১৫ অক্টোবর ২০১৯

ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইফা ডিজির বিরোধ চরমে

ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইফা ডিজির বিরোধ চরমে - ছবি : সংগৃহীত

ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক (ডিজি) সামীম মোহাম্মদ আফজালের মধ্যকার বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। ইফা বোর্ড অব গভর্নরসের সিদ্ধান্ত অমান্য করে দেয়া ইফা ডিজির কয়েকটি অফিস আদেশ ও শোকজ নোটিশ গতকাল বুধবার পাল্টা নোটিশে বাতিল করা হয়েছে। ইফা বোর্ডের চেয়ারম্যান ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ শেখ মো: আব্দুল্লাহর অনুমোদন নিয়ে ইফার সচিব এসব নোটিশ বাতিলের অফিস আদেশ জারি করেন। এরই মধ্য দিয়ে মেয়াদের একেবারে শেষের দিকে এসে ইফা ডিজি ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার বিরোধ আবারো জোরালোভাবে মাথাছাড়া দিয়ে উঠল। ডিজির কয়েকজন অনুগত ছাড়া ইফার অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীই বর্তমানে ডিজিবিরোধী এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সাথে একমত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আগামী ৩১ ডিসেম্বর ইফা ডিজির চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হবে। জুডিশিয়াল সার্ভিস বিভাগ থেকে প্রথমে ডেপুটেশনে এবং ২০০৯ সাল থেকে টানা ১০ বছর তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

গত ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডিজি পৃথক কয়েকটি অফিস আদেশে ইফার তিনজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাকে বদলি, ইফার সচিবসহ অপর তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে শোকজ নোটিশ এবং অপর চার কর্মচারীকে বদলি করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে উত্তেজনা দেখা দেয়। গত সোমবার ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আরব আমিরাত সফর শেষে দেশে ফেরার পর বিষয়গুলো বিস্তারিত জানার পর তিনি ডিজির ওই সব আদেশ বাতিল করার জন্য ইফার সচিবকে নির্দেশ দিলে তিনি পৃথক আদেশ জারি করে সেগুলো বাতিল করেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইফা সচিব কাজী নুরুল ইসলাম গতকাল বিকেলে নয়া দিগন্তকে বলেন, ইফার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যান ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে ডিজি মহোদয়ের অফিস আদেশগুলো বাতিলের আদেশ জারি করেছি। কেন কী কারণে সেগুলো বাতিল করা হয়েছে তা নোটিশে উল্লেখ আছে।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মৌখিক না লিখিতভাবে ডিজির অফিস আদেশ বাতিল করতে বলেছেন জানতে চাইলে ইফা সচিব বলেন, অবশ্যই লিখিত। আমরা লিখিতভাবে বোর্ডের চেয়ারম্যান মহোদয়কে বিষয়গুলো অবহিত করার পর তিনি সেগুলো ফাইলেই স্বাক্ষর করে বাতিল করার নির্দেশনা দেন। এর মধ্য দিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে অচলাবস্থা দেখা দিচ্ছে কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অচলাবস্থা তো দেখা দিয়েছেই। কারণ ডিজি মহোদয়ের সাম্প্রতিক আদেশগুলো তো যথাযথ হয়নি। যেমন বোর্ডের সিদ্ধান্তের ফাইল পুটআপ করার জন্য আমাকে পর্যন্ত তিনি স্পষ্টিকরণের নামে শোকজ নোটিশ করার মতো কাজ করেছেন। এটা তিনি করতে পারেন না। আমরা বোর্ডের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ফাইল পুটআপ করেছি চেয়ারম্যানের নির্দেশে। সেই বোর্ডের সিদ্ধান্তে তো সদস্যসচিব হিসেবে ডিজি মহোদয়েরও স্বাক্ষর রয়েছে। তিনি বলেন, আমি তো সরকারি কর্মকর্তা, ডেপুটেশনে এখানে আছি।

