১৫ নভেম্বর ২০১৯

অপরূপা হাইল হাওর

-

সিলেটের শষ্যভাণ্ডার বলে খ্যাত মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলা এবং হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ২৯টি গ্রাম নিয়ে গঠিত হাইল হাওর। ঐতিহ্যবাহী হাইল হাওর প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র ও জীবন জীবিকার বিবেচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি।
প্রায় সাত থেকে আট হাজার অতি দরিদ্র মৎস্যজীবী পরিবার হাওরে মাছ ধরে নির্বাহ করে থাকেন তাদের জীবিকা। তা ছাড়াও হাইল হাওর দেশী বিদেশী নানা জাতের পাখি, শামুক, ঝিনুক, ফোকল, ঘাস, শাপলা, শালুক, উকল, হিজল-করচ গাছ ইত্যাদি এবং অন্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল।
হাইল হাওরের এ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ তথা এই জলাভূমির উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে মাছ প্রকল্পের সহায়তায় গঠিত হয়েছে জলাভূমি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংগঠন (আরএমও)। এই সংগঠন হাইল হাওরের মৎস্য সম্পদের উৎপাদন ও বিলুপ্ত জাতের মাছ বৃদ্ধি এবং জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা করাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে আসছে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে হাওরে বিলুপ্ত বিভিন্ন জাতের মাছ গইন্না, কালিবাউস, চিতল, গুলশা, আইড়, দেশীয় সরপুঁটি, পাবদা, রুই ইত্যাদি অবমুক্তকরণ। এ ছাড়া হাওরে বিপুল জলজ উদ্ভিদ রোপণ করা হয়েছে। সেখানে তৈরি হয়েছে বন্যপ্রাণী ও পাখির আবাসস্থল।
বর্ষা মওসুমে হাইল হাওরের সুনীল জলরাশি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। শুধু পানি আর পানি। হাইল হাওরের পানির প্রধান উৎস গোপলা নদী (উজানে বিলাসছড়া থেকে উৎপত্তি লাভ করে হাইল হাওরকে দ্বিখণ্ডিত করে গোপলা নদী ভাটিতে বিজনা নদীর মাধ্যমে মেঘনার ঊর্ধ্বাংশের সাথে মিলিত হয়েছে)। হাইল হাওরে গেলে আপনি এর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। নৌকা ভ্রমণের উৎকৃষ্ট স্থান হাইল হাওর। ভোরে ঘুমন্ত হাইল হাওর যেন জেগে ওঠে। হাওরের চারপাশে হাজার হাজার মৎস্যজীবীর মাছ আহরণের দৃশ্য অত্যন্ত মোহনীয়। বিকেলের হাইল হাওর থাকে যেন পাখিদের দখলে। সন্ধ্যায় হাইল হাওরে গেলে মনে হবে সারা রাত কাটিয়ে দেই প্রকৃতির এ রাজ্যে।
মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার তিন উপজেলা শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার সদর ও নবীগঞ্জ উপজেলার কিয়দংশ নিয়ে অবস্থিত সুবিশাল হাইল হাওর। সরকারি খাস ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি মিলিয়ে বর্ষা মওসুমে মৌলভীবাজারের কালিয়ারগাঁও থেকে শ্রীমঙ্গলের মতিগঞ্জ পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১১ কিলোমিটার প্রস্থের হাইল হাওরের শুষ্ক মওসুমে দৈর্ঘ্য থাকে ১০ কিলোমিটার ও প্রস্থ থাকে পাঁচ কিলোমিটার। বর্ষা মওসুমে সুবিশাল জলরাশির হাইল হাওরে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে তিন শতাধিক বিল। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার সামান্য অংশ হাইল হাওরে থাকলেও মূলত হাওরটি শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর নামেই পরিচিত। এ হাইল হাওরে প্রতি বছর গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টন মাছ উৎপন্ন হয়। এ হাওরের উৎপাদিত মাছ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে প্রেরণ করা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এ ছাড়া এ হাওরের মাখনা, ভেট ইত্যাদি ফল বিক্রি হয় বাজারে। হাওরে রয়েছে দুই শতাধিক মৎস্য ফিশারি, প্রায় ৫০টি হাঁসের খামার ও প্রায় ২০টি গরু-মহিষের বাথান।
