুক। সেই সিন্দুকে বাবা কত টাকা যে রাখতেন আবার ঢাকায় গেলে নিয়ে যেতেন সেসব দৃশ্য এখনো কত স্পষ্ট এবং আনন্দের আমি এখনো তা উপভোগ করি খুব। আমার মেঝের সাথে দক্ষিণ দিকে বেড়া কেটে ছোট্ট জানালার মতো করে দিয়েছে বাবা, যাতে করে পড়ার সময়ে মৃদু বাতাস আসে। আমার বাবা জুতার ব্যবসায় করতেন। বাজার আমাদের বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। বাবা ভোরে বাজারে যেতেন আর ফিরতেন সন্ধ্যার অনেক পরে। বাবার কেনা দেয়াল ঘড়িটা টিকটিক করছে। সেই ঘড়ি আজো টিকটিক করে আমার রুমে শৈশবের সাক্ষী হয়ে। আমি বাবার আশায় বসে থাকতাম পড়ার ছলে। তিনি প্রায় আমার জন্য কিছু-না-কিছু আনতেন। একদিন নতুন খাতা-কলম, আরেক দিন ফল অন্যদিন নতুন নতুন উদের বল (ক্রিকেট বল)। মা সন্ধ্যা হতে-না-হতেই ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে যেতেন, বাবা বাজার থেকে আসার পর অনেক সময়ে নিজে নিজে ভাত খেতেন। আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন। অবশ্য মা ভীষণ রোগা ছিলেন। আমি তখন ক্লাস টুতে পড়ি। বাবার দেয়া চকচকে নোট ইংলিশ প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে মনের আনন্দে স্কুলে যেতাম। আমি স্কুল কামাই শুরু করি। আমাদের স্কুলের সবচেয়ে ভালো টিচার (আমার চোখে) শ্রদ্ধেয় মতিন স্যার বিষয়টি প্রথমে বাবাকে জানালেন। বাবা আমাকে বোঝাতে চাইলেন স্কুলে নিয়মিত কেন যেতে হবে ( যে আদর করে বেশি তার কথা খুব একটা অমান্য করা যায় না সহজে), তোমার কী লাগবে আমাকে বলো, শুক্রবার আমার সাথে বাজারে যাবে। একটি নতুন শার্ট কিনে দেবো। যা লাগে দেবো কিন্তু ভালোমতো পড়ালেখা করতে হবে। আমি তখন খুব নিশ্চুপ থাকতাম, এখনো সেই নিশ্চুপতা রয়ে গেছে আমার মধ্যে। একদিন স্কুলে, সম্ভবত মঙ্গলবার হবে। মতিন স্যারের ক্লাসে তার দেয়া হোমওয়ার্ক করতে পারিনি বলে স্যার আমাকে ইচ্ছামতো পেটালেন। মতিন স্যারের সেই পিটুনি আমাকে আমূল পরিবর্তন করে দিলো, যার ফলে অসুস্থতা ছাড়া আর কোনো দিন স্কুল কামাই করিনি। আধুনিক শিক্ষায় গবেষকরা স্কুলে বেত্রাঘাত নিষিদ্ধ করতে চায় কিন্তু আমি তা মানি না। স্নেহময়ী শাসনের জন্য, জীবনের শুরুতেই তাদের (মহান শিক্ষকদের) হাতে দু-একবার মার না খাওয়া দুর্ভাগ্যই বলব। আমার আরেকজন শিক্ষক ছিলেন আমার মেজো চাচা। তার হাতেও একদিন মার খেয়েছিলাম। অন্যদিকে আমার চাচা জসিম, আমার আরেক শিক্ষক বাড়িতে বইয়ের প্রতি মমতার বীজ বপন করে দিয়েছিলেন। কয়েক বছর পর চাচা বিদেশে চলে যান, কিন্তু আমার প্রতি তার ভালোবাসা কমেনি। বাড়িতে চিঠি পাঠালে আমার জন্যও ছিল একটি আলাদা চিঠি। সেই চিঠি ছিল আমার জীবনে স্পেশাল কিছু। চাচার একটি কথা আজো ভুলিনিÑ বেশি করে গান শুনবি, গানে জ্ঞান হয়। আমাকে কাপড়-চোপড় বানাতে আলাদা টাকাও দিতেন। আহারে কী দিন ছিল! চাচার পাঠানো ডেকসেটে আমারই প্রাধান্য ছিল বেশি। কেননা তার ভাতিজা ক্লাসের ফার্স্ট বয়। নিয়মিত স্কুলে যাই, দুপুরগুলো নিজের অধিকারে, যেখানে ইচ্ছা ঘুড়ে বেড়াই, ঘুড়ি উড়াই, টুনটুনির বাসা খুঁজি। গুণ্ডামি ভরা সেই নস্টালজিয়া জীবন ছিল কতই না মধুর। ইচ্ছা করে আবার দলবেঁধে শৈশবে ফিরে যাই; আহারে শৈশব!

 


আরো সংবাদ