১৭ আগস্ট ২০১৯

রাজধানীতে চলছে বৃক্ষমেলা

-

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে চলছে মাসব্যাপী এই মেলা। পরিবেশ রক্ষায় মানুষকে গাছের গুরুত্ব বিষয়ে সচেতন করতে এবং দেশীয় গাছের প্রজাতিগুলো টিকিয়ে রাখতেই মূলত এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। হরেক রকমের দেশী ও বিদেশী গাছের সাথে একান্তে সময় কাটাতে চাইলে আপনাকে ঢুঁ মারতে হবে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাণিজ্যমেলার মাঠে। গতকাল মেলা ঘুরে দেখা গেছে, দেশীয় জাতের গাছগুলো গুরুত্ব হারিয়েছে মেলায়। নার্সারিগুলো ঝুঁঁকেছে বিদেশী গাছ ও হাইব্রিড জাতের গাছ চাষের দিকে। লিখেছেন মাহমুদুল হাসান

তপ্ত রোদের খাঁখাঁ দুপুরে বেশ একটা মিষ্টি হাওয়া খেলে গেল সবুজে ঘেরা আঙিনায়। সেই বাতাসে ফুলের মিষ্টি গন্ধ। হেলেদুলে উঠল গাছের ডালে ঝুলে থাকা টসটসে পাকা আম। আম ছাড়াও মেলায় গাছের ডালে ডালে শোভা পাচ্ছে কমলা, আমলকী, করমচা, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলসহ গাছ। টবের গাছে ঝুলে থাকা ডাসা ডাসা সব ফলের মুগ্ধতা কাটতে না কাটতেই আপনাকে আপ্লুত করে তুলবে রঙ-বেরঙের গোলাপ ফুল। মাটির বড় সানকিতে ফুটে আছে পদ্মফুল। গত ২০ জুন থেকে ‘শিক্ষায় বন প্রতিবেশ, আধুনিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে শুরু হয়েছে বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০১৯।
বৃক্ষমেলা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ফলের মধ্যে আম, পেয়ারা, বেল, লটকন, জাম্বুরা, মাল্টা, কমলা, কামরাঙ্গা, জামরুল, শরিফা, আতা, করমচা ও আমলকী গাছের উপস্থিতিই বেশি। তবে মেলায় এসব ফলের যেসব গাছ আছে, সেগুলো দেশী জাতের নয়। গাছগুলোর বেশির ভাগই হাইব্রিড থাইল্যান্ড বা চায়না জাতের। এ ছাড়া সৌদি আরবের খেজুর থেকে শুরু করে থাই ড্রাগন, আমেরিকান অ্যাভোক্যাডো, চায়না পিচফল, ইউরোপের মালবেরি, দক্ষিণ আমেরিকান জাবাটিকাবা, থাই লংগানের মতো ফলের চারাও মিলছে বৃক্ষমেলায়। আকারে বড় ও দেখতে লোভনীয় বিদেশী এসব ফলের ভিড়ে দেশী জাতের ফলের গাছ খুঁজে পাওয়াই মুশকিল।
শুধু ফল নয়, ফুল গাছের চারাতেও চিত্র একই। দেশী জাতের গাঁদা, বেলি, নয়নতারা, নন্দিনীর মতো কিছু ফুলগাছ চোখে পড়ছে মেলায়; তবে পরিমাণে নগণ্য। ফুলগাছ বলতেই নার্সারিগুলোতে চোখে পড়ছে থাই, ইন্ডিয়ান ও চায়না জাতের জবা, অর্কিড, পাতাবাহার, গাঁদা, জারবেরা আর ক্যাকটাস।
যশোর থেকে বৃক্ষমেলায় অংশ নিতে এসেছেন ‘আল্লাহর দান’ নার্সারির মালিক মোশাররফ আলী। তিনি বলেন, বৃক্ষমেলা উপলক্ষে ‘নাকাচুয়া’ নামের একটি জাপানি গাছ এনেছেন। এই গাছ এমনিতে খুব একটা পাওয়া যায় না। ক্রিসমাস ট্রির মতো চমৎকার আকার নিয়ে বেড়ে ওঠে গাছটি। ‘লিভিং আর্ট’ নার্সারি কেবল বনসাই নিয়েই অংশ নিয়েছে মেলায়। এখানে চার হাজার থেকে শুরু করে ৭০ হাজার টাকার বনসাই পাওয়া যাচ্ছে। মেলার ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড় এখনো সেভাবে শুরু হয়নি মেলায়। বিক্রেতারা জানালেন, ছুটির দিনের বিকেলে ক্রেতাসমাগম হয় বেশি। এ ছাড়া দিন গড়ালে ভিড় বাড়বে এমনিতেই।
