১২ ডিসেম্বর ২০১৯

স্বাক্ষর সংগ্রহকারী হুমায়ূন কবীর

-

অনেক আশা-আকাক্সক্ষা আর ছোট ছোট অনেক রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা গিয়েছিলাম। ভালো একটা চাকরির যোগাযোগ প্রায় ফাইনাল। ১ তারিখে ডিউতিতে যোগ দিতে হবে। ২৮ তারিখ নাইটে রওনা হলাম। সাথে ঋতুকেও নিলাম। ঋতু আমার মতো এক হতভাগা বেকারের বউয়ের নাম। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এই মানুষটাকে বড্ড ধৈর্য দিয়েছেন। তাই তো তিনটি বছর আমার সাথে কাটিয়ে দিয়েছেন চোখবুজে। এর আগে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন যোগাযোগে চাকরি করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার, চাকরি সর্বোচ্চ এক মাসের বেশি থাকে না। কোনো-না-কোনো সমস্যার জন্য চাকরি চলে যেতেই হবে। এটা যেন আমার বেলায় এক ধরাবাঁধা রুটিন। আর বাড়ি ফিরলে মানুষের কত যে রঙ্গরসের কথা শুনতে হয়। বাড়ি ফেরার পর একজন বলে, বউ রেখে থাকতে পারিনি। কেউ বলে, কোথাও নাকি কালি পড়ে না। এত মানুষ ঢাকা গিয়ে এত চাকরি করছে, ঢাকা ইনকাম করে ভাগ্য বদলাচ্ছে আর তোমার কিছু হয় না। সব কথা সহ্য করা গেলেও বউ রেখে থাকতে পারি নাÑ এ কথা যতটা না লজ্জা দেয় আর থেকে বেশি কষ্ট দেয়। এসব ভেবেই ঋতুকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম এবার। দুই মাস ১৭ দিন একটা সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে প্যাকিংয়ের কাজ করেছিলাম। এই ক’দিনে ৫৮টা নাইট করেছি। খাওয়ার কষ্ট আর মানসিক কষ্টে আমার আর ঋতুর শরীরের অবস্থা হয়ে দাঁড়াল শোচনীয়। বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি এসে ডাক্তার দেখিয়ে ধরা পড়ল জন্ডিস, টাইফয়েড জ্বর, সাথে লিভারে কিঞ্চিৎ সমস্যা। ১৮ হাজার টাকার চাকরি করে রোগে নিয়ে গেল তারও বেশি। ডাক্তার বিরাট এক বিধিনিষেধনামা ধরিয়ে দিলেন হাতে। এটা খেতে মানা, ওটা খেতে মানা। একদম ঠাণ্ডা খাবার খেতে হবে। সাথে ফুল রেস্ট। রেস্ট করা আমার পক্ষে অসম্ভব কাজ। বাড়িতে শুয়ে থাকলে মনে হয়, রাস্তায় গেলে একটু ভালো লাগত। আবার রাস্তায় এলে মনে হয়, যদি বাড়িই থাকতাম তাহলে ভালো লাগত। এই করে কেটে গেল আরো দুই মাস। রোগের কোনো পরিবর্তন নেই। শরীরর দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। বাজার থেকে নানাজনের ফোন আসে রোজ। অনেক দিন দেখা হয় না। বাজারে যেতে বলে। কিন্তু মা কিছুতেই যেতে দেন না। সেদিন সকালে মা নিয়ে গিয়েছিলেন হুজুরের কাছে দোয়া আনতে। সেই সুবাদে বাজারে গিয়ে ফেরার সময় মাকে এটা-ওটা বলে বাড়ি পাঠিয়ে বন্ধু সেলিম আর বড় ভাই সেলিম তিনজনে এক জায়গায় হলাম। সেলিম ভাই বলল, অনেক দিন পড়ে চল হাবিবের দোকানের চা খাবো তিন ভাই একসাথে বসে। যেমন কথা তেমন কাজ। হাজির হলাম হাবিব ভাইয়ের