১০ ডিসেম্বর ২০১৯

অনৈতিক সম্পর্কে কর্মকর্তাদের পরিবারে অস্থিরতা বাড়ছে

অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন প্রশাসন ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাদের স্ত্রীর করা অভিযোগ জমা হচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু অভিযোগগুলোর বড় অংশই সেখানেই চাপা পড়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ কিছু কিছু দফতরের চাপের কারণে হাতেগোনা কিছু অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। এসব অভিযোগ তদন্তও করছেন নিজ ক্যাডারেরই সিনিয়র কর্মকর্তারা।

তদন্তের নামে নানা কৌশলে অভিযুক্ত জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে। আবার কিছু কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ওএসডি করার মাধ্যমে আইওয়াশ করা হচ্ছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও তদন্ত অব্যাহত থাকলেও তদবিরের মাধ্যমে পদোন্নতি লাভ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করার ঘটনাও ঘটছে। ফলে ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন প্রশাসন ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের প্রমাণসহ অভিযোগ উঠলেও খুব কম ক্ষেত্রেই শাস্তি পাচ্ছেন তারা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ১০ বছরে প্রশাসনের দুই হাজার ৭৪৮ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগ তদন্ত করে মাত্র ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা পায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরপর প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আলোকে ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এর আগেসহ এ নিয়ে মোট ৪৪০টি বিভাগীয় মামলার মধ্যে গত ১০ বছরে ৬৭ জন কর্মকর্তাকে গুরুদণ্ড, ১২৬ কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড, ২০৩ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ৪৪টি বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

২০১৪ সালে রূপগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা আবু জাফর রাশেদ। স্ত্রী ও দুই মেয়ে থাকা সত্ত্বেও তিনি সেখানে কর্মরত থাকাকালে এক বিবাহিত নারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। স্ত্রী এর প্রতিবাদ করলে তার ওপর মানুষিক ও শারীরিক নির্যাতন করতে থাকেন তিনি। ওই বছরের ১৩ মার্চ স্ত্রী ও দুই মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করে দেন তিনি। এরপর ৩০ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী। ওই বছরের ১৪ অক্টোবর একই অভিযোগ করেন অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ওই নারীর স্বামীও। এরপর ৮ এপ্রিল আবু জাফর রাশেদকে ওএসডি ও ১৫ এপ্রিল সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অভিযুক্তের স্ত্রী এবং অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো নারীর স্বামীর পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করার পরও অভিযুক্ত আবু জাফর রাশেদকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এরপর গত বছরের ২৭ এপ্রিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব (উপসচিব) পদে পদোন্নতি পান তিনি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে অভিযোগের প্রতিকার না পেয়ে ওই নারী প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তার আবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করলে আবারো তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। এখনো বিচারের আশায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন ওই নারী।

২০১৬ সালে ৩৪তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পান বর্তমানে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে কর্মরত সারোয়ার সালাম। তার প্রথম কর্মস্থল ছিল ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। সেখানে একজন নারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন সারোয়ার সালাম। বিষয়টি জানতে পেরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন ওই কর্মকর্তার স্ত্রী।

লিখিত অভিযোগে তিনি বলেন, তার স্বামী ও নারী ম্যাজিস্ট্রেটের পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়টি ডরমিটরিতে বসবাসকারী অনেকে স্বচোখে দেখে তাকে অবহিত করেন। ফেনী ডরমিটরিতে গিয়ে তিনি দেখতে পান তার স্বামীর ব্যবহারের কাঁথা-বালিশ ওই নারী কর্মকর্তার রুমে। কাঁথা-বালিশের খোঁজ করলে ওই নারী কর্মকর্তা তার এক জুনিয়র সহকর্মী দিয়ে আমার কাছে কাঁথা-বালিশ পাঠান। এ ঘটনার দু’দিন পর ওই নারী কর্মকর্তা রাত ১১টায় আমার রুমে এসে আমাকে হুমকির সুরে বলেন, আমরা ম্যাজিস্ট্রেট, যা ইচ্ছা তাই করব। আমরা দু’জন দুইজনকে ভালোবাসি, আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক হয়ে গেছে, এটা আপনাকে মেনে নিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে হয় আপনি চুপচাপ থাকবেন, না হয় আপনাকে কৌশলে তাড়িয়ে দেয়া হবে। সেদিনই তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালান সারোয়ার সালাম এবং পরদিনই জোর করে বাচ্চাসহ আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন।

