০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

বদলে যাওয়া পরিবেশ

-


অনেক মাস পর আজ বাড়ি যাচ্ছি। মনটা বেশ ভালো! সফিপুর থেকে হানিফ পরিবহনের বাসে উঠে জানালার পাশের সিটে বসলাম। দুরন্তগতিতে এগিয়ে চলছে বাস। রাতের জার্নি যদিও আমার ভালো লাগে না, তবুও আজ রাতের গাড়িতে চলছি গাঁয়ের বাড়ি। বেশ ভালো লাগছে হেমন্ত রাতের শীতল বাতাস। মাঠ-ঘাট পেরিয়ে দেখতে দেখতে এক সময় হানিফ পরিবহনের বাস এসে দাঁড়াল দুর্গাপুর বাজারে। বাস থেকে নেমে রিকশায় চড়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে বাড়ি চলে এলাম। আমাকে দেখে বাবা-মা, আর ছোট্ট ভাইয়ের সে কী আনন্দ! অনেক মাস পর বাড়িতে এসেছি বলে কথা। একটু পরই বেরিয়ে পড়লাম গাঁয়ের ছোট্টবেলার বন্ধুদের নিয়ে। সবাই মিলে মজনু চাচার চায়ের দোকানে বসে অনেক সময় ধরে জমিয়ে আড্ডা দিলাম। গাঁয়ের পরিবেশেও লেগেছে এখন শহরের হাওয়া। গাঁয়ের পথ ধরে যে রাস্তাটা আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে চলছে। এখন ওই রাস্তা আর কাঁচা নেই, বর্ষা এলেও এখন আর আগের মতো কাদায় মাখামাখি হয় না। কালো পিচের আল্পনা এঁকে দিয়ে এগিয়ে চলছে গাঁয়ের সেই রাস্তা। এখন আর পায়ে হেঁটে কেউ বাজারে যায় না। একটু পরপর আটোরিকশার ‘পিপ পিপ’ শব্দে কান ঝালাপালা করে দেয়। গাঁয়ের এমন বদলে যাওয়া পরিবেশ দেখে বেশ ভালোই লাগছে। তবে সন্ধ্যার আজানের পর কেমন যেন একটা খটকা লাগল আমার মনে। আগে আমরা স্কুল ছুটির পর, শেষ বিকেলে বাড়ির উঠোনজুড়ে ছেলেমেয়ে সবাই মিলে মজা করে কত রকম খেলায় মেতে উঠতাম। সন্ধ্যার আজান শোনা মাত্র যে যার বাড়ি চলে যেতাম। নলকূপ চাপ দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে বসতাম। কোনো কোনো দিন বাড়ির বড়দের মুখে শুনতাম নানা রকম রূপকথার গল্প। এমন করে এক সময় রাতের কোলজুড়ে নেমে আসত নীরবতা। নিভে যেত গাঁয়ের ঘরের কুপির আলো। ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চলে যেতাম ঘুমের জগতে। এমন করে দিনের পর দিন গাঁয়ের আলো-বাতাস গায়ে মেখে বড় হয়েছি।
২.
তবে এখন সেই দিনগুলো বদলে গেছে। গাঁয়ের ঘরে ঘরে এসেছে বিদ্যুৎ। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে আছে কালার টিভি। এখন আর গাঁয়ের ছোট্ট ছেলেমেয়েরা বিকেলে উঠোনজুড়ে নানা রকম খেলায় মেতে ওঠে না। ওদের সময় কাটে চার দেয়ালের ঘরে, টিভিতে নানা রকম কার্টুন দেখে। আগে আমরা যেখানে সন্ধ্যা হলে বই নিয়ে পড়ার টেবিলে বসতাম। এখর গাঁয়ের উঠতি বয়সের ছেলেরা একসাথে মিলে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয়, স্মার্টফোনে নানা রকম গেম খেলে। টিভিতে বিভিন্ন দেশের ফুটবল, ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরে। রাত বৃদ্ধির সাথে সাথে নানা রকম অপকর্মে লিপ্ত হয়। বাবার পকেট মেরে কিংবা ধান-চাল বিক্রি করে জড়িয়ে পড়ে নানা রকম বাজে নেশায়।
৩.
এ মুহূর্তে ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত ৩টা ৭ মিনিট। শতচেষ্টা করেও দু’চোখের পাতা এক করতে পারছি না। মনের মাঝে উঁকি দিচ্ছে শত প্রশ্ন। বারবার চোখের সামনে ভাসছে গাঁয়ের বদলে যাওয়ার এমন দৃশ্য। আগামী দিনের তরুণদের নিয়ে অজানা এক ভয় জাপটে ধরছে আমার দেহ অবয়ব। নিজের মনকে প্রশ্ন করি, সত্যি কি একদিন এমন করে শহুরে রূপ নেবে সোঁদামাটির ঘ্রাণযুক্ত আমার সোনার গ্রাম। দিনে দিনে এমন করে অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাবে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা। তবে কি আর কিছু দিন পর আমরাও দেখতে পাবো শহুরে পরিবেশ। দিনদুপুরে খুন, ধর্ষণসহ নানা অপকর্ম। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত শেষ হয়ে এলোÑ মসজিদের মাইকে ভেসে এলো মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে সুমধুর সুর...! বিছানা ছেড়ে উঠলাম, মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়ে বাড়ি চলে এলাম। কাল রাতে সফিপুরে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় সব জিনিস ব্যাগে ভাঁজ করে রেখেছে ছোট ভাই। আজ সকালেই সফিপুরে ফেরার বাসে উঠতে হবে। দেখতে দেখতে চলে এলো সেই মুহূর্ত। দুর্গাপুর বাজার থেকে নাবিল পরিবহনের বাসে উঠলাম। একটু পরে সাঁই সাঁই শব্দে এগিয়ে চলল বাস। আমি জানালার পাশের সিটে বসে আনমনে ভাবছি গাঁয়ের বদলে যাওয়ার এমন দৃশ্যের কথা। মনের মাঝে অজানা ভয় কাজ করছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, দুই মাস পর ছোট ভাইকে আমার কাছে নিয়ে আসব। আমার কাছে রেখে ওকে পড়ালেখা করাব। কারণ, আমার যে খুব ভয় করছে, আমাদের বদলে যাওয়া গাঁয়ের এই শহুরে পরিবেশ দেখে।

 


আরো সংবাদ