চায়ের দোকানে। হঠাৎ চোখে পড়ল হাবিব ভাইয়ের চায়ের দোকানের বাইরের মাচালিতে বসে আছেন প্যান্ট-শার্টে ইন করা ভদ্রলোক। সাথে একটা ব্যাগ। ব্যাগ থেকে একটা একটা করে ফাইল বের করছেন আর এক-একজনের কাছে গিয়ে কলম ধরিয়ে বলছেন, একটা স্বাক্ষর করতে ব্যাংকের সুপারিশের জন্য। প্রথমে ভাবলাম হয়তো হতে পারে। তবে যখন দেখলাম কেউ দিতে চাইছে না, তখন বুঝলাম একটু সমস্যা আছে। পড়ে বুঝলাম, মাথায় থোড়াছা সমস্যা। আমার কৌতূহল বাড়তে লাগল। হাবিব ভাই দেখলাম কবীর ভাই বলে সম্বোধন করে নিজে জিজ্ঞেস করল, আর কতজনের স্বাক্ষর হলে ব্যাংক লোনটা দিতে পারে? হতাশায় ভরা মুখে কবীর নামক মানুষটি কপাল ঘুচে বললেন, পাঁচ শ’ লোকের স্বাক্ষর আছে আর অল্প কিছু হলেই ব্যাংক লোনটা ফাইনাল হবে। তারপর আর কোনো সমস্যা থাকবে না। এবার হাবিব ভাইয়ের কাছ থেকে ধারণা নিলাম। হাবিব ভাই আমাকে সাহায্য করলেন। আমার বন্ধু ও বড় ভাইও এসব ব্যাপারে বরাবরই সাহায্য করেন। তার নাম হুমায়ূন কবীর। মেধাবী একজন মানুষ। ভালো একটা এনজিওতে বড় পদে চাকরি করতেন। অত্যন্ত সৎ ও সহজ সরল ভদ্র এ মানুষটিকে তার কলিগরা ষড়যন্ত্র করে কয়েক লাখ টাকার দেনায় ফাঁসিয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেছেন। চাকরি যাওয়ার পর থেকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে এ অবস্থায় ঠেকেছেন। হাবিব ভাইয়ের কাছ থেকে উঠে গিয়ে বসলাম ভদ্রলোকটির পাশে। প্রথমে কথার উত্তর দিতে না চাইলেও যখনই বললাম কাগজ-কলম দেন আমি স্বাক্ষর করব, সাথে আরো দু’জন। সাথে সাথে ব্যাগ খুলে ফাইলপত্র বের করে কলম হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, যেখানে খুশি করেন। করলেই হবে। কাগজের দিকে তাকাতেই কেমন যেন টাসকি খেয়ে গেলাম। অসাধারণ হাতের লেখা। ঠিক যেন টাইপ মেশিনে টাইপ করার মতো। শত শত স্বাক্ষরের মধ্যে বসিয়ে দিলাম আমিসহ তিনজনের স্বাক্ষর। কথায় কথায় জানতে পারলাম তার বয়স ফোরটি ফোর। ব্যাগের ভেতরের কাগজপত্র দেখতে চাইলে বের করে দিলেন। দেখলাম হাতে লিখেই তৈরি করে রেখেছেন ব্যাংক প্রত্যয়নপত্র থেকে শুরু করে এনজিও সেক্টরের সকল প্রকার ফরম। চা খেতে বললে তিনি বললেন, এত টাকা তো আমার নেই। অল্প কয়েক লাখ টাকার মতো আছে হাতে। আর কয়েক লাখ টাকা হলেই ঋণটা শোধ করে নিজে একটা কোম্পানি খুলে বসব। হাবিব ভাই চা দিলেন। তিনি নিতে চাইলেন না। হাবিব ভাই বুঝিয়ে বললেনÑ কবীর ভাই, আপনার টাকা দেয়া লাগবে না। আমি আপনাকে ভালোবাসি তাই ফ্রি খাওয়াতে চাইছি। এরপর খেলেন। এভাবেই কত যে সহজ সরল মেধাবী হুমায়ূন কবীর নিজের সরলতার কারণে প্রতারণার জালে পড়ে জীবন নামের নৌকা থেকে ছিটকে গভীর সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে শেষ হয়ে যান, তার হিসাব কে রাখে?
শালিখা, মাগুরা


আরো সংবাদ