১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ঠকিনির খপ্পরে

-

২০১৫ সালের কথা, ঢাকায় একটা বায়িং অফিসে সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে চাকরি করি। তখন বিভিন্ন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির কাজ পরিদর্শনে নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও গাজীপুর নিয়মিত যাওয়া-আসা ছিল। নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার উদ্দেশে একদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদের পেছনে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ১ নম্বর গেটের সামনে থেকে বন্ধন পরিবহনের একটি বাসে উঠি। আমার পাশের সিটে বসে বোরকা পরিহিতা এক তরুণী। এমন ভাবে নেকাব পরা ছিল, ড্যাবড্যাবে দু’টি কালো হরিণ চোখ ছাড়া মুখমণ্ডলের আর কিছুই দেখার উপায় নেই। মোবাইল ফোনে খুব পরিপাটিভাবে আভিজাত্য নিয়ে কথা বলছে। তার কথাগুলো ছিল এমন, ‘প্রাইভেট কার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাসে করে বাসায় ফিরতে হচ্ছে। উফ্ফ কি অসহ্য রকম গরম, বাসে এসি নেই। কিভাবে যে মানুষ এসব বাসে চড়ে যাতায়াত করে, আলøাহ কত কষ্ট।’ তার কথাবার্তা শুনে আমি বেশ লজ্জাবোধ করছি।
কিছু দূর যাওয়ার পর মেয়েটি আমার দিকে মায়াবী চোখে তাকিয়ে বলল, ভাইয়া কি নারায়ণগঞ্জের নাকি কোনো কাজে ওখানে যাচ্ছেন? আমি উত্তর দিলাম, আমি ঢাকায় থাকি, অফিসের কাজে নারায়ণগঞ্জে যাচ্ছি। তার পর জানাল, তার বাসা নারায়ণগঞ্জ এবং সে ঢাকায় একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আবারো প্রশ্ন করল, ভাইয়া আপনি কিসে জব করেন আর নারায়ণগঞ্জে কোথায় যাবেন? উত্তরে জানালাম, আমি পেশায় একজন মার্চেন্ডাইজার, নারায়ণগঞ্জে দুটো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে যাচ্ছি। মেয়েটি তখন বেশ উচ্ছ¡াস প্রকাশ করে বললÑ ও আচ্ছা আপনি মার্চেন্ডাইজার। নারায়ণগঞ্জে আমাদের একটি গার্মেন্ট আছে।
এভাবে এই লাট সাহেবের বেটির সাথে কথাবার্তা বেশ জমে উঠে ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে অনেক গল্প হলো। এক সময় আমার প্রতি তার বেশ দরদ উথলে উঠেছে। আমাকে বলছে, ইশ ভাইয়া আপনার কত কষ্ট করতে হয়। আপনি অফিস থেকে একটা গাড়ি পেলে যাতায়াত করতে কত সুবিধা হতো। আমি তখন কাচুমাচু মুখে বললাম, এটা অবশ্য ঠিক বলেছেন। দু-একটা প্রমোশন পেলেই গাড়ি পেয়ে যাবো ইনশা আলøাহ। মেয়েটি তখন বলল, আপনার জন্য দোয়া রইল। আপনি যেন খুব দ্রুত প্রমোশন পেয়ে যান। মেয়েটির কথায় আমি তো খুশিতে গদগদ করছি। সত্যি কথা বলতে, মেয়েটির কথাবার্তায় আমি বেশ সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম।
অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা নারায়ণগঞ্জ শহরে পৌঁছে গেলাম। তখন মনে হচ্ছিল নারায়ণগঞ্জের রাস্তা আরো দীর্ঘ হলে মন্দ ছিল না। আমরা দুজনেই কালীবাজারের সামনে নামলাম। মেয়েটিকে বিদায় জানিয়ে চলে যাব, এমন সময় মেয়েটি খুব বিনয়ের সাথে বলল, ভাইয়া আপনার মোবাইল ফোনটা কি একটু দেয়া যাবে, বাসায় একটা জরুরি কল দেয়া দরকার কিন্তু আমার মোবাইলের চার্জ শেষ। আমি তখন পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে দাঁত কেলিয়ে হেসে বললাম, কোনো সমস্যা নেই, আপনি কথা বলুন। মেয়েটি ধন্যবাদ দিয়ে আমার মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে নম্বর ডায়াল করতে করতেই কালীবাজার ফেন্সী মার্কেটের একটা গলির সামনে দাঁড়াল। তখনো আমার নজরের ভেতরেই ছিল। সে কথা বলতে বলতে গলির আরেকটু ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর একেবারেই উদাও। আমি সারা মার্কেটসহ আশেপাশে তন্নতন্ন করে মেয়েটিকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। মিষ্টি মিষ্টি কথার ছলে আমাকে বোকা বানিয়ে ছাব্বিশ হাজার টাকা দামের আমার মোবাইলটা নিয়ে ওই বোরকাওয়ালি মেয়েটা চম্পট দিলো। এরপর থেকে বাসে বা ট্রেনে অপরিচিত কোনো মেয়ের সাথে কথা বলা দূরের কথা, রীতিমতো এড়িয়ে চলি।
চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ, ঢাকা


আরো সংবাদ