০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

সাদা জামা

চারাগল্প
-

ছোটবেলা বাবাকে হারিয়েছে সোহেল। তার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সময় মৃত্যুবরণ করেন। তখন সোহেলের মা ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পিতা হারানোর ব্যথা সোহেলের মনে বেশি মর্মান্তিক হয়ে দেখা দিতে পারল না। সোহেল ভূমিষ্ঠ হওয়ার চার মাস আগেই সখিনা বেগমের পড়তে হয় সাদা শাড়ি। বিধবা মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মানুষ করতে লাগল সোহেলকে। তবে মাত্র চতুর্থ শ্রেণীতে পা রাখল সোহেল। ১৯৮১ সাল, কিছু দিন পরই স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। পুরো বাংলাদেশের মতো স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের প্রভাব পড়ল সোহেলের স্কুলে। প্রধান শিক্ষক ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে জানিয়ে দিলেন স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে তোমাদের স্কুলে খেলা হবে। যারা খেলায় অংশগ্রহণ করতে চাও তারা কালো প্যান্ট ও সাদা জামা পরে আসবে।
ছুটির ঘণ্টা বাজতে না বাজতে দৌড়ে ছুটতে লাগল সোহেল বাড়ির দিকে। চৈত্রের প্রচণ্ড তাপ উপেক্ষা করে চলছে তো চলছেই। কড়া রোদে গরম হয়ে ওঠা আপেলের মতো কচি গাল দিয়ে ঝরে পড়ছিল অসংখ্য ঘামের বিন্দু। তবুও মুহূর্তের জন্য থামল না সে। মাকে গিয়ে এখনই বলতে হবেÑ স্বাধীনতা দিবসে তার সাদা জামা চাই। নইলে আমি কোনো খেলায় অংশগ্রহণ করতে পারব না। অন্য সবাই খেলা দিয়ে জয়ী হবে আর আমি দেখব তা হবে না। সোহেল আরো দ্রুত দৌড়াতে লাগল, ঘরের প্রান্তে এসেই ডাকল : মা, মা-গো।
দু’প্রান্তে উঁচু দু’টি রেললাইন। মাঝেখানে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। উত্তর কিংবা দখিনা বাতাস মোটেও ফাঁকা জায়গাটি স্পর্শ করতে পারে না। তালপাতার ছাউনি আর পলিথিন দিয়ে বাঁধা বেড়ার আড়াল থেকে মাÑ কী হয়েছে বাবা। এ সকালে চলে এলি যে? ইস ঘেমে একেবারে পুকুর হয়ে গেলি। যা বাবা ওই ডোবাতে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে আয়।
সোহেল : ও, পরে হবে। তার আগে আমার কথা শুনো; স্বাধীনতা দিবসে আমাদের স্কুলে খেলা হবে। আমি খেলা দেবো। তোমাকে একটা সাদা জামা এনে দিতে হবে। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলÑ সাদা জামা! হ্যাঁ। সাদা জামা। সাদা জামা না হলে আমি কিছুতেই স্বাধীনতা দিবসে খেলায় অংশগ্রহণ করতে পারব না।
সখিনা বেগম ভাবতে লাগলেন এ মুহূর্তে কী করে সে তার ছেলের আবদার রক্ষা করবে। অথচ অনেক দিন হয় সোহেল ছেঁড়া জামা পরে স্কুলে যায়। কী করবেন তিনি। তাই তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে সোহেলের ঘাম মোছেন আর বলেন, তুই বাবা তোর স্যারকে বুঝিয়ে বলিস আমরা খুব গরিব। এ সময় আমাদের সাদা জামা কেনা সম্ভব নয়। কিন্তু সোহেল বেঁকে বসলÑ না, না আমি কিছুই বুঝি না। যে করেই হোক আমার সাদা জামা চাই। স্কুলে ছেলেরা কত সুন্দর সুন্দর জামা পরে আসে আর আমি শুধু একটি ছেঁড়া জামা পরে প্রতিদিন স্কুলে যাই। আমি তো সুন্দর সুন্দর জামা চাইনি, শুধু একটা সাদা জামা চেয়েছিÑ বলতে বলতে সোহেল কাঁদতে লাগল। সোহেলের চোখের জল আর কাউকে স্পর্শ করতে না পারলেও স্পর্শ করেছে মায়ের কোমল হৃদয়কে। ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হচ্ছে আর ভাবছে।
