২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

নীল আকাশের নিচে চারাগল্প

-

মোহন একটি বেসরকারি ব্যাংকের ম্যানেজার। পোস্টিং নিয়ে গত মাসে সে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি শহরে এসেছে। মোহনের বাড়ি কুমিলøায়। জীবিকার কারণে এখানে আসার পর মাকে ভীষণ মিস করছে সে। ফেসবুক মোহনের বিনোদনের একটি প্রিয় মাধ্যম। এখানে প্রচুর সময় দেয়।
এবারের শীতে এখনো কুমিলøায় যেতে পারেনি মোহন। ফলে এবারের শীতে এখনো তার ভাঁপা পিঠা খাওয়া হয়নি। মা যে খুব আয়োজন করে ভাঁপা পিঠা বানান। মোহন রাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে লিখেÑ ‘আহা! এই শীতে এখনো মায়ের হাতের বানানো ভাঁপা পিঠা খাওয়া হয়নি।’ স্ট্যাটাসটি পোস্ট করার কিছুÿণ পর অবাক করা লাইক আর কমেন্ট আসতে শুরু করল।

২.
অফিসে বসে কাজে ব্য¯Í মোহন। এমন সময় বোরকা পরা আর নেকাবে মুখ ঢাকা একটি মেয়ে এসে দাঁড়ায় মোহনের সামনে। মেয়েটির হাতে একটি মেলামাইনের বাক্স। মোহন কিছু বলার আগেই মেয়েটি বলল, ‘কাল রাতে ফেসবুকে ভাঁপা পিঠা সংক্রান্ত আপনার লেখাটি পড়েছি। তাই আজ ভাঁপা পিঠা বানিয়ে এনেছি আপনার জন্য, এই নিন।’ বলেই মেয়েটি পিঠার বাক্সটি মোহনের দিকে এগিয়ে দেয়। হাসতে হাসতে মোহন বলে, তাই নাকি? আপনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড? কী নাম?’ কিছুÿণ নীরব থেকে মেয়েটি বলে, ‘নীল পরী’ নামের আইডিটি আমার। মোহন হেসে বলে, বাহ। জানা ছিল না যে আপনি এখানকার মানুষ। তো বসুন। মেয়েটি কোমল কণ্ঠে বলল, আজ নয় ভাইয়া। আরেকদিন। আপনি কুমিলøা থেকে এখানে আসার পর আরো দুই দিন এসে আপনাকে দেখে গেলাম। পরিচয় দেইনি। আর ফেসবুকে সব সময়ে আপনাকে ফলো করি। মোহন বলল, হা হা হা। জেনে ভালো লাগল।
দশ মিনিটের কথা কথা বলে মোহনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মেয়েটি চলে গেল। মোহন বাক্স খুলে ভাঁপা পিঠাগুলো বের করতেই মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে এলো।

৩.
সাবিনা বাসায় এসে বোরকা ছেড়ে ফেসবুক খুলতেই মোহনের মেসেজ পায়। ১০ মিনিট আগে মোহন লিখেছেÑ ‘সত্যি চমৎকার ভাঁপা পিঠা ছিল। ঠিক যেন আমার মা বানিয়েছে। ধন্যবাদ আপনাকে। মেসেজ পড়ে সাবিনার চোখ ভিজে গেল। ফারুক এসে পাশে দাঁড়ায়। পুরো ঘটনা স্বামী ফারুককে খুলে বলে সাবিনা। তারপর মোহনের মেসেজ দেখায়। ফারুক মেসেজ পড়ে বলে, আরেক দিন গিয়ে পরিচয় দিয়ে এসো ভাইয়াকে। সাবিনা হাউমাউ করে কেঁদে বলে, সাহস হয় না যে। যদি ভাইয়া আমাকে ব্যাংকে সবার সামনে অপমান করে! আমাদের সম্পর্ক ভাইয়া কোনো দিনও মেনে নেবেন না হয়তো! ফারুক কী বলবে বুঝতে পারছে না। দুই বছর আগে কুমিলøার সাবিনা ফেসবুকে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে বিয়ে করে নোয়াখালীর ফারুককে। সে বিয়ে সাবিনার পরিবার মেনে নেয়নি। ফলে সাবিনা ফারুকের জন্য ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়।

