২৪ জানুয়ারি ২০২০

২১ নাম্বার বেড

জীবনের বাঁকে বাঁকে
-

টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আমি। ডাক্তার পেসক্রাইব করল আরো ১৪টা ইনজেকশন এবং জানাল হাসপাতালে ভর্তি হতেই হবে। রোগ এক্সট্রিম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। ১৯ নাম্বার বেড আমার জন্য বরাদ্দ হলো। সাথে আমার মা ও খালামণি। হাসপাতাল, বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ কেমন হতে পারেÑ সেটা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি এম এম কলেজে পড়ার সময় যশোর সদর হাসপাতালে। মন খারাপ হলেই চলে যেতাম হাসপাতালে। বিভিন্ন রোগে ভুক্তভোগী মানুষের হাহাকারের চিত্র স্বচক্ষে দেখে নিজের ভেতরকার দুঃখ ভুলতাম। যা হোক, হাসপাতালে ভর্তি হবো না বলে মা ও খালামণির সাথে সেই এক যুদ্ধ করে অবশেষে পরাজিত হয়েই ভর্তি হতে হয়েছে আমাকে। পুরুষ ওয়ার্ডে ঢুকতেই একটা বিকট গন্ধ আমার পেটের ভেতর পাক দিয়ে উঠল। আমি বললাম, আমাকে হাসপাতালের বারান্দায় একটা বেডে দেয়া হোক। তাই হলো। শরীরে ঢুকছে স্যালাইন। দুর্বলতার জন্যই এটা দিয়েছেন ডাক্তার। পিটপিট করে পড়ছে স্যালাইনের প্রতিটি ফোঁটা। আমি অসহায়ের মতো দেখছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নিরুপায়। মা ও খালামণি আমার বেডেই বসে আছেন। আমার নানা খামখেয়ালিপনার ইতিহাস খুলে বসেছে দুই বোনে। সময়মতো খায় না, রাতের পর রাত জেগে টাইপ করি। এটা-ওটা-সেটা। আমার কানে আসছে হাসপাতালের নানা মানুষের গোঙানির আওয়াজ। তবে একটা আওয়াজ আমার হৃদয়ে গিয়ে লাগছে অনবরত। কোন বয়স্ক মানুষ হবে। কিছু সময় পরপর জোরে জোরে আল্লাহÑ আল্লাহ, মাফ করো, মাফ করো। মনে মনে ভাবতে লাগলাম স্যালাইন শেষ হওয়ার পরই গিয়ে দেখতে হবে লোকটা কে, কী তার সমস্যা। এরই মধ্যে প্রস্রাব চেপে বসল আমার। ডাক্তার বলেছে, প্রচুর পানি খেতে হবে। আমি বললাম বাথরুমে যাবো। খালামণি স্যালাইল হাতে নিয়ে পেছন পেছন হাঁটতে লাগলেন। আমি প্রস্রাব করে এবার বললাম আমি পুরুষ ওয়ার্ডের ভেতরে যাবো। খালামণি নারাজ। হাতে-পায়ে ধরে বলছে, আব্বু পাগলামি করিস না। হাঁটাচলা করলে রক্ত উঠব স্যালাইনের নলের ভেতর দিয়ে। বলতে বলতেই তাই ঘটল। তবুও গেলাম। দেখি মানুষটি ২১ নাম্বার বেডে বসে সেই একই রকম আওয়াজ করছেন আর দেখে মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে মানুষটার। ৭০-এর ঊর্ধ্বে হবে বয়স। আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে আবার বেডে শোয়ালেন খালামণি। এরপর সন্ধ্যায় স্যালাইন শেষ হলো। বাথরুমের কথা বলে আবার গেলাম সেই ২১ নাম্বার বেডে। গিয়ে দেখি তিনি নেই। পাশের বেডে জিজ্ঞেস করলে জানালÑ খুব কষ্ট পাচ্ছে, হয়তো গ্যাস নিতে গেছে। আমি গিয়ে দেখলাম ওই মানুষটা নিজে নিজে গ্যাসের মেশিন চালিয়ে গ্যাস নিলেন খানিকটা সময় ধরে। এরপর আবার আল্লাহÑ আল্লাহ, মাফ করো, মাফ করো বলে চলে যাচ্ছিলেন আর এক নার্সকে বলছিলেন, আমাকে কোনো ওষুধ দেয়া যায় না যেটা খেলে আমার এই কষ্ট একটু কম হতো। এমন সময় খালামণি এসে হাজির। এরপর যে ক’দিন ছিলাম বেশ কয়েকবারই ওই লোকটার নিজে নিজে গ্যাস নেয়ার দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছি। এরপর আমার যেদিন রিলিজ হলো খালামণির কাছে এক ঘণ্টা সময় চেয়ে নিলাম। খালামণিও আমার সাথে গেলেন। আমি গেলাম ২১ নাম্বার বেডে, ওই মানুষটির সাথে কথা বলতে। তার দুই ছেলে। মেয়ে নেই। তিনি বললেন, ‘ছেলেরা সবাই রোজগার করে। বউ-সন্তান নিয়ে ব্যস্ত। তাকে নিয়ে ভাবার সময় কারো নেই। আমি এখন কি আর কোনো কাজ করতে পারব যে, আমাকে দেখবে। বাড়ি শহর থেকে একটু দূরে। দুই মাস ধরে হাসপাতালে বসে গ্যাস নিয়েই বেঁচে আছি। মাঝে মাঝে বাড়ি যাই ওদের দেখতে। ওরা কেউ তো আর আসে না আমাকে দেখতে। মাঝে মাঝে বুকের ভেতর কী যেন হয়ে যায় বাজান। একটা সাক্ষাৎকার না কী যেন কয়Ñ ওই নিয়ে ইন্টারনেটে দিয়ে দাও তো। যদি ওই দেখে একটু ভালো ওষুধ দিত, তাহলে একটু শান্তি পেতাম। এক বুড়ি ছিল, সে যদি বেঁচে থাকত তাহলে হয়তো খোঁজ নিত। সেও গেছে মরে।’ আমি বললাম বুড়িটা কে? তিনি বললেন, তোমার চাচি। মরে গিয়ে একভাবে বেঁচেও গেছে বেচারি। আমিতো সহ্য করছি। কিন্তু সে তার ছেলেদের এমন অবহেলা সহ্য করতে পারত না। আমি বললামÑ কাকা, ডাক্তার কী বলে? তিনি বললেন, ‘কিছু বলে না। সকালে এসে একবার শুনে যায় কী অবস্থা। কিন্তু আমার অবস্থা বলার আগেই অন্য রোগীর কাছে চলে যায় বাপু। লোক না থাকলে কে কার কথা শোনে।’ চাচার শেষ বয়সে এমন কষ্ট সত্যিই মেনে নেয়ার মতো নয়। ছেলেদের অবহেলা, ডাক্তারের অবহেলা ও শরীরের অবহেলায় এ বৃদ্ধের জীবন অতিষ্ঠ। বৃদ্ধ বলেন, ‘একটু শান্তির আশায়, একটু স্বাভাবিক নিঃশ্বাস নেয়ার ইচ্ছায় মনটা ছটফট করে বাবা।’


আরো সংবাদ