১৫ নভেম্বর ২০১৯

আঁধারের স্বরলিপি : চারাগল্প

-

ছোটবেলায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে খুব করুণ দশায় মাকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখেছে বলে হাসপাতাল জায়গাটাকে খুব অপছন্দ শবনমের। এ ঘটনার পর জীবনে আর কোনো দিন হাসপাতাল মাড়ায়নি সে। অথচ আজ সন্ধ্যায় তাকে তীব্র প্রসববেদনা নিয়ে হাসপাতালে আসতে হয়েছে। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো মা হবে শবনম। আলট্রাসনোগ্রাফির সাহায্যে জানা গেছে এবারো কন্যাসন্তানের মা হবে সে। চার মাস আগে এই বৈজ্ঞানিক সংবাদ জেনে মনটা বেজায় খারাপই হলো শবনমের। এবারো কন্যাসন্তানের মা হবেÑ এ কারণে মন খারাপ নয়, মন খারাপের কারণ হচ্ছে স্বামী এনায়েত। এনায়েত যৌতুক নিয়ে শবনমকে বিয়ে করার পর দাম্পত্য জীবনে শবনমকে অত্যাচারই করেছে বেশি। সুখ দিতে পারেনি। সংসারে স্ত্রী হিসেবে যতখানি মর্যাদা পাওয়ার কথা ছিল, ততখানি মর্যাদা সে পায়নি। দু-দু’বার কন্যাসন্তান জন্ম দেয়ার কারণে সেই অত্যাচার বেড়েছে অনেক। কারণ এনায়েতের স্বপ্ন সে পুত্র সন্তানের বাবা হবে, যাতে বুড়ো বয়সে তার একটি গতি হয়। কিন্তু সন্তান পুত্র না কন্যা হবে, এ ব্যাপারে যে স্ত্রীদের হাত নেই, এ কথা এনায়েতকে বোঝানোর সাধ্য কারো নেই। তার ওপর অনাগত তৃতীয় সন্তানটিও কন্যাশিশু হয়ে পৃথিবীতে আসবে, আলট্রাসনোগ্রাফির এই ভয়াল সংবাদ শবনমকে চিন্তার সাগরে ফেলে দিয়েছে। কারণ এনায়েত আগেই বলে দিয়েছে, ‘এবারো মাইয়া জন্ম দিলে তোদের মা-মেয়েদের কোনো খোঁজ রাখব না। সোজা বাপের বাড়ি চলে যাবি।’
শবনমের প্রসববেদনার চিৎকারে হাসপাতাল কাঁপছে। আগের দুটো মেয়ে তার নরমাল ডেলিভারিতে হলেও একটু আগে ডাক্তার জাবেদ বলেছেন, সিজার ছাড়া গতি নেই। মেয়ের কষ্ট দেখে শবনমের বাবা-মা ডাক্তার জাবেদকে সিজার করানোর ব্যাপারে অনুমতি দিয়েছেন।
অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শবনমকে। শবনম ডাক্তার জাবেদকে অনুনয় গলায় বলল, ‘আমার স্বামীকে একটু কল করে এখানে আসতে বলবেন? অপারেশনের সময় সে যেন আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি ওর হাত ধরে রাখব।’ ডাক্তার জাবেদ বললেন, ‘তা তো সম্ভব নয়। অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তার ছাড়া আর কারো থাকার নিয়ম নেই।’ শবনম ডাক্তারের হাত ধরে বলল, ‘দোহাই আপনার, এই দয়াটুকু করুন। আমি ওকে কল করে আসতে বলব।’ ডাক্তার জাবেদ বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘কিন্তু জীবন-মরণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আপনার এই ইচ্ছে হচ্ছে কেন?’ যন্ত্রণায় কাতরানো শবনমের জবাব, ‘ও আমাকে অনেক অত্যাচার করে। কন্যাশিশু নিয়ে ওর বেশ আপত্তি। ও অপারেশন থিয়েটারে আমার পাশে দাঁড়িয়ে দেখবে মা হতে গিয়ে একজন স্ত্রীকে কী পরিমাণ কষ্ট পেতে হয়। মা হওয়ার যন্ত্রণা আর চিৎকার যদি সব স্বামী শুনত, তবে এ দেশের কোনো মেয়ে স্বামীর দ্বারা লাঞ্ছিত হবে না। ওরা জানবে ওদের সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে আমরা স্ত্রীরা মৃত্যুর কত কাছে চলে যাই।’
শবনমের কথা শুনে ডাক্তার জাবেদ কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারপর বললেন, ‘আপনার ব্যাপারগুলো আমি বুঝতে পেরেছি। যা হোক, আর দেরি করা যাবে না। আল্লাহর নাম ডাকুন।’ শবনমকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো।

২.
রাত ১০টার দিকে জ্ঞান ফিরে শবনম দেখে সে হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে আছে। তার পাশে একটি ফুটফুটে শিশু। তৃতীয়বারের মতো কন্যাসন্তানের মা হয়েছে সে। মেয়ের জ্ঞান ফিরেছে দেখে শবনমের বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা কেটে গেল। কিন্তু দুশ্চিন্তা ভর করল শবনমের মাথায়। এনায়েতকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। নতুন কন্যাশিশুকে নিয়ে শবনম এনায়েতের কাছে কতখানি অনাচার পাবে, সেটা এই বিপন্ন সময়ে এখন আর ভাবতে চায় না শবনম।
মায়ের কাছে শবনম শুনেছে এনায়েতের ফোন নাকি সন্ধ্যার পর থেকে বন্ধ। কোথায় এনায়েত! কাতর চোখে জানালার দিকে তাকায় শবনম। বাইরে রাতের আঁধার। শবনম আঁধারের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার কেন জানি মনে হচ্ছে ওই আঁধারের পথ মাড়িয়ে এনায়েত হাসপাতালের দিকে আসছে, তার হাতের শপিংব্যাগে নবজাতক শিশুর কয়েকটি জামা আর একটি সুন্দর দুধের ফিডার। সন্তানের জন্য যেন এসব নিয়ে আসছে এনায়েত।
শবনম মাকে বলে, ‘এনায়েতকে আবার কল দাও মা।’ রহিমা বেগম জামাইয়ের ফোনে কল দেন। কিন্তু ওপারে এনায়েতের ফোন বন্ধ।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।


আরো সংবাদ