১৭ নভেম্বর ২০১৯

দেশী-বিদেশী পাইলটরা লেজার লাইট আতঙ্কে

দেশী-বিদেশী পাইলটরা লেজার লাইট আতঙ্কে - ছবি : সংগৃহীত

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ উড্ডয়ন এবং অবতরণ করার সময় প্রতিনিয়ত লেজার লাইট আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে দেশী-বিদেশী পাইলটদের। সিভিল এভিয়েশন অথরিটির কাছে পাইলটদের চোখে লেজার লাইট মারাসংক্রান্ত লিখিত অভিযোগ বার বার দেয়ার পরও অদ্যাবধি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে পাইলটসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেজার লাইট মারার ঘটনায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ উড্ডয়ন অথবা অবতরণের সময় বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি, তারপরও যেকোনো সময় দুর্ঘটনায় পড়ে এয়ারক্রাফট ক্র্যাশ করার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উত্তর দিকের বাউনিয়া বাঁধের (রানওয়ের বাইরে) সামনে উড়োজাহাজ উড্ডয়ন অবতরণের দৃশ্য দেখতে শত শত মানুষ ভিড় করেন। নারী-পুরুষের সাথে বিভিন্ন বয়সের শিশুরাও উড়োজাহাজ উড্ডয়ন অবতরণের দৃশ্য দেখে আনন্দ পান। তবে এ সময় খেলার ছলে কেউ কেউ উড়োজাহাজ ল্যান্ডিং করার সময় লাল, সবুজ, নীল লেজার লাইট এয়ারক্রাফটের দিকে মারছে। কখনো কখনো লেজার লাইটের আলো সরাসরি পাইলট ও ফার্স্ট অফিসারের চোখে পড়ে। এতে প্রায়ই ল্যান্ডিংয়ের সময় (দেড় শ-দুই শ’ মিটার দূরত্ব) গিয়ে পাইলটদের হঠাৎ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তারপরও পাইলটরা এই সমস্যার পরও নিরাপদে ফ্লাইট ল্যান্ড করছেন। যদিও পরবর্তীতে তারা লেজার লাইট মারার সমস্যার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশন, সিভিল এভিয়েশনের ফ্লাইট সেফটি বিভাগের কাছে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য লিখিত অভিযোগ জানাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরে পাইলটরা এই সমস্যা নিয়ে ফ্লাইট চালাচ্ছেন। কিন্তু লেজার লাইট মারা বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ সিভিল এভিয়েশন অথরিটির পক্ষ থেকে নেয়া হয়নি। যার কারণে এখনো দিনে রাতে সমানে উড়োজাহাজ অবতরণ ও উড্ডয়নের সময় লেজার লাইট ব্যবহারের অভিযোগ অহরহ উঠছেই।

গতকাল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান ও মুখপাত্র তাহেরা খন্দকারের কাছে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেলিফোন ধরেননি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বাউনিয়াবাধ রানওয়ে সীমানাসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে লেজার লাইট মারার দৃশ্যে দেখতে পাওয়ার ঘটনা জানিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি গিয়ে দেখলাম ছোট ছোট শিশুরা উড়োজাহাজ অবতরণ করার সময় লেজার লাইট মারছে। তিনি বলেন, এসব সমস্যা যাদের দেখার কথা সেই সিভিল এভিয়েশনের কোনো দায়িত্বশীল কাউকে সেখানে দেখা যায়নি। মূলত তাদেরই এই বিষয়গুলো দেখার কথা। তিনি বলেন, লেজার লাইটের কারণে যেকোনো সময় এয়ারক্রাফট অবতরণে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শুধু দেশী পাইলট নন, বিদেশী এয়ারলাইন্সের পাইলটরাও প্রায়ই লেজার লাইট সমস্যার কথা কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অভিজ্ঞ পাইলট ফজল মাহমুদ চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, লেজার লাইট ওয়ার্ল্ড ওয়াইড বিরাট একটা সমস্যা। আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটির ব্যাপারে লোকজনের সচেতনতা কম। না হলে প্লেনের মধ্যে এটা মেরে আনন্দ পাওয়ার কোনো কারণ দেখছি না। উনারা এটা মারলে যে ক্ষতি হয় সেটা তারা বুঝতে পারেন না। বিশেষ করে সবুজ লাইট। আমি ইউকে’তে দেখেছি। তারা এই লেজার লাইটের বিষয়টিকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এবং এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশেও তাই। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, লেজার লাইটের কারণে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো উড়োজাহাজ উড্ডয়ন অথবা অবতরণের সময় দুর্ঘটনা ঘটেনি, তবে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়ে গেছে। একজন পাইলটের জন্য চোখটা খুবই ইমপরটেন্ট জিনিস। লেজার লাইট মারার কারণে এমনিতে চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এছাড়া তো সুক্ষè প্লেনেরও একটা বিপদ আছে। মনে করেন কিছুক্ষণের জন্য চোখে যদি ভালোমতো দেখতে না পাওয়া যায় তখন তো সব গণ্ডগোল হয়ে যাবে। তখন ক্র্যাশ করতে পারে। অন্যান্য বিপদও হতে পারে। আমার ফ্লাইটের সময় দেখছি রাতের বেলা লেজার লাইট মারার ঘটনা বেশি ঘটছে।

এ প্রসঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির স্টেশন এয়ার ট্রাফিক অফিসার (সেটো) এস এম ওয়াহিদুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত দেশী-বিদেশী পাইলটদের কাছ থেকে এয়ারক্রাফট ল্যান্ডিং এবং টেকঅফের সময় লেজার লাইট মারার লিখিত অভিযোগ পাচ্ছি। যখন যেখান থেকে লেজার লাইট মারার অভিযোগ পাইলটদের পক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে সাথে সাথে আমরা উত্তরা থানা, বিমানবন্দর অথবা খিলক্ষেত থানাকে অবহিত করছি। এ সংক্রান্ত বিষয়ে সিভিল এভিয়েশন থেকে সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও দেয়া হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন কারা কোন ভবন থেকে লেজার লাইট এয়ারক্র্যাফট উদ্দেশ্য করে মারছে সেটি আমরা কিভাবে শনাক্ত করব? কারণ এলাকাটা তো অনেক বড় এলাকাজুড়ে। বাউনিয়া ছাড়াও আশপাশের ভবন থেকেও মারা হচ্ছে। এটি নিয়ন্ত্রণে পাবলিক এওয়ারনেস দরকার বলে তিনি মনে করেন। আর এই সমস্যাটা শুধু আমাদের বাংলাদেশে নয়, সারা ওয়ার্ল্ডেই এমন সমস্যা রয়েছে বলে তিনি জানান। টাওয়ার থেকেও প্রতিনিয়ত আমাদের বিষয়টি অবহিত করা হচ্ছে।


আরো সংবাদ