একমাত্র বুকের ধন সোহেল। তার অভিমান ভরা কথাগুলো অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু কোনো উপায় তো আমি দেখছি না। আমার একমাত্র চোখের মণি এ সোহেল। কিন্তু তাকে জামাকাপড় দেয়া তো দূরের কথা, ঠিকমতো দু’মুঠো ভাত দিতে পারি না। তবুও জমাট বাঁধা কান্নাকে গোপন করে সখিনা বেগম বললেনÑ তুই তো সবই জানিস কত কষ্ট করে তোকে লেখাপড়া শেখাচ্ছি। আর কয়টা দিন অপেক্ষা কর, তোকে ঠিকই সাদা জামা এনে দেবো। সোহেল গাল ফুলিয়ে বলল, কয়টা দিন পরে জামা দিয়ে কী করব? তোমায় আমি বলে দিচ্ছি মা, যদি এ দুই দিনের মধ্যে সাদা জামা না পাই তাহলে আমি আর স্কুলে যাবো না। আমাকে খুঁজেও পাবে না। মা অনেক ভেবেচিন্তে বললেন, দেখি তোর সেলিম চাচার বাড়ি গিয়ে তার ছেলের কোনো সাদা জামা পাইনি।
সান্ত্বনার বাণীর কানে নিয়ে সোহেল পরের দিন স্কুলে যাচ্ছে। অতীত দিনের মতো তার মনে এখন আর আনন্দ নেই। স্কুলে যেতে যেতে সে ভাবল স্বাধীনতা দিবসে সে নিশ্চয়ই খেলায় জয়ী হবে। সবার সামনে থেকে পুরস্কার নিয়ে আসবে। ওহ, কী মজা হবে। আর মা তা দেখে কতই না খুশি হবে! ক্লাসে বসাকালীন হঠাৎ করে সোহেলের চোখের পর্দায় ভেসে উঠল মায়ের মলিন মুখখানা। ভাবতে লাগল মা কোথায় থেকে সাদা জামা জোগাড় করবে। এ ভেবে সোহেল স্যারকে তার সাদা জামা নেই বলতে লাগল। স্যার সোহেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তোমাদের অবস্থা আমি জানি, তোমার সাদা জামা লাগবে না। তুমি সাদা জামা ছাড়াই খেলা দিতে পারবে। স্যারের কথার সাথে মায়ের করুণ মুখখানা মুহূর্তে আবার চোখের পর্দায় ভেসে উঠল। ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে মাকে বারণ করি আমার সাদা জামা লাগবে না, সেলিম চাচার বাড়িতে যেতে হবে না। কিন্তু স্কুল ফাঁকি দেবো, না। তাই ভেবে সোহেল চুপ হয়ে যায়।
ছুটির ঘণ্টা বাজছে আর সোহেল তার কুঁড়েঘরের দিকে ছুটতে লাগল। তার মনে আজ আনন্দের শেষ নেই। গুনগুন করে কী যেন বলছে আর হাঁটছে। ঘরের কাছে গিয়ে প্রতিদিনের মতো সোহেল ডাকলÑ মা, মা-গো। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। ভেতরে ঢুকে বইগুলো রেখে হাঁড়িতে চোখ রাখতেই দেখে খাবারের কিছু নেই। কী যেন ভেবে সে রওনা দিলো সেলিম চাচার বাড়ির দিকে।
রেললাইনের সমান্তরাল বাহু ভেদ করে যখন সে পিচঢালা পথে পা রাখে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর দেখতে পেল রাস্তার পাশে অনেক লোকের ভিড়। মানুষের শরীর থেকে শরীরের মধ্যে দূরত্ব স্থাপন করে যখন সে চোখ রাখল তখন দেখতে পেল সাদা কাপড়ে নয় সাদা জামায় ঢাকা মহিলার মুখখানা। সাথে সাথে সোহেল মুখ থেকে জামাটা সরিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল মা, মা-গো। মা, আমার সাদা জামা লাগবে না। আমার সাদা জামা লাগবে না। মাÑ তুমি কথা বলো, মাÑ কথা বলো না। কান্নায় স্তব্ধ হয়ে যায় সোহেল। গাড়ি এসে লাশটি নিয়ে যায়। পিচঢালা পথে লেগে আছে রক্তের ছাপ।

 


আরো সংবাদ