২৫ আগস্ট ২০১৯

পদ না থাকলেও পদোন্নতি

পদ না থাকলেও পদোন্নতি - ছবি : সংগ্রহ

জনপ্রশাসনের ১৩৬ কর্মকর্তাকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনে এটাই প্রথম বড় ধরনের পদোন্নতি। যদিও নির্বাচনের আগে গত ২৪ অক্টোবর সিনিয়র সহকারী সচিব ও সমমর্যাদার ২৫৬ কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এর আগে ২৯ আগস্ট ১৬৩ কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব এবং ২০ সেপ্টেম্বর ১৫৪ কর্মকর্তাকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এ ছাড়াও ১৩ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ৬৪ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) নন-ক্যাডার কোটায় সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি পান।

নিয়মানুযায়ী পদোন্নতি দিয়ে কর্মকর্তাদের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে ১২ জন জেলা প্রশাসক রয়েছেন, যাদের গত ১১ জুন বদলি করা হয়েছিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, এবারের পদোন্নতির পর যুগ্মসচিবের মোট সংখ্যা ৯৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে যুগ্মসচিবের নিয়মিত পদসংখ্যা ৪১১টি। অতিরিক্ত সচিবের ১২১টি পদের বিপরীতে ৫১৬ জন কর্মকর্তা রয়েছেন।

স্থায়ী পদ না থাকায় এমনিতেই অনেক যুগ্মসচিবকে নিচের পদে কাজ করতে হচ্ছে, এর ওপর নতুন করে পদোন্নতি দেয়া হলো। পদোন্নতিপ্রাপ্ত বেশির ভাগ যুগ্মসচিবকে বর্তমান কর্মস্থলে ইনসিটু (উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা স্থানে) থাকতে হবে।

বদলি হওয়া ডিসিরা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেয়ায় যুগ্মসচিব হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাদের ১২ জনকে ইনসিটু (ডিসি হিসেবেই আগের পদে পদায়ন) করা হয়। এরপর বদলি করা আগের স্থানে যুগ্মসচিব হিসেবে তাদের পদায়ন করা হয়।

ফলে এক দশক ধরে সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকা সত্ত্বেও জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা আসছে না। প্রতিটি বিভাগেই অদক্ষতা ও মেধাহীনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি না পাওয়ায় কাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক মেধাবী কর্মকর্তা। 

বঞ্চিতদের ক্ষোভ-হতাশা : প্রয়োজনীয় সংখ্যক পদ না থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনে চলছে গণপদোন্নতি। এমনি অবস্থায় প্রশাসনে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ ধরনের গণপদোন্নতি নিয়ে খোদ প্রশাসনেই বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ, অসন্তোষ ও হতাশা। বিশেষ করে পদবঞ্চিতদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বেশি। সচিবালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে আলাপে এসব তথ্য জানা গেছে।

জনপ্রশাসন সূত্র জানায়, ১৯৮৪ সালের বিসিএস কর্মকর্তাদের কয়েকজন সচিব পদমর্যাদায় রয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাচের অনেক কর্মকর্তাই এখনো উপসচিব রয়ে গেছেন। তাদের প্রায় সবাই হয় রাজনৈতিক, না হয় ব্যাচমেটদের ষড়যন্ত্রের শিকার। ৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সচিব হয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা এখনো উপসচিব রয়ে গেছেন। এর পর ১৭তম বিসিএস পর্যন্ত যুগ্মসচিব হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হলেও প্রতিটি ব্যাচেই সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মকর্তাই পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নবম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না বিদ্যমান বিধিমালা। গুটিকয়েক কর্মকর্তার হাতে বন্দী হয়ে পড়েছে পুরো প্রশাসন। এমন পদোন্নতি দেয়ায় ব্যাচের অধিকতর জুনিয়র কর্মকর্তারা এখন নীতিনির্ধারক পর্যায়ে চলে গেছেন। আমার ব্যাচের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেলেও আমি এখনো সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে কাজ করছি। আমি চাকরিতে যোগদান করার পর থেকে সব জায়গাতেই সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি। কোনো বিভাগীয় মামলা বা অভিযোগ নেই। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করিনি। এটাই আমার অপরাধ। আমার মতো অনেকেই মেধা ও যোগ্যতা থাকার পরও দলনিরপেক্ষ হওয়ায় পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে প্রশাসনের নি¤œস্তরেই কাজ করে যাচ্ছেন। 

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান নয়া দিগন্তকে বলেন, পদ সৃষ্টি না করেই পদোন্নতিকে দলীয়করণ ছাড়া আর কোনোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এতে দলীয় সরকার উপকৃত হলেও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অঙ্গ প্রশাসনের গতিশীলতা নষ্ট হয়। ভারসাম্য নষ্ট হলে দক্ষতাও হ্রাস পায়। এভাবে যারা পদোন্নতি পাচ্ছেন ও পাবেন, তাদের সবাইকে প্রাধিকার অনুসারে সুযোগ-সুবিধা দেয়া যাবে না। পদোন্নতি পেলেও ওপরের পদাধিকারীরা অবসরে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের অনেককেই আগের পদে কাজ করে যেতে হবে।

উল্লেখ্য, বিধিমালা অনুযায়ী চাকরি স্থায়ী সাপেক্ষে কোনো কর্মকর্তার ১০ বছর পূর্ণ হলে তিনি উপসচিব হওয়ার যোগ্য হন। চাকরিকাল ২০ বছর ও উপসচিব পদে পাঁচ বছর সন্তোষজনক চাকরিকাল পূর্ণ হলে কোনো কর্মকর্তা যুগ্মসচিব হওয়ার যোগ্য হন। যুগ্মসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হতে চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ করতে হয় এবং যুগ্মসচিব পদে ৩ বছর চাকরির মেয়াদ শেষ হলে তিনি অতিরিক্ত সচিব হওয়ার যোগ্য হন। অতিরিক্ত সচিব পদে দুই বছরের সন্তোষজনক চাকরি হলে তাকে সচিব পদের জন্য বিবেচনায় নেয়ার বিধান রয়েছে। তবে সচিব করার ক্ষেত্রে চাকরিকাল নিয়ম বিধিবিধান ছাড়াও তদবির, রাজনৈতিক পরিচয়, আদর্শ ইত্যাদি বিবেচনায় নেয়ার সংস্কৃতি প্রবল।


আরো সংবাদ