এ ব্যাপারে ইফা বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য আলহাজ মিছবাহুর রহমান চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, আসলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে ডিজির যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে এটা ডিজির বিদায় নেয়ার আগে তো আর কোনো সমাধান আমি দেখছি না। তিনি বলেন, আমি উদ্ভূত পরিস্থিতি জানার জন্য গত রোববার আগারগাঁও ইসলামিক ফাউন্ডেশনে গিয়েছিলাম। কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে কথা বলেছি। তাদের শান্ত থাকতে বলেছি। তারা আমার কথা শুনেছেন। আমি ডিজি সাহেবের সাথে কথা বলেছি। উনাকেও বলেছি, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো দশ বছর আপনার কথা শুনেছেন। এখন আপনি তাদের সাথে বিরোধে জড়ানো ঠিক হচ্ছে না। ইফা বোর্ডের এই সদস্য বলেন, আমি আজ (গতকাল সন্ধ্যায়) একটু পরে প্রতিমন্ত্রীর সাথেও কথা বলব। আশা করি প্রতিমন্ত্রী সব কিছু বিবেচনা করে একটি সিদ্ধান্ত নেবেন। কারণ ইসলামিক ফাউন্ডেশন তো সরকারি একমাত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এই বিরোধের কারণে এখানে কাজের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। এই অবস্থা তো চলতে পারে না।

ইফা ডিজির বদলি ও শোকজ নোটিশের ব্যাপারে মিছবাহুর রহমান বলেন, আমি জানতে পারলাম উনি সচিবকে পর্যন্ত শোকজ করেছেন। এগুলো তো উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য বোঝাই যায়। এগুলো তার যে করা উচিত হয়নি আমি তাকেও বলেছি। এখন তাহলে ডিজিকে বিদায় করার মধ্য দিয়েই কি আপনারা সমাধান দেখছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ইফার এই বোর্ড সদস্য বলেন, আমরা তো আমাদের বক্তব্য গত বোর্ড সভায়ও বলে দিয়েছি। আসলে ডিজি এমনিতেই শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। এখন প্রতিমন্ত্রী সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের স্বার্থেই একটি সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশা করি। এর আগে গত জুন মাসে বায়তুল মোকাররম মসজিদের একটি পিলার চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইফা ডিজি বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও মার্কেটের পরিচালককে বরখাস্ত করাকে নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজির মধ্যকার বিরোধ সামনে আসে। তখন ইফা ডিজিকে ধর্ম মন্ত্রণালয় শোকজ করেছিল। তারপর ইফা ডিজি পদত্যাগ করতে গিয়েও পরে পদত্যাগ করেননি। তিনি অফিস থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সরানোর চেষ্টা করেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তখন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ইফা ডিজিকে পদত্যাগ করে চলে যাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিষয়টি পরে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গড়ালে প্রধানমন্ত্রী একটি সম্মানজনক সমাধানের পরামর্শ দেন বলে জানা যায়। এরপর গত ২২ জুন ইফার বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে প্রথমে ডিজিকে তার মেয়াদের বাকি সময়ের জন্য ছুটিতে থাকার পরামর্শ দেয়া হলে ডিজি রাজি হননি। পরে বোর্ড তার কিছু ক্ষমতা খর্ব করে। ডিজি প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের নিয়োগ বদলিসহ শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা নিতে পারবেন না মর্মে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপর ডিজি অনেকটাই চুপচাপ অফিস করছিলেন। কিন্তু সর্বশেষ গত সপ্তাহে তিনি পরপর কয়েকটি অফিস আদেশ জারি করলে ইফায় উত্তেজনা তৈরি হয়। তার বিরুদ্ধে ইফার বোর্ড, ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ কাউকে না মানার অভিযোগ উঠে। নিজের সংস্থার সচিবকে পাশ কাটিয়ে অধঃস্তন কর্মকর্তাদের দিয়ে ফাইল পরিচালনা এবং অফিস আদেশ জারি করান ডিজি।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে ইফা বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য ও প্রশাসনিক কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন আহমেদ প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের নিয়োগ বদলির আদেশের ওপর বাতিল লিখে দেন এবং বিষয়গুলো ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বিদেশ থেকে ফেরার পর ফয়সালা হবে বলে জানান।
ইফার সচিব কাজী নুরুল ইসলাম প্রশাসনিক দলের সদস্য হিসেবে হজে যাওয়ার কারণে ইফার ফাইন্যান্স ডাইরেক্টর আফজাল উদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দিয়ে যান। এরই মধ্যে ২২ জুনের বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের বিষয়ে একটি ফাইল পুটআপ করলে ডিজি এ দুই কর্মকর্তার ওপর ক্ষুব্ধ হন। তিনি গত ১৫ সেপ্টেম্বর এ দুই কর্মকর্তাকে স্পষ্টকরণ নোটিশ নামে তিন দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়ে ১৩ পৃষ্ঠার একটি শোকজ জারি করেন। কর্মকর্তারা ওই শোকজের জবাব না দিয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকেন।

