২১ অক্টোবর ২০১৯

ক্ষত : চারাগল্প

-

সোহানার সাথে রাশেদের পরিচয় আজ থেকে বছরখানেক আগে। দু’জনের ফেসবুকে পরিচয় হয়, সেখান থেকে মন বিনিময়। সোহানার সাথে চ্যাটিং করতে করতে রাত পেরিয়ে কখন সকাল হয়ে যায়, টেরই পায় না দু’জন। ফোনে সোহানার কণ্ঠস্বর শুনে রাশেদ প্রতিনিয়তই অবাক হয়। মাঝে মধ্যে রাশেদ সোহানার সাথে কথা বলার সময় কথা বলার মাঝখানে সোহানাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘এই তোমার গলা এত মিষ্টি কেন?’ সোহানা হেসে হেসে বলে, ‘তুমি কি আমার গলা শোনো, না খাও?’ দু’জনের মধ্যে রসিকতা করতে করতে কোথা থেকে সময় পেরিয়ে যায়, কেউই বুঝতে পারে না। রাশেদ সোহানাকে কড়াকড়িভাবে বলে দিয়েছে, ‘অনেক হয়েছে, এবার তারা দেখা করবে।’ সোহানা রাশেদের অনেক জোরাজুরির পর এ প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে।
দেখতে দেখতে শনিবার চলে এলো। সোহানার কথা মতে, রাশেদ চলে গেল তাদের নির্ধারণ করা স্থানে। অনেকক্ষণ হয়েছে রাশেদ একা একা দাঁড়িয়ে আছে। সোহানার আসার নামগন্ধও নেই। রাশেদ বিরক্ত হয়ে গেল। এদিকে সোহানাকেও ফোন দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। সময় যাচ্ছে। রাশেদ এদিক-ওদিক পায়চারি করছে। তাহলে সোহানা কি তার সাথে মিথ্যা কথা বলেছে? রাশেদের ভীষণ রাগ হতে লাগল। এভাবে কেটে গেল ঘণ্টা দেড়েক। রাশেদ সিদ্ধান্ত নিলো, এখানে থাকার কোনো মানেই হয় না। রাশেদ রেগেমেগে আগুন হয়ে যখন সে স্থান ত্যাগ করতে যাবে, অমনি পেছন থেকে ডাক এলো এক নারীকণ্ঠের। রাশেদ পেছনে তাকাল। একজন তরুণী রাশেদকে ডাকছে। মেয়েটি বললÑ ‘এই যে শুনুন, আপনি কি রাশেদ?’ যে তরুণী রাশেদকে ডাক দিয়েছে তার গায়ে কালো রঙের বোরকা, মুখটা কালো নেকাব দিয়ে ঢাকা।
রাশেদের বুঝতে বাকি রইল না তার সামনে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, সে-ই সোহানা। রাশেদ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। দু’জন একটি বেঞ্চে বসে আছে।
দু’জনের মধ্যে আলাপন হলো বেশ কিছুক্ষণ। কোথা থেকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। সোহানা রাশেদকে বলল, ‘সন্ধ্যে হয়েছে। এবার আমাকে উঠতে হবে।’ রাশেদ সোহানাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আজ আমাদের প্রথম দেখা হয়েছে। এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে?’
সোহানা চলে গেল। রাশেদও হাঁটছে বাড়ির পথে। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হলো। রাশেদের মনে হলো, সোহানার মুখটা এখনো দেখা হয়নি। রাশেদ কথা বলতে এতই ব্যস্ত ছিল যে, সোহানার মুখটাই তার দেখা হয়নি। তবে রাশেদ সোহানার চোখ দেখেই বুঝে ফেলেছে সোহানা সুন্দরী। রাশেদ সোহানার চোখের প্রেমে পড়ে গেছে।

২.
পেরিয়ে গেল এক সপ্তাহ। আজ আবারো দু’জন দেখা করতে এসেছে। রাশেদ সোহানার চোখের দিকে তাকাচ্ছে বারবার। মেয়েদের চোখের দিকে সহজে তাকানো যায় না, কিন্তু রাশেদ তাকাচ্ছে। সোহানাও রাশেদের চোখে চোখ রাখছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই, সোহানার ভালো লাগছে রাশেদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে। হঠাৎ সোহানা চোখ সরিয়ে ফেলল। কেমন বিষণœ হয়ে পড়ল সোহানা। কিছু না বলে বেঞ্চ থেকে উঠে হন হন করে হাঁটতে লাগল। রাশেদ হতভম্ব হয়ে গেল।
বাসায় এসে সোহানা কাঁদল অঝোরে। সোহানা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রাশেদকে কাছ থেকে বড়সড় একটা কথা লুকিয়েছে সোহানা। এবার রাশেদকে সত্যি কথাটা বলবে সোহানা। সাথে সাথে রাশেদকে ফোন দিলো সোহানা। বলল, ‘কাল বিকেলের দিকে আমরা দেখা করব।’ রাশেদ কিছু বলার আগেই সোহানা ফোন কেটে দিলো।
৩.
রাশেদ হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোহানা নেকাব আটকাচ্ছে। এত দিন এ কার সাথে প্রেম করছিল রাশেদ? এই সেই সোহানা? যার মুখ ঝলসানো। যার সারাটা মুখজুড়ে ক্ষতের দাগ। রাশেদ কী বলবে বুঝতে পারছে না। রাশেদ কিছু না বলেই হাঁটা দিলো, সোহানা চোখ মুছতে মুছতে উল্টো পথে হাঁটা দিলো। সে এই মুখ আর কাউকে দেখাবে না। কাউকে না।
সাত বছর আগের ঘটনা। সোহানার বাবার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া হতো তাদের। সোহানা ছোটবেলা থেকেই সুন্দরী ছিল। তার চোখ ছিল টানা টানা। জন্মের পর তার বাবা সোহানাকে বলেছিলÑ এ আমার মেয়ে নয়; এ রাজকন্যা! একদিন স্কুল থেকে ফিরছিল। হঠাৎ করে কিছু বখাটে এসে সোহানার মুখে এসিড ছ্ুেড় পালায়। সোহানা চিৎকার করতে থাকে। তার চেহারা ঝলসে যায় নোংরা মানুষের ছোড়া এসিডে, যার ক্ষত আজো বয়ে বেড়াচ্ছে সোহানা।
বাংলাবাজার, সদর, বরিশাল


আরো সংবাদ