১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

আমার বন্ধুরা

জীবনের বাঁকে বাঁকে
-

দারুণ ব্যস্ততার মধ্যে সপ্তাহ টা কাটালাম। আমরা ভার্সিটি জীবনের চার বান্ধবী শেলি, বুলা, লিসা ও নিরু। আমি ছাড়া, বিয়ের পর বাকি তিনজনই দেশের বাইরে ছিল। লিসা কয়েক বছর ধরে দেশেই থিতু হয়েছে। বুলা আসা-যাওয়া করে কানাডায়, দেশে কারণ ওখানে ওর মেয়েরা থাকে। শেলি লন্ডনে। আর আমি তো ‘পেরাইমারির ঘণ্টা পিটাই’ তাই দেশেই তথা স্বামীর অঞ্চল শেরপুরে অবস্থান। ফুফাজান (শেলির আব্বা) সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন মনে কর তুইও বাইরেই থাকিস, ঢাকার বাইরে তো! ওদের মতোই আর কী! এ যে সান্ত্বনার বাণী তা কি আর বুঝতে বাকি ছিল! ওরা যখনি দেশে আসত প্লেন করে একসাথে আমরা একত্র হতাম, ওই সময় স্বামী সন্তান সব ভুলে যেতাম, সারা দিন হইচই-আড্ডা-ঘোরাঘুরি কোনোটাই বাদ যেত না। এখন আমার হাজবেন্ড, সাথে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া, বিয়েশাদি সব মিলিয়ে আমার দুটো সংসার সামাল দিতে হয়, এরই মধ্যে শেলির আগমন। ছুটে এলাম ছুটি নিয়ে।
সব সময় আম্মা, আপা বা ভাই-বোনদের বাসায় গেট টুগেদার হয়েছে। এবার সুযোগ পেলাম নিজের বাসায় শেলির অছিলায়। শেষ দিন ছিল বুলার বাসায় উত্তরায়। ওখান থেকেই শেলি উড়াল দিলো লন্ডনের পথে, রেখে গেল অনেক নছিহত, দিয়ে গেল বিরাট দায়িত্ব। সেটি আর কিছুই নয় কুরআনের ওপর আমল। ওর ইচ্ছা শুধু সংসার নিয়ে ব্যস্ত না থেকে আমরা যেন একটু কুরআন চর্চা করি,পারলে অন্যদেরও শেখাইÑ আর এ ব্যাপারে দায়িত্ব নিয়ে উদ্যোগী হই।
ওরা ওদের ওখানে নিয়মিত কুরআন চর্চা করে থাকে; যা ওর অভিলাষ আমরাও যেন পিছিয়ে না থাকি এ কাজ থেকে। ওদের পদ্ধতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেলি জানাল ওরা চারভাবে করে থাকে এ কাজটিÑ ১. সহি শুদ্ধ তেলওয়াত শিক্ষা; ২. তাজবিদ বা গ্রামার শিক্ষা; ৩. ব্যক্তিজীবনে কার্যকরী করা। যেমনÑ সুদের আয়াত জানল অ¤িœ সুদের সব লেনদেন বন্ধ করে দিলো, পর্দার আয়াত জানল সাথে সাথে পর্দার বিধান মেনে নিলো; এবং ৪. তার পর দাওয়াত দান।
৩ নম্বর টাই হলো ওদের আসল তারবিয়াত। এ প্রসঙ্গে শেলি আমাদেরে একটা চমৎকার কাহিনী শোনাল, যা শুনে আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। এক আফ্রিকান দম্পতি। নতুন মুসলিম হয়েছে। ভার্সিটিতে পড়াকালীন সময় থেকেই তারা পরস্পর পরস্পরকে পছন্দ করত। কিন্তু তাদের ইচ্ছে হলো ধর্মান্তরিত হবে। এর মধ্যে ছেলেটি খ্রিষ্টান আর মেয়েটি বংশগত মুসলিম। এ ব্যাপারে ওরা লন্ডনের কোনো এক আলেমের কাছ থেকে জানল দু’জনকেই যেকোনো একটি ধর্মে আসতে হবে নতুবা বিবাহিত জীবন হারাম বলে গণ্য হবে। ওরা যাচাই-বাছাই করে ইসলামকেই কবুল করে বিয়ে করল এবং ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বাড়ি কিনে বসবাস শুরু করল। ওদের দুটো সন্তান হলো। যেদিন শেলির ক্লাসে এসে মেয়েটি কুরআন শেখার সাথে সাথে জানতে পারল ইসলামে সুদ হারাম, তৎক্ষণাৎ বাসায় গিয়ে হাজবেন্ডকে জানাল। কোনো রকম বাহানা না করে ওই দম্পতি সুদমুক্ত হওয়ার জন্য ব্যাংকলোন শোধ করতে বাড়ি বিক্রির টু-লেট টানিয়ে দিলো এমনকি ছোট একটি বাসা নিয়ে কোনোভাবে পরবর্তী জীবন কাটাল। শেলি লন্ডনে একটা সাপ্লিমেন্টারি স্কুল দিয়েছে যেখানে উপরি উক্ত নিয়মে ও পড়িয়ে থাকে। আজ থেকে বারো বছর আগে লন্ডনের বুকে প্রথম একজন বাঙালি মুসলিম নারীর সাপ্লিমেন্টারি স্কুল এটিই। এখানে শিক্ষার্থীদের ছুটির দিনগুলোতে কুরআন ক্লাস নেয়া হয় উপরি উক্ত নিয়মে। পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও শেখার সুযোগ করে দিয়েছে। মেয়েদেরকে নিয়েই শেলি ওর স্কুলটি চালায়।


আরো সংবাদ