২১ অক্টোবর ২০১৯

জৌলুশ হারাচ্ছে নৌকাবাইচ

-

নদীমাতৃক আমাদের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ আয়োজন, উৎসব ও খেলাধুলা সব কিছুতেই নদী ও নৌকার সরব আনাগোনা। নদীর সাথে বাঙালির মিতালি সুপ্রাচীন। বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহাসিক খেলাগুলোর মধ্যে নৌকাবাইচ অন্যতম। নৌকাবাইচ হলো নদীতে নৌকা চালনার প্রতিযোগিতা। হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংস্করণ বাংলাদেশের নৌকাবাইচ। আজ অধিকাংশ নদীই পানির অভাবে তার নাব্যতা সঙ্কটে। এক শ্রেণী ক্ষমতাবলে, আবার কেউ কৌশল করে নদী ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্পকারখানা বানাচ্ছে। ক্রীড়ামোদীদের প্রত্যাশা, সরকার নদী রক্ষায় আন্তরিকতার পরিচয় দেবে। কারণ, নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আর নদী থাকলে জৌলুশ হারাবে না নৌকাবাইচ।
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কালীগঙ্গা, কান্তাবতী, সুরমা, বুড়িগঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলী, গড়াই, আত্রাই, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, মধুমতি ও আড়িয়াল খাঁ ছাড়াও প্রায় ৭০০টি নদ-নদীর শাখা এ দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। দূষণ আর দখলের ধারাবাহিকতায় এ দেশের অনেক নদ-নদী কেবল ইতিহাসের পাতায়, বেশ কিছু মৃত্যু অভিমুখে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশ নদীর তরঙ্গভঙ্গের সাথে মানিকগঞ্জের মানুষের আশৈশব মিতালি। নদী তাই হয়ে উঠেছে এখানে মানুষের প্রাণোচ্ছল ক্রীড়াসঙ্গী। পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতি, কান্তাবতীবিধৌত মানিকগঞ্জের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ আয়োজন, উৎসব ও খেলাধুলা সব কিছুতেই নদী ও নৌকার সরব আনাগোনা। নৌকাবাইচ আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতির একটি অংশ। শত শত বছর ধরে এটি চলে আসছে। কিন্তু বর্তমান যান্ত্রিক যুগে এসে বাঙালির প্রাচীন এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।
আল্লায় বলিয়া নাও খোল রে/ভাই সক্কলি।
আল্লাহ বলিয়া খোল/ওরে আল্লাহ বল নাও খোল/শয়তান যাবে দূরে।
নৌকাবাইচের সময় মাঝি-মাল্লারা সমবেত কণ্ঠে যেসব গান গায়, এটি অন্যতম জনপ্রিয় সারিগান। শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ, সবাই আগ্রহ নিয়ে ছুটে চলেন নৌকাবাইচ দেখতে। প্রমত্তা নদীবক্ষে সঙ্গীতের তাল-লয়ে মাঝি-মাল্লাদের বৈঠার ছন্দময় প্রতিযোগিতায় নদী-পানি আন্দোলিত করে যে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা হয়, তা অতুলনীয়। আবেগ-উত্তেজনার নৌকাবাইচ হয়ে ওঠে মানুষের নির্মল আনন্দের খোরাক।
নৌকাবাইচ সমন্ধে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মাঝে জনশ্রুতি আছে, জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়। এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এ থেকে কালক্রমে নৌকাবাইচের শুরু। অন্য একটি জনশ্রুতি হলো, পীর গাজীকে কেন্দ্র করে। আঠারো শতকের শুরুর দিকে কোনো এক গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ে থাকা তা ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোনো নৌকা ছিল না। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখন নৌকাটি মাঝনদীতে এলো, তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হলো। নদী ফুলে, ফেঁপে উঠল। তখন চার পাশের যত নৌকা ছিল, তারা খবর পেয়ে ছুটে আসে। সারি সারি অজস্র নৌকা একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। এ থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়। আবার অনেকের মতে, মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌকাবাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল। নবাব বাদশাহদের নৌবাহিনী থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত মারফত জানা যায়, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরাই এই খেলাটির প্রচলন করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে এক ধরনের নৌকাবাইচের আয়োজন করত। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীলনদের পানিতে নৌকা চালনা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর ছড়িয়ে পড়তে থাকে এর প্রসার। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতাটি এখনো ব্যাপক জনপ্রিয়। ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় নৌকাবাইচ অন্তর্ভুক্ত আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ সংস্কৃতি এখন চালু রয়েছে।
বাইচের নৌকা হয় সরু ও লম্বাটে। কারণ, সরু ও লম্বাটে নৌকা নদীর পানি কেটে দ্রুতগতিতে চলতে সক্ষম। বিভিন্ন আকৃতির নৌকা সমবেত হয় বাইচ প্রতিযোগিতায়। ছিপ, বজরা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না, পানসি, কোষা, ডিঙ্গি, পাতাম, বাচারি, রফতানি, ঘাসি, সাম্পান ইত্যাদি নৌকা বাইচে অংশ নেয়। একেকটি লম্বায় প্রায় ১০০ থেকে ২০০ ফুট হয়। নৌকার সামনে সুন্দর করে সাজানো হয় এবং ময়ূরের মুখ, রাজহাঁসের মুখ বা অন্য পাখির মুখের অবয়ব তৈরি করা হয়। দর্শকদের সামনে দৃষ্টিগোচর করতে নৌকাটিকে উজ্জ্বল রঙের কারুকাজ করা হয়। গায়না তরী, সোনার চান, মায়ের দোয়া, হারানো মানিক, দুই ভাই, সোনার বাংলা, রিয়াদ এন্টারপ্রাইজ, হাজারী তরী, আল্লাহর দান, শোকচাঁন তরী, অগ্রদূত, ঝড়ের পাখি, পঙ্খীরাজ, ময়ূরপঙ্খী, সাইমুন, তুফানমেইল, জয়নগর, চিলেকাটা, সোনার তরী, দীপরাজ ইত্যাদি নামকরণ করা হয়।
বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বালিরটেক কালিগঙ্গা নদীতে অনুষ্ঠিত হয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। প্রতি বছরের মতো এবার ভাড়ারিয়া, হাটিপারা ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী এলাবাসীর যৌথ উদ্যোগে এ নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়। রঙ-বেরঙের বাহারি ধরনের নৌকায় বালিরটেকের কালিগঙ্গা নদী উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। মানিকগঞ্জের ঝিটকায় ইছামতি নদীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ দেখতে হাজারো মানুষের উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়।
বাইচের নৌকার জনপ্রিয় মাল্লা হরিরামপুরের ছাত্তার মাদবর বলেন, নৌকায় ওঠার ক্ষেত্রে রয়েছে নানান আনুষ্ঠানিকতা। সকলে পাক-পবিত্র হয়ে গেঞ্জি গায়ে মাথায় একই রঙের রুমাল বেঁধে নেয়। সবার মধ্যখানে থাকেন নৌকার নির্দেশক। প্রতিটি নৌকায় ৫০ থেকে ১০০ জন মাঝি থাকে। যে কেউই নৌকার মাঝি হতে পারবে না। মাঝি হতে হলে তাকে একটু হৃষ্টপুষ্ট হতে হয়। ছয় মাস আগ থেকেই বাছাই করা হতো মাঝিদের। নৌকা তৈরিতে শাল, শীল কড়ই, চাম্বল, গর্জন ইত্যাদি কাঠ ব্যবহার করা হয়।
ঘিওর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট ক্রীড়া পৃষ্ঠপোষক অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান হাবিব নৌকাবাইচের স্মৃতিচারণ করে জানান, নৌকাবাইচে ব্যবহৃত সব গানে প্রাণবন্ত ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সুর থাকে। আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য নৌকাবাইচ নানা প্রতিকূলতার পথ পাড়ি দিয়ে আজ ক্লান্ত। হারিয়ে যেতে বসেছে মেহনতি মানুষের শ্রম, ঘাম, উৎসাহ-উদ্দীপনা, আনন্দ আর উত্তেজনার খেলা নৌকাবাইচ। উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন নৌকার মালিকেরা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।

 


আরো সংবাদ