২৪ জানুয়ারি ২০২০
প্রবাসী কল্যাণ ভবনের সামনে ব্রুনাই ফেরত শ্রমিকদের মানববন্ধন

দুই দালালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্রুনাই হাইকমিশনের চিঠি

প্রবাসী কল্যাণ ভবনের সামনে ব্রুনাই ফেরত শ্রমিকদের মানববন্ধন ইনসেটে মেহেদী হাসান বিজন ও আব্দুর রহিম - নয়া দিগন্ত

কথা ছিল ভাল বেতন দেবে। বেতন হবে ৪০-৪৫ হাজার টাকা। অভাবের সংসারে সুখ আনতে দালালের এমন আশ্বাসে বিশ্বাস রেখেছিলেন টাঙ্গাইলের নাগরপুরের হায়াত আলী। আব্দুর রহিম নামে এক ব্রুনাই প্রবাসী দালালের কোম্পানিতে (কয়েকদিন আগে জেল খেটে দেশে ফিরেছেন) শ্রমিক হিসেবে যান। সাইফুল নামে আরেক দালাল হায়াত আলীকে ব্রুনাই পাঠায়। কিন্তু, ব্রুনাইতে গিয়ে ৫ মাস কাজকর্ম না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন শেষে কয়েকদিন আগে দেশে ফিরেছেন তিনি।

আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর ইস্কাটনে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ভবনের নিচে দালালের বিচার দাবিতে হায়াত আলীসহ কয়েকজন প্রতারণার শিকার ব্রুনাই ফেরত বাংলাদেশী শ্রমিক মানববন্ধন করেন। দালালদের কঠোর শাস্তিসহ ক্ষতিপূরণ দাবি করে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

হায়াত আলী বলেন, দালাল সাইফুল কইছিল ৪০-৪৫ হাজার টাকা মাসে বেতন দিব। ভাল কাজ দিব। কিন্তু, সেখানে গিয়ে আমাদের কোনো কাজ দেয়নি। একটা ঘরে আটকে রাখে। দুই বেলা খেতেও পারতাম না। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে খেয়ে কোনোমতে বেঁচে এসেছি। ৫ মাস ছিলাম। এর মধ্যে কোনো কাজ তারা দিতে পারেনি আমাদের। নিজের টাকায় বিমানের টিকেট কেটে কয়েকদিন আগে দেশে ফিরেছি।

কথা হয় ব্রুনাই ফেরত জাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে ব্রুনাইয়ে গিয়েছিলেন তিনি। গত ৩ নভেম্বর দেশে ফিরেছেন। যে কোম্পানিতে নিয়ে যায়, সেখানে কোনো কাজ-কাম দেয়নি। একটা রুমে নিয়ে আটকে রাখে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির দালাল নুর মোহাম্মদ আমাকে নিয়ে যায়। এক সাথে আমরা ১৪ জন গিয়েছিলাম। আগে পরে মিলে কমপক্ষে ৪০ জন ব্রুনাইতে নিয়ে যায় সে। এভাবে নিয়ে কাউকে কাজ দিতে পারেনি। রাস্তায় ছেড়ে দেয়। আমরা সবাই মানবেতর জীবন যাপন করে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগীতায় জীবন নিয়ে কোনোমতে দেশে ফিরেছি।

দেশে ফেরা দুই দালালকে আইনের আওতায় আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি

এদিকে দেশের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে এবং ভবিষ্যতে দেশের বাইরের শ্রমবাজারকে নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে মেহেদি হাসান বিজন ও আব্দুর রহিম নামের দুই দালালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছেন ব্রুনাই দারুসসালামে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন। গত ৮ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর এই চিঠিটি হাইকমিশনার বলেন, গত ৩০ জুলাই ব্রুনাইয়ের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ মিশনের যৌথ অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশি দালাল চক্র একাট্টা হয়ে হাইকমিশনের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। পুলিশ এসব দালাল চক্রের বিভিন্ন আস্তানায় এরই মধ্যে অভিযান চালিয়েছে। পুলিশি অভিযানে এসব দালালদের কাছ থেকে জাল ভিসা তৈরির কাজে ব্যবহৃত সরকারি দফতরের সিলমোহর ও নকল স্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সরকারি অফিসের সিলমোহর ও দলিল জালিয়াতির ঘটনায় বাংলাদেশি দালাল মেহেদী হাসান বিজনের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। বর্তমানে ব্রুনাই থেকে বিতাড়িত ভিসা দালালচক্র বাংলাদেশ হাইকমিশন কমিশনের অফিসারদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা অভিযোগ ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এসব মানবপাচার ও ভিসা দালাল চক্রের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন, যেন বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন খাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরে আসে।

চিঠিতে মিশন প্রধান আরো বলেন, ‘বর্ণিত প্রেক্ষাপটে ব্রুনাই দারুসসালাম বাংলাদেশী শ্রমবাজার রক্ষার্থে ব্রুনাইয়ে মানবপাচার ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকা এবং ব্রুনাইয়ের বাংলাদেশ মিশনের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে অপপ্রচার চালানোর কারণে মেহেদী হাসান ও আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দায়েরসহ আইনি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’