লিখিত অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, বিষয়টি পারিবারিকভাবে সুরাহা করার জন্য আমার ও তার অভিভাবকরা মিলে সারোয়ার সালামকে ডেকে পাঠান। কিন্তু তিনি আসেননি। এরপর আমি ফেনীর ডিসির স্ত্রীর কাছে মৌখিক অভিযোগ দেই। ডিসি ওয়াহিদুজ্জামান ও এডিসি চৌধুরী সুজন স্যার ঘটনার সত্যতা পেয়ে সারোয়ারকে ডেকে এসব না করার জন্য বলেন এবং ওই নারী কর্মকর্তাকেও শাসন করেন। তারা এভাবেই বিষয়টি সুরাহার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সারোয়ার সালাম আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন অব্যাহত রাখেন। পরে তাদের বিরুদ্ধে আমি থানায় জিডি করি। এরপর সারোয়ার সালামকে ব্রাহ্মহ্মণবাড়িয়া আর ওই নারী কর্মকর্তাকে মৌলভীবাজারে বদলি করা হয়। স্বামীর অব্যাহত নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে মহানগর হাকিম আদালত, ঢাকায় যৌতুকনিরোধ আইনে মামলা দায়ের করি। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে চার্জ গঠন করেছেন। মামলা দায়েরের পর আমার ও আমার পরিবারকে সারোয়ার সালাম নানা ধরনের হুমকি ও মানসিক চাপ দিয়ে যাচ্ছেন।

বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না তিনি। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে মাঠপ্রশাসনকে দায়িত্ব দিলে মাঠপ্রশাসন অভিযোগ সত্য নয় বলে প্রতিবেদন দিয়েছে। গত ৯ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, অভিযোগ ও প্রেরিত তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অভিযোগটি সারোয়ার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরুদ্ধে তার স্ত্রী খাজিদা আক্তার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পরিবারের খোঁজখবর ও ভরণ-পোষণ না করা, তালাক প্রদানের হুমকি, ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর করতে বল প্রয়োগ করা সংক্রান্ত। কিন্তু প্রতিবেদনে উল্লিখিত কোনো বিষয়ই উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে গুরুতর পারিবারিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। মতামতে জানানো হয়েছে, দ্বন্দ্ব নিরসনে একাধিকবার সমঝোতার প্রয়াস চালানো হয়েছে, কিন্তু এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা প্রতীয়মান হয়নি। অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, প্রতিবেদনটি যথাযথ ও সুস্পষ্ট নয়। এমতাবস্থায় এ বিষয়ে আবার তদন্ত করে সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রামের মাধ্যমে এ বিভাগে প্রেরণের অনুরোধ করা হলো।

মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মিতু মরিয়মকে। কিন্তু তিনিও তার নিজ ক্যাডারের কর্মকর্তাকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তদন্তের শুনানির সময় অভিযোগকারীকে নানাভাবে তাচ্ছিল্য করেছেন। বিষয়টি অভিযোগকারী মৌখিকভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানিয়েছেন।

পরকীয়ার অভিযোগে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আব্দুল কুদ্দুসের সাথে তার স্ত্রী আফরোজা পারুলের গত ৬ মার্চ দিনের বেলা রাস্তার মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে বরিশাল বদলি হন। কিন্তু তিনি ওই পদে যোগ দিতে গড়িমসি করতে থাকেন। তার কিছু কাজ বাকি আছে, ওই কাজ শেষ করতে কিছু সময় বোরহানউদ্দিন থাকা প্রয়োজন দাবি করে জেলা প্রশাসকের কাছে সময় চান সেই ইউএনও।

এরই মধ্যে ইউএনও থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে কাজে যোগ দেন তার স্ত্রী আফরোজা পারুল। তিনি স্বামী কুদ্দুসের বোরহানউদ্দিনে অবস্থানকে ভালো চোখে না দেখে দু’দিন আগে ছুটে যান ওই এলাকায়। ওই দিন ইউএনও কুদ্দুস মোবাইল ফোন রেখে অফিসে গেলে ওই মোবাইল ফোনে কিছু আপত্তিকর ছবি দেখে ক্ষুব্ধ হন স্ত্রী। ঘরের কিছু জিনিসপত্র ভাঙচুর করার পাশাপাশি ইউএনও কুদ্দুস বোরহানউদ্দিন ছেড়ে যাবেন কি না জানতে তার অফিসে ছুটে যান স্ত্রী। খবর পেয়ে ইউএনও কুদ্দুস অফিস থেকে বের হয়ে এলে উপজেলা পরিষদের রাস্তায় স্ত্রীর সাথে তার ঝগড়া হয়। এ সময় ইউএনও স্ত্রীকে সামাল দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এসব দৃশ্যের ভিডিও ফুটেজ মুহূর্তে ফেসবুকে ভাইরাল হয়। বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তদন্তে অপরাধের প্রাথমিক সতত্যা পেয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়।

এ ধরনের অনৈতিক কাজের জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী চাকরিচ্যুত করার বিধান রয়েছে। এমনকি সরকারি কর্মচারী আপিল ও শৃঙ্খলা বিধিতেও এসব ঘটনায় গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরিচ্যুতের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তাকেই এমন শাস্তি দেয়ার নজির নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। জনপ্রশাসনে এসব গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ‘ওএসডি’। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলি ইমাম মজুমদার বলেন, কর্মকর্তাদের অসদাচরণে ওএসডি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। তবে এটি আইনগত কোনো শাস্তি নয়। তদন্তের পর অভিযুক্ত হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার না হওয়া একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অন্যায়ের অভিযোগ এলে তা তদন্ত করে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া উচিত। এটি না হলে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে জুনিয়র কর্মকর্তাদের ওই কাজে উৎসাহিত করা হয়। এ জন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগ আমলে নিয়ে তা তদন্ত করা উচিত।


আরো সংবাদ