মগবাজার থেকে রুবাইয়া তাসনিম এসেছিলেন মেলায়। তিনি জানালেন, প্রতি বছরই বৃক্ষমেলা থেকে গাছ কেনা হয়। ছাদে বাগান আছে। সেখানে লাগানোর জন্য লটকন ও কমলা গাছ কিনতে এসেছেন। মোহাম্মদপুর নিবাসী লিটু হাসান জানালেন, বারান্দায় রাখার জন্য জুতসই ফুলের গাছ কিনতে এসেছেন।
ছাদে ও বারান্দায় লাগানোর উপযোগী বিভিন্ন ফলগাছের চাহিদা বেশি বলে জানালেন রবিউল নামে একটি নার্সারির বিক্রয়কর্মী। ড্রামে লাগানো বাতাবি লেবু, চায়না লেবু, করমচা, আমলকী, পেয়ারা গাছ বিক্রি হচ্ছে বেশি। ফুলগাছের মধ্যে গোলাপ, বেলি, গন্ধরাজের চাহিদা বেশি বলে জানা গেল। বিশেষ করে বারোমাসি ফুলের ওপর আগ্রহ বেশি সবার। মেলায় নতুন ধরনের এই ইনডোর প্ল্যান্ট নজর কাড়ছে দর্শনার্থীদের। ইনডোর প্ল্যান্ট ও হরেক জাতের রঙবেরঙের ক্যাকটাস রয়েছে মেলায়। বিশাল আকৃতির চাইনিজ বটের বনসাই বিক্রি হচ্ছে আড়াই লাখ টাকায়।
দর্শনার্থীদের বেশি দেখা মিলল ‘ডানকানস অর্কিড স্টল’ এ নজরকাড়া সব রঙের অর্কিড দেখা গেল। বারান্দা ও হালকা রোদে অর্কিড ভালো থাকে বলে জানালেন স্টলের বিক্রেতা। ঝুলন্ত অর্কিডগুলো ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
‘সৌদি খেজুর নার্সারি অ্যান্ড অ্যাগ্রো’ নিয়ে এসেছে সৌদি খেজুরের চারা। বিক্রেতা গোলাম হোসেন জানালেন, সৌদি খেজুরের বীজ থেকে বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত এসব চারার প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এর মধ্যেই ড্রামে লাগানো দু’টি খেজুর গাছ বিক্রি করে ফেলেছেন দুই লাখ ২০ হাজার টাকায়। এ ছাড়া চারা রয়েছে, দাম পড়বে দুই হাজার টাকা।
বিদেশী জাতের পাশাপাশি আমের পাশাপাশি জাম্বুরা, ডালিম, থাই আমলকী, চায়না লেবুর গাছ কিনছেন অনেকেই। কমলা গাছ তিন হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাঙ্গোসহ আরো নানা জাতের আমের চারা ও গাছ রয়েছে মেলায়। দাম এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু। গোলাপ গাছের চারা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। গোলাপের পাশাপাশি কামিনী, গাঁদা, জারবেরা, রঙ্গন, কাঠ গোলাপ, করবী গাছ রয়েছে। ফলদ বৃক্ষের মধ্যে বিলাতি গাব, লাল কাঁঠাল, স্ট্রবেরি পেয়ারা, থাইল্যান্ডের ডুরিয়ানের মতো বিদেশী ও হাইব্রিড গাছের উপস্থিতি বেশি লক্ষ করা গেছে।
মেলায় গাছের পাশাপাশি গাছ লাগানোর টব, ড্রাম, কীটনাশক, সারসহ বিভিন্ন কিছু পাওয়া যাচ্ছে। মেলায় গাছের পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র। মেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও তথ্যকেন্দ্রসহ এবারের মেলায় মোট স্টলের সংখ্যা ১০৪টি। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে বৃক্ষমেলা। মাসব্যাপী এই মেলা শেষ হবে আগামী ২০ জুলাই।
ছবি : নূর হোসেন পিপুল


আরো সংবাদ