এ দিকে গত ১৭ আগস্ট ডিজি স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে প্রশাসন বিভাগের সহকারী পরিচালক (প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা) মুহাম্মদ মুজিব উল্লাহ ফরহাদ এবং নরসিংদী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রুহুল আমিনকে যথাক্রমে সমন্বয় বিভাগের উপপরিচালক এবং মহাপরিচালকের একান্ত সচিব হিসেবে বদলি করা হয় এবং পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়। একই আদেশে নিজের একান্ত সচিব জাকির হোসাইনকে প্রশাসন বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসেবে বদলির আদেশ দেন। পরদিনই নিজের অনুগত হিসেবে পরিচিত রুহুল আমিন কাজে যোগদান করেছেন মর্মে তড়িঘড়ি করে নোটিশও জারি করা হয়।

১৬ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত এক আদেশে চট্টগ্রাম জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে দুই দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক বোরহান উদ্দিন মো: আবু আহসানকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্স পরিচালকের দায়িত্ব পালনের আদেশ দেন। আদেশে বলা হয় তৌহিদুল আনোয়ার কর্মস্থলে যোগদান এবং তার যোগদানপত্র গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত বোরহান উদ্দিন এই দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া ১৭ সেপ্টেম্বর আরো চারজন কর্মচারীকে বদলি করেন ডিজি।

ডিজি স্বাক্ষরিত এসব অফিস আদেশের কার্যকারিতা বাতিল করে ইফার সচিব পৃথক তিনটি আদেশ জারি করেন মঙ্গলবার। ২৩ সেপ্টেম্বরের তারিখ দেয়া আছে আদেশগুলোতে। তার মধ্যে একটি আদেশে প্রথম শ্রেণীর তিন কর্মকর্তাকে বদলি আদেশটি ইফা বোর্ড চেয়ারম্যানের অনুমোদনক্রমে বাতিলের কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়াও ওই বদলির আদেশের ওপর ইফা বোর্ড প্রশাসনিক কমিটির চেয়ারম্যানের বাতিল সংবলিত মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করা হয়। দ্বিতীয় আদেশে ইফার সচিব, অর্থ পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক তৌহিদুল আনোয়ারকে করা শোকজ নোটিশ বাতিল করা হয়। তাতে ইফা বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বলা হয়, ইফা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে অবহিত না করে প্রথম শ্রেণীর কোনো কর্মকর্তাকে এভাবে শোকজ করার এখতিয়ার রাখেন না ডিজি। বোর্ডের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করার কারণে বোর্ড চেয়ারম্যানের অনুমোদনক্রমেই এসব শোকজের আদেশও বাতিলের কথা বলা হয়েছে। ইফা ডিজির গত ১৭ সেপ্টেম্বরের আরেকটি অফিস আদেশে চারজন কর্মচারীকে বদলির আদেশও বাতিল করা হয়েছে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদন ক্রমে। তাতে বলা হয়েছে- এই চার কর্মচারীকে সচিবের মাধ্যমে নথি উপস্থাপন ছাড়াই বদলি করা হয়েছে। এ কারণে বোর্ড চেয়ারম্যানের অনুমোদনক্রমে এসব বদলির আদেশও বাতিল করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আবারো সংস্থাটির বোর্ড সভা ডেকে ডিজির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।


আরো সংবাদ