ভিটেমাটি বিক্রি করে আসা শ্রমিকদের কাজ না দিয়ে মানব পাচারকারীরা শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা করছে উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, ‘ব্রুনাই দারুসসালামে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার বাংলাদেশী কর্মী কর্মরত। ২০১৭ সালের পর থেকে ব্রুনাইয়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ায় এবং শ্রমঘন বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাতিল হওয়ায় এ দেশে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা কমতে থাকে। এতে অনেক প্রবাসী কর্মী বেকার হয়ে পড়ে। তবে কিছু বাংলাদেশী দুষ্কৃতিকারী ব্রুনাইয়ের স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় এবং ব্রুনাইয়ের ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টের কিছু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কথিত বডি কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে অসংখ্য বাংলাদেশী শ্রমিক ব্রুনাইতে এনেছে। ভিটেমাটি বিক্রি করে আসা শ্রমিকদের কাজ না দিয়ে মানব পাচারকারীরা শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। প্রতারিত শ্রমিকরা ভিক্ষাবৃত্তি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। দেশটির সুলতান ব্রুনাইয়ের শ্রম ও ইমিগ্রেশন বিভাগ আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পরপরই ব্রুনাই কর্তৃপক্ষ মানবপাচার, বডি কন্ট্রাক্ট, ভিসা জালিয়াতিসহ ভিসা ব্যবসায় জড়িত বাংলাদেশী কতিপয় দালাল চক্রকে শনাক্ত করে এবং দালাল ও ভিসা জালিয়াতি রোধে বেশকিছু অভিযান পরিচালনা করে।’

মালয়েশিয়ার একজন নারীকে শক্তি প্রয়োগ করে দালাল চক্র মিশনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে। এতে বলা হয়, এসব মানবপাচারকারী প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ হাইকমিশন যখন শক্ত অবস্থান নেয়, তখন তারা হাইকমিশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার শুরু করে। গত অক্টোবর মাসে মালয়েশিয়ার নাগরিক সারাহ ওয়াকিল বাংলাদেশের ভিসার জন্য আবেদন করলে হাইকমিশন তার আবেদন নাকচ করে। দালালচক্র ওই নারীকে ব্যবহার করে ‘ঘুষ না দেয়ায় ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে’ মর্মে একটি ভিডিও তৈরি করে, যা সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। এসব অপপ্রচার মিথ্যা সংবাদ বাংলাদেশ মিশনের সুনাম ও ভাবমূর্তি নষ্ট করার পাশাপাশি বাংলাদেশি শ্রমবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, পরবর্তী সময়ে ওই মালয় নাগরিক ব্রুনাইয়ের স্থানীয় থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার অভিযোগ তিনি উল্লেখ করেন, হাইকমিশনের বিরুদ্ধে মামলা করা উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া, এমনকি সোস্যাল মিডিয়াতে লাইভে এসে ‘ঘুষ না দেয়ায় দুই দুইবার ভিসা বাতিল করা হয়’ মর্মে অভিযোগ করতে বাংলাদেশী মানবপাচারকারী দালাল মেহেদী হাসান ও আব্দুর রহিম প্রণোদিত করেছে। মেহেদি হাসান একপর্যায়ে ওই মালয় নাগরিককে পিস্তল দিয়ে ভয় দেখিয়ে হাইকমিশনের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য করতে চেষ্টা করে। একজন বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য করার চেষ্টা করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। মেহেদী হাসানের এমন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হলে মন্ত্রণালয় এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত মেহেদী হাসানের প্রত্যাহার করেছে।

হাইকমিশনার মাহমুদ হোসেন চিঠিতে বলেন, মেহেদি হাসান শ্রমিক ভিসায় গেলেও তিনি এ পর্যন্ত প্রায় কয়েক হাজার বাংলাদেশী কর্মীকে ব্রুনাই নিয়ে এসেছেন। তিনি বর্তমানে ব্রুনাইতে ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে কর্ণধার। সম্প্রতি নামসর্বস্ব এসব দালালি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ব্রুনাই। মেহেদি হাসান এর আগে ১৩৫ জনের জন্য ভিসা আবেদন করে। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রকল্প না থাকায় মিশন তার আবেদন প্রত্যাখ্যান। পরবর্তী সময়ে, মেহেদী হাসান এয়ারপোর্টে বডি কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কর্মীদের ব্রুনাইয়ের নিয়ে আসেন। তার প্রতিষ্ঠান একজন কর্মী দুর্ঘটনায় ডান হাতের আঙুল হারালে তাকে চিকিৎসা ও কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জোর করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া তার কর্মীরা প্রতিশ্রুতি না পেয়ে ৮-১০ জন মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে এবং দু’জনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তারা ব্রুনাইয়ে দুই বছরের কারাভোগ করছেন।

ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশের হাইকমিশনার চিঠিতে আরো বলেন, মেহেদী হাসান অনেক শ্রমিককে ২ লাখ টাকার বিনিময় মালয়েশিয়ায় পাচার করে দেন। তার পাচার কাজের অংশ হয়ে তিন জন শ্রমিক এখানে বর্তমানে বিচারাধীন। তার বিরুদ্ধে হাইকমিশনে কমপক্ষে ৫০ জনেরও বেশি শ্রমিক নির্যাতন ও প্রতারণার অভিযোগ করেছেন।


আরো সংবাদ