২৪ জানুয়ারি ২০২০

বাইক্কা বিলে পাখিদের মেলা

-

পাখিদের কিচিরমিচির ডাক আর জলকেলিতে মুখরিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাইক্কা বিল মৎস্য অভয়াশ্রম। এটি মূলত দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন কেন্দ্র ও সরকার ঘোষিত মৎস্য সম্পদের নিরাপত্তার একটি স্থান। ১০০ হেক্টর আয়তনের এ বাইক্কা বিল দেশের একটি সংরক্ষিত সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক জলাভূমি। প্রতি বছরের মতো এবারো এ জলাভূমিতে এসেছে প্রচুর পরিমাণে পরিযায়ী পাখি। একটু উষ্ণতার জন্য প্রতি বছরের শীত মওসুমে সুদূর সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে ছুটে আসা পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে বাইক্কা বিলে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পরিযায়ী পাখিরা মুখরিত করে তুলেছে বাইক্কা বিলসহ পুরো হাইল হাওর। পাখিদের পানিতে ভেসে বেড়ানো ও একত্রে ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার মধুময় এ দৃশ্যগুলো উপভোগ করতে প্রতি বছর ছুটে আসেন দেশী-বিদেশী পর্যটকরা। এবারো পর্যটকদের আগমন শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী জলাভূমি বাইক্কা বিলে।
শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই এবার বাইক্কা বিলে এসেছে কয়েক প্রজাতির সৈকত পাখি, এক প্রজাতির খয়রা কাস্তেচরা, বড় পানকৌড়ি, পাতি-কুট, গিয়িরা হাঁস, তিলা হাঁস, পিয়াং হাঁস প্রভৃতি।
ইতঃপূর্বে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রজাতি খয়রা কাস্তেচরা দীর্ঘ দিন পর এবার দেখা যাচ্ছে বাইক্কা বিলে।
পাখি গবেষকরা জানান, শীত মওসুমের শুরুতেই বাইক্কা বিলে পরিযায়ী পাখিরা আসতে শুরু করে, যা জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকবে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের উদ্যোগে বাইক্কা বিলে পাখি গবেষণায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পাওয়া গিয়েছিল বিশ্বের অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন প্রজাতির পাখি ‘বড়ঠোঁট ফুটকি’। এ পাখিটির ইংরেজি নাম খধৎমবনরষষবফ ডধৎনষবৎ এবং বৈজ্ঞানিক নাম অপৎড়পবঢ়যধষঁং ঙৎরহঁং। ২০০১ সালে এ প্রজাতির দু’টি পাখি থাইল্যান্ডে দেখা গেছে। এর এক দশক পর বাংলাদেশের বাইক্কা বিলে একটি ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও এ প্রজাতির পাখি দেখা যায়নি। এবারো সেই প্রজাতির পাখি দেখার সম্ভাবনা রয়েছে বলে পাখি গবেষকরা জানিয়েছেন।
সুদূর সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, উত্তর আমেরিকা, হিমালয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতি বছর শীতের শুরুতে ঝাঁকে ঝাঁকে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে বাইক্কা বিলে। এদের স্থানীয়রা অতিথি পাখি হিসেবে চেনেন। এবারো শীতের প্রারম্ভেই বাইক্কা বিলসহ পুরো হাইল হাওরের বিভিন্ন স্থানে পরিযায়ী পখি এসেছে প্রচুর পরিমাণে। ইতোমধ্যে পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে বাইক্কা বিল এলাকা। বাইক্কা বিলে এক দিকে আসছে পরিযায়ী পাখি, অন্য দিকে বাড়ছে দেশী-বিদেশী পাখিপ্রেমী পর্যটকদের ভিড়। দলবেঁধে পানকৌড়ি বিলের চার দিকে উড়ে ঝাঁপ দিচ্ছে পানিতে। খাদ্যের সন্ধানে পানকৌড়ি বিলের একপ্রান্তে ডুব দিয়ে উঠছে অন্যপ্রান্তে। রাজ সরালি পাখির ঝাঁক কিচিরমিচির করছে ভাসমান অবস্থায়। এ এক অপূর্ব দৃশ্য হাইল হাওরের বাইক্কা বিলজুড়ে। পুরো শীত মওসুম কাটিয়ে বসন্তের শুরুতে পরিযায়ী পাখিরা আবারো উড়াল দেবে বিভিন্ন দেশে। ফিরে যাবে যার যার গন্তব্যে।
পাখিদের নিরাপদ অবস্থানের জন্য হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে প্রতি বছর বাড়ছে পরিযায়ী পাখির আগমন। হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে শাপলা-শালুকসহ পর্যাপ্ত খাবারের সংস্থান থাকায় এই বিলে ফিবছর প্রচুর পরিমাণে পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। পরিযায়ী পাখিরা এ দেশের পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাখিদের বিষ্ঠা বাইক্কা বিলের মাছের উৎকৃষ্ট খাবার।
মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত হাইল হাওরের বাইক্কা বিল। কালাপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত বাইক্কা বিলে রয়েছে কচুরিপানা, জলজ উদ্ভিদ, শ্যাওলা, বিভিন্ন জাতের পদ্মটুনা ও শাপলা। এ ছাড়া বিলের তীরজুড়ে রয়েছে বনজ, ঔষধি ও প্রাকৃতিক ফলদ বৃক্ষ-গুল্মলতা। বর্ষা মওসুমে এ হাওরের আয়তন হয় প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর। শুষ্ক মওসুমে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর। চাপড়া, মাগুরা, যাদুরিয়া বিল ও এর সংলগ্ন ডোবা এলাকা সমন্বয়ে গঠিত বাইক্কা বিল অভয়াশ্রম। এ অভয়াশ্রম শতাধিক প্রজাতির মাছ ও বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওরের বাইক্কা বিল এক সময় অরক্ষিত ছিল। ২০০৩ সালে ইউএসআইডির অর্থায়নে মাচ প্রকল্প ১০০ হেক্টর আয়তনের এ বিলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। বিল রক্ষণাবেক্ষণে ওই প্রকল্পের কড়া নজরদারি, সরকারি সংরক্ষিত মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং বিলের জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়ায় এ বিলটি মাছ ও পাখিদের নিরাপদ অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে ওঠে। মাচ প্রকল্প পাখি শিকারিদের তৎপরতা রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘ইন্টিগ্রেটেড প্রটেকটেড এরিয়া কো-ম্যানেজমেন্ট’ (আইপ্যাক) প্রকল্প কাজ করে চলেছে। ফলে প্রতি বছরই শীত মওসুমে এ বিলটিতে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে দেশী ও পরিযায়ী পাখির আগমন। এ বছরও বাইক্কা বিলে ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে দেশী ও পরিযায়ী পাখি।

 


আরো সংবাদ