৪.
আজো সাবিনা বোরকায় মুখ ঢেকে মোহনের জন্য ভাঁপা পিঠা নিয়ে ব্যাংকে এসেছে। মোহন অট্টহাসি দিয়ে বলে, আরে! আজো পিঠা! পিঠা খাইয়ে তো ঋণী করে দিচ্ছেন। বসুন বসুন। সাবিনা চেয়ারে বসে।
Ñতো ‘নীল পরী’ আইডির মালিক, আপনার তো নামই জানা হলো না।
Ñইয়ে মানে...
Ñআচ্ছা আপনার গলাটা চেনা চেনা লাগছে। আমরা কী কখনো ফোনে কথা বলেছি?
Ñনা তো!
Ñআসলে ব্যাংকার হওয়ার কারণে এখানকার অনেক মহিলার প্রচুর কল ধরতে হয়। চা খাবেন? আনতে বলব?
Ñনা না। আমি চা খাই না ভাইয়া।
Ñএকটা অনুরোধ রাখবেন?
Ñকী?
Ñমুখের নেকাবটা খুলবেন? আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। এত যতœ করে ভাঁপা পিঠা বানিয়ে আনেন। আর যদি একান্ত সমস্যা হয়, তো নেকাব খোলার দরকার নেই।
সাবিনা মুখের নেকাব খুলল। সাবিনার দিকে তাকিয়ে মোহনের বুক ধক করে উঠল। বিস্মিত গলায় বলল, সাবিনা তুই? সাবিনা কাঁদতে লাগল নিচু গলায়। মোহনের মন গলল না। তেজী গলায় বলল, নীল পরী আইডি তোর? তুই এখানে থাকিস? আমার এখানে কেন এসেছিস? যা চলে যা। কলিগরা জানলে আমার মান থাকবে না। এখানে আর কখনো আসবি না। তোর পিঠা নিয়ে নে। আই সি গেট আউট! তোকে তো আমরা আগেই ত্যাজ্য করে দিয়েছি।
সাবিনা কাঁদতে কাঁদতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। নিচে অপেÿা করছে ফারুক। সাবিনা স্বামীর কাছে সব খুলে বলে। ফারুক বলল, চলো তবে।
দুজনে রিকশায় চেপে বসে। সাবিনার কান্না বাড়ছে। আজ অনেক কুয়াশা পড়ছে। অথচ আকাশ নীল। কুয়াশার সময় আকাশ নীল হওয়ার কথা নয়। বেদনার রং নীল হয়। তবে কী সাবিনার বেদনায় ওই দূরের আকাশও নীল হয়েছে! নীল আকাশের নিচে স্বামীর পাশে রিকশায় বসে সাবিনা বাড়ি চলে যাচ্ছে। তার হাতের মোবাইলে ম্যাসেঞ্জারে মেসেজ টোন বেজে উঠল। চেক করে দেখে ভাই মোহন তাকে মেসেজ লিখেছেÑ ফারুক নামের ওই ছোট লোকের বাচ্চার জন্য আমাদের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে চলেই তো গেলি। আমার কর্মস্থলে আসিস কেন? আর কখনো এখানে এলে ব্যাংকের দারোয়ান রনিকে দিয়ে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো। মেসেজ পড়ে সাবিনার কান্না বাড়তে লাগল। মেসেজের রিপ্লাই দিতে গিয়ে সাবিনা দেখে, ভাই তাকে ফেসবুক থেকে বøক করে দিয়েছে।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী


আরো সংবাদ