২১ নভেম্বর ২০১৯

নীল ওড়না

চারাগল্প
-


নীলা আদুরে গলায় বলল, এ্যাই ! শুনো ?
আমি বললাম, হুমমম, বলো।
আমি স্কার্ফ পরতে চাই। একটা স্কার্ফ কিনে দিবে?
আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, স্কার্ফ পরবে, তুমি ?
ও চোখ দুটো টানটান করে বলল, হুমমম। কেন? আমি স্কার্ফ পরলে কোনো সমস্যা?
নাহ, নাহ। আমার কোনো সমস্যা নেই।
তাহলে দাও না একটা স্কার্ফ কিনে।
নীলার গলাটা অমায়িক। সুমিষ্টি। বেশ আদুরে। ও যখন কোনো কিছু নেয়ার জন্য আবদার করে, তার গলাটা আরো আদুরে হয়ে যায়। বেশ টেনে টেনে আদরমাখা গলায় আবদার।
খুব ভালো লাগে আমার। আমি গলে যাই। একদম মমের মতো। না করতে পারি না। আজো পারলাম না। বললাম, বেশ, আমি অফিস শেষে ফেরার পথে একটা স্কার্ফ নিয়ে আসব।
নীল রঙেরটা নিও।
বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল আমার। নীল রঙ!
নীল রঙ পছন্দ করত সোহানী। সব সময় তার পোশাকে নীলের একটা ছটা থাকতই। ওর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল ফেসবুকে। পরিচয় থেকে সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হতে বেশি সময় লাগেনি। আচমকা ও একদিন আমার ঠিকানায় একটা নীল রঙের টি-শার্ট পাঠিয়ে দিয়ে বলল, শোনো, আমরা কাল রজনীগন্ধা পার্কে মিট করব। তুমি এই নীল টি-শার্ট পরে আসবে। আমি পরব নীল শাড়ি আর নীল টিপ।
রজনীগন্ধা পার্কের একটু দূরে জ্যামে আটকে পড়লাম আমি। সামনের রাস্তা ব্লক। তারও সামনে মানুষের জটলা।
ট্যারা টাইপের একলোক চিল্লায় বলল, এই যে ভাই, সিএনজি থেকে নেমে হেঁটে যান। সামনে একটা মাইয়্যা এক্সিডেন্টে মারা গেছে। ওদিকে আর সিএনজি যাবে না।
নেমে পড়লাম। এইটুকু তো পথ। হেঁটেই যাই।
মানিব্যাগ বের করে সিনএনজি ভাড়া দিচ্ছি। তখনই কানে এলো কথাটা। শুনে কান ভনভন করে উঠল আমার।
আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক মুরুব্বি বললেন, আহা রে কী সুন্দর মাইয়্যাডা! নীল শাড়ি পরে কী সুন্দর লাগছিল! মনে হয় পরী। একটা ডানা কাটা নীল পরী! এত সুন্দর মাইয়্যাডা এক্সিডেন্টে মরে গেল।
নীল শাড়ি পরা মাইয়্যা! আমার সোহানী নয় তো? বুকে হাতুড়ি পেটা শুরু হলো। ওরই তো আজ নীল শাড়ি পরে আসার কথা। মানুষের জটলা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম আমি। সোহানী! আমার সোহানী!
হাঁটু গেড়ে ধপাস করে বসে পড়লাম সোহানীর পাশে। শুধু শরীরে নয়, আমার মনেও নীল পোশাক পরিয়ে চলে গেল ও।
কেটে গেল ক’টা বছর।
তারপর আচমকা পরিচয় হলো নীলার সাথে। আমাদের এখন ডেটিং হয় নিয়মিত। অফিস শেষে ঘুরে বেড়াই, গল্প করি, আড্ডা মারি।
আমি ফ্যাকাসে হেসে বললাম, নীল রঙটায় তোমার পছন্দ হলো?
নীলা বলল, হুমম। নীল রঙটা আমার ভীষণ পছন্দ।
সত্যিই মেয়েটার পছন্দ আছে। আজও আমারই দেয়া নীল রঙের স্কার্ফ পরে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নীল রঙের স্কার্ফ পরলে কোনো মেয়েকে যে এত সুন্দর লাগে, আমি আজ নীলাকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি নীলার দিকে।
নীলা নিরুত্তাপ। কাঠের পুতুলের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। কোনো কথা বলছে না ও।
কী হয়েছে নীলা? মুড অফ কেন? কোনো প্রোবলেম?
নীলা আস্তে করে বলল, সরি, নিলয়।
মানে? বুকটা ধক করে উঠল আমার। সরি মানে কী?
তোমাকে আসলে একটা কথা বলাই হয়নি।
মানে ? কী কথা?
পারিবারিক সিদ্ধান্তে আমাকে অন্য একটি ছেলেকে বিয়ে করতে হচ্ছে। তাই তোমার সাথে আর রিলেশনশিপ রাখতে পারছি না। সরি।
নীলা আর আমার মুখের দিকে তাকাল না। মাথা নিচু করে ঘুরে পেছন ফিরে হাঁটতে লাগল।
আমার পা দুটো থরথর করে কাঁপতে লাগল। পায়ের নিচের মাটিগুলো যেন ক্রমেই সরে যেতে লাগল। আমি আর পারলাম না। ধপাস করে বসে পড়লাম মাটিতে। হাতুড়ি পেটা বুকে কেঁদে উঠলাম ডুকরে।

 


আরো সংবাদ