২১ অক্টোবর ২০১৯

ঘোর : চারাগল্প

-

আরে ভাই! এসব বিজ্ঞাপন সবই ভুয়া, বানোয়াট। সবই বাটপারি! নাজমুলের এসব কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করেই পত্রিকার জন্য উপজেলার সামনের মুছা ভাইয়ের দোকানে গেলাম। অফিসের কাজ শেষ করে রাতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে নজরে এলো বিজ্ঞাপনটি ‘ইউকেতে সেলসম্যান নিয়োগ, বিস্তারিত ০১৮৫২.....।’ জাতীয় দৈনিকের এমন একটি বিজ্ঞাপন সেদিন আমার মগজে লন্ডনে যাওয়ার ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আমার ধারণা ছিল না যে, পত্রিকায় এমন মিথ্যা বিজ্ঞাপন দেবে! পরদিন সকালে ওই নাম্বারে কল করতেই অসম্ভব ভদ্র এবং মার্জিত ভাষায় একজন বলে উঠলÑ
- আস্সালামু আলাইকুম।
- ওয়ালাইকুম আস্সালাম। ভাইয়া গতকাল পেপারে একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম এজন্য আপনাকে কল করা।
- জি, আপনি কোথা থেকে বলছেন?
- কুমিল্লা থেকে।
- আপনার নাম? পাসপোর্ট করা আছে আপনার?
- হ্যাঁ, করা আছে। আপনাদের অফিস কোথায় ?
-ক্যান্টনমেন্ট আমাদের অফিস।
আমরা আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে সিলেক্ট করব। সো, আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেন। আপনার সিভিটা আমি আপনার মোবাইলে একটা ই-মেইল এড্রেস দিচ্ছি, তাতে পাঠিয়ে দেন।
ক্যান্টনমেন্ট বলাতে তার কথাগুলো বিশ^াসযোগ্য মনে হলো। আমি প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। একদিন স্বপ্নে দেখলাম লন্ডনে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করা শুরু করে দিয়েছি। সেই আনন্দে কয়েকজনকে বলেও দিলাম, শিগগিরই বিদেশে চলে যাচ্ছি। কাছের মানুষ বেলাল শুনে আমাকে কিছুটা সতর্ক করে দিলো। সে বলেছিল,
বিনা পয়সায় লন্ডনে যাবি বিষয়টা ক্লিয়ার না, তবে দেখেশুনে পা বাড়া।
তার কথার দাম দিলাম না। আমি দেখেছি এ দেশের লাখ লাখ বেকার একটি চাকরির জন্য দৌড়াতে গিয়ে পত্রিকার এসব বিজ্ঞাপনকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করে থাকে, যা সেদিন নিজেকে দিয়ে বুঝেছিলাম। দিনটি ছিল বুধবার। দুপুরের দিকে ওই নাম্বার থেকে একটি এসএমএস আসেÑ ইউকে-সেলসম্যান নিয়োগের বাছাই কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দশজন সিলেক্ট করা হয়েছে, আপনার অবস্থান ইউকে-০১ (এটাই আপনার কোড নম্বর) পিন কোড নম্বরটি ভুলবেন না। আগামী ২৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্ট অফিসে ভাইভা হবে, পাসপোর্ট নিয়ে চলে আসবেন আর বিকাশ করে মেডিক্যাল ফি বাবদ ১০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেবেন তিন দিনের মধ্যে। না পারলেও জানাবেন, আমরা অন্য আরেকজনকে খুঁজে নেব। আমি তো খুশিতে আত্মহারা। ক’দিন বাদেই চলে যাচ্ছি স্বপ্নের লন্ডন। এখনো বেতন পাইনি তাই এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার নিয়ে দশ হাজার টাকা ওই নম্বরে পাঠিয়ে দিলাম। মুহূর্তে একটি ফিরতি এসএমএস পেলামÑ ঞযধহশং ধ ষড়ঃ. এড়ড়ফ ষঁপশ. স্বপ্ন বুঝি সত্যি হতে চলেছে। তখনই নিজে কতটা দায়িত্বশীল তা চিন্তা করা শুরু করে দিলাম। যেন কত দায়িত্ব আমার ঘাড়ে। এত টাকা বেতন পাবো! প্রথমেই বাড়ির রাস্তা আর কবরস্থান ঠিক করব। অতি আনন্দে আমি ঘুম হারালাম।
তখন আরো কিছু কাছের মানুষকে খবরটি জানালাম। তারা প্রাণভরে দোয়াও করলেন। অনেকে টাকা দিতেও রাজি ছিল যে যার সাধ্যমতো। আমার মাকে সারপ্রাইজ দেবো ভাবছি। সেবার মা আমাকে বিদেশে যেতে দেয়নি।
বাবা শুনলে নিশ্চয়ই অনেক খুশি হবেন। মনে মনে বাবাকে বলেই ফেললামÑ ‘দেখো বাবা, আমাদের আর অভাব থাকবে না। এক ঘরে সবাই থাকতে হবে না। মিলিকে মেডিক্যালে পড়াব। সামিয়াকে ধুমধাম করে বিয়ে দেবো। বিয়েতে আমার বন্ধুদের দাওয়াত করব। বাবা তোমাকে বলে রাখি, আমার কিন্তু একজন স্পেশাল গেস্ট আছে, রোকছানা তার নাম!
কিছু অপেক্ষা আনন্দের হয়। আমিও অপেক্ষা করতে লাগলাম সেই দিনটির জন্য, প্রত্যাশিত সুখবরটির জন্য। এমনি করে এক সপ্তাহ হয়ে গেল, খবর তো আর আসে না।
একদিন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে ওই নম্বরে কল দিলাম। আশ্চর্য! সুইচড অফ। আমি চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম। দুই মাস ধরে চেষ্টা করছি এখনো নম্বরটা বন্ধ! নাজমুলের কথাই সত্য হলো। বিশ্বাস করে আবারো প্রতারিত হলাম। এমনিতেই সংসারে অনেক ঝামেলা। ইব্রাহিমের টাকা কোথা থেকে দেবো? সেদিন আমার এই পৃথিবীর প্রতি ঘৃণা জন্মেছিল খুব। যে ঘৃণার আগুনে একটি রাজ্য পুড়ে গেলেও অবাক হতাম না। প্রতারক আমাকে ঠকিয়েছে। আমারও সেদিন সবাইকে ঠকাতে ইচ্ছে করছিল। আমার বিশ্বাসের জায়গায় এ এক অচেনা ঘোর। কেন এমন করে মানুষ? আমার বাংলাদেশের মানুষ? যে বাংলাদেশ নিয়ে আমি প্রতিদিন অনেক স্বপ্ন দেখি।
অবশেষে মনকে বুঝালাম আর ভাবলামÑ প্রতারক মানুষটি আমার সাথে প্রতারণা করেছে ঠিকই; কিন্তু এই কয়দিন আমাকে যে স্বপ্নের ঘোরে বিভোর রেখেছিল, এটাই বা কম কিসের!
নোয়াগাঁও, দেবিদ্বার, কুমিল্লা


আরো সংবাদ