হাইল হাওরের ইতিহাস
১৮২৪ সালে সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। এ ভুমিকম্পে সিলেটের সর্বত্র ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মারা যায় হাজার-হাজার মানুষ। ভূমিকম্পে পরিবর্তিত হয় সিলেটের ভূ-অবস্থান। ভূমিকম্পের কারণে শ্রীমঙ্গলের মতিগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজারের কালিয়ারগাঁও পর্যন্ত নি¤œাঞ্চল ডেবে গিয়ে সৃষ্টি হয় হাইল হাওরের-এ তথ্য জানিয়েছেন পরিবেশবিদ সিতেশরঞ্জন দেব। কালের পরিক্রমায় হাইল হাওর এ অঞ্চলের হাজার-হাজার মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে। বর্তমানে হাইল হাওর পাড়ের বরুনা, নয়নশ্রী, কালিয়ারগাঁও, মির্জাপুর, ভূনবীর, রুস্তমপুর, দিগাপাড়া, মতিগঞ্জ, গ্রাম শ্রীমঙ্গল, লালবাগ, পশ্চিম ভাড়াউড়া, মিরনগর প্রভৃতি গ্রামের পাঁচ হাজার পরিবারের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ হাইল হাওরের ওপর নির্ভরশীল। উপযুক্ত গ্রামগুলোতে বসবাস করছে মুসলিম মৎস্যজীবী, সনাতন (হিন্দু) নমসূদ্র ও পাটনা সম্প্রদায়ের লোকজন। গ্রামগুলোর প্রায় ১৬ হাজার লোক মাছ আহরণের সাথে জড়িত। বাকিরা হাওরকেন্দ্রিক অন্য পেশায় যুক্ত।
সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন মিলিয়ে হাইল হাওরে প্রায় তিন শতাধিক বিল রয়েছে। এ ছাড়া মৎস্য ফিশারি রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক। এ এলাকার প্রধান মৎস্যভাণ্ডার হিসেবে হাইল হাওর সুপ্রসিদ্ধ। রয়েছে মাছের অভয়াশ্রমও। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মাছের প্রজনন ও অভয়াশ্রম রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের বাজারগুলোতে হাইল হাওরের মাছের আলাদা কদর রয়েছে। অন্য এলাকার মাছের চেয়ে অধিক মূল্যে এ হাওরের মাছ বিক্রি হয়। মৎস্যজীবীরা জানায়, শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরটি বাহুবলের গোপলা নদী হয়ে নবীগঞ্জের বিজনা নদীতে মিশেছে। আর বিজনা নদী মিশেছে কুশিয়ারা নদীর মোহনায়। ফলে কুশিয়ারা নদীর বড় বড় মাছও কালেভদ্রে হাইল হাওরে পাওয়া যায়। এলাকার প্রায় ১৬ হাজার মৎস্যজীবী মওসুমে হাইল হাওরের মাছ ও শুষ্ক মওসুমে হাওর পাড়ে ধানের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। অনেকে অভিযোগ করেন, শুষ্ক মওসুমে হাওরের পানি শুকিয়ে গেলে হাওরটি ছোট হয়ে যায়। সে সময় হাওরের জমি দখল করে প্রভাবশালী মহল ধান চাষ করে। এ ছাড়া ‘জাল যার জলাশয় তার’ এ নীতি মানেন না এলাকার অনেকেই।
ঐতিহ্য হারাচ্ছে হাইল হাওর
হাইল হাওর পাড়ের বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেই হাইল হাওরে দেশীয় জাতের মাছের আধিক্য ছিল। কিন্তু অবাধে মাছ আহরণ, মা মাছ শিকার ইত্যাদি কারণে বর্তমানে হাইল হাওর থেকে হারিয়ে গেছে ৩৭ প্রকারের দেশীয় মাছ। এসব মাছ রক্ষায় কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। এ ছাড়া মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৬২টি চা বাগান। এসব বাগানে পোকা মাকড় ধ্বংসে কীটনাশক স্প্রেকরা হয়। বর্ষা মওসুমে চা বাগানগুলোকে স্প্রে করা কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে হাইল হাওরে গিয়ে পড়ে। ফলে বিষাক্ত কীটনাশকের তেজস্ক্রিয়তায় অনেক মাছ ধ্বংস হচ্ছে। ইতোমধ্যে হাইল হাওরের বাইক্কা বিলকে মৎস্য ও পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সরকার পুরো হাইল হাওরকে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা দিয়ে কাজ করলে হাইল হাওর তার পুরানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে, ঘুচবে সিলেট অঞ্চলের মাছের সঙ্কট।


আরো সংবাদ