১৭ আগস্ট ২০১৯

ওষুধে মরছে না মশা

-

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ছিটানো ওষুধে মশা মরছে না। বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা ১৪ মাস আগেই বলেছিলেন, মশার ওষুধ কার্যকারিতা হারিয়েছে। সব জেনেও কর্তৃপক্ষ মশা মারার ওষুধ পরিবর্তনে পদক্ষেপ নেয়নি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা ওষুধ অকার্যকর হওয়ার কথা সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বলছে, স্বাস্থ্য অধিদফতর বিকল্প ওষুধের সুপারিশ করেনি। তাই আগের ওষুধই ব্যবহার করা হচ্ছে। অবাক করার বিষয় হলো কর্তৃপক্ষ যদি এখন ওষুধ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে নতুন ওষুধ ব্যবহার করতে অন্তত ছয় মাস লাগবে। এদিকে, রাজধানীর মানুষ মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এ বছর বর্ষা মওসুম শুরুর সাথে সাথে রাজধানীতে ডেঙ্গুজ্বর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
কীটতত্ত্ববিদ মঞ্জুর চৌধুরী জানিয়েছেন, দীর্ঘ ব্যবহারে অকার্যকর হয়ে পড়েছে ওষুধ। মশা ওষুধপ্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। মশা মারতে হলে নতুন ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। কীটনাশকের বাইরে অন্য বিকল্প পন্থাও বেছে নিতে হবে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, এত দিনেও ওষুধ পরিবর্তন করার পদক্ষেপ না নেয়ার অর্থ সরকার বৈজ্ঞানিক তথ্য অস্বীকার করছে, না হয় জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্বহীন মনে করছে। জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের এ ধরনের অবহেলা ও উদ্যোগহীনতা ক্ষমার অযোগ্য।
সিটি করপোরেশন এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিবছরই মশার ওষুধ ছিটান। কর্মকর্তারা বলেছেন, দুই ধরনের ওষুধ তারা ব্যবহার করেন। পূর্ণাঙ্গ মশা ও মশার লার্ভা মারার জন্য যথাক্রমে এডাল্টি সাইট ও লার্ভা সাইট ব্যবহার করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত অর্থবছরে তারা ১৯ কোটি টাকার ওষুধ কিনেছিলেন। উত্তর সিটি করপোরেশন কিনেছে ১৮ কোটি টাকার ওষুধ।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো: আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু ওষুধে মশা মরছে না এ বিষয়টি আমাদের জানা আছে। ওষুধ পরিবর্তন করা হবে, নতুন ওষুধ কেনা হবে। এ ব্যাপারে আইসিডিডিআরবি, আইইডিসিআর ও পরিবেশবিদদের নিয়ে আগামী সপ্তাহে একটি সভা ডাকা হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ডেঙ্গু ভাইরাস বাহক এডিস মশা প্রচলিত কীটনাশক দিয়ে মরছে না। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে করা গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, ঢাকা শহরের এডিস মশা ওষুধ প্রতিরোধী। বর্তমান ওষুধে তারা মরে না। ডেঙ্গু ভাইরাস বাহক এডিস মশা প্রচলিত কীটনাশক দিয়ে মরছে না।
আইসিডিডিআরবির প্যারাসাইটোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ও এই গবেষণা দলের প্রধান মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আজিমপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, গুলশান, কড়াইল, মিরপুর ১, উত্তরা সেক্টর ৪, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া ও খিলগাঁও এলাকা থেকে এডিস মশার ডিম সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষাগারে সেই ডিম থেকে লার্ভা ও পরে মশা তৈরি করা হয়। সেই মশাকে ঢাকা শহরে ব্যবহার করা হচ্ছে, এমন কীটনাশকের সংস্পর্শে আনা হয়। তাতে দেখা যায়, সব মশা মরছে না। কীটনাশকের বিষক্রিয়া সহ্য করেও অনেক মশা বেঁচে থাকছে। তিনি বলেন, ‘ল্যাবরেটরির এই ফলাফলের সাথে বাস্তব পরিস্থিতির মিল আছে বলেই আমরা মনে করি।’ এই গবেষণা হয়েছিল শুধু মশার ওষুধ নিয়ে। লার্ভার ওষুধের কার্যকারিতা অবশ্য দেখা হয়নি।
সিডিসি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে রাজধানীর সাতটি এলাকার কিউলেক্স মশা নিয়ে গবেষণা করে। এতে কারিগরি সহায়তা দেয় আইসিডিডিআরবি। ওই গবেষণাতেও ওষুধের অকার্যকারিতা ধরা পড়ে। মঞ্জুর চৌধুরী দাবি করেছেন, নিজের উদ্যোগে করা ছোট গবেষণায় তিনি দেখেছেন, ১৫ বছর আগে থেকে এটা হয়ে আসছে। সিটি করপোরেশন নিজ উদ্যোগে কাজটি করলে আগেই তারা জানতে পারত। সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা বলেছেন, শুরু থেকেই দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গবেষণার বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল এবং গবেষণা ফলাফল সম্পর্কেও দুই সিটি করপোরেশন জানে।
এই প্রেক্ষাপটে গত রোববার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলন কক্ষে ঢাকা মহানগরীর মশক নিধন কার্যক্রমবিষয়ক পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো: তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরীতে মশক নিধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য দফতর বা সংস্থা তাদের কার্যক্রম জোরদার করেছে। কাজেই এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
মশক নিধনে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ওষুধ কেনা হচ্ছে। সভায় কীটনাশক কেনার আগে এর যথাযথ মান যাচাই এবং মশক নিধন কার্যক্রমের নিবিড় তদারকি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন তিনি।
সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, এবার কেবল জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল এক হাজার ৭১৩ জন; যা বিগত তিন বছরের শুধু জুন মাসের তুলনায় ৫ গুণেরও বেশি। আর চলতি মাসের প্রথম চার দিনে ৩৫৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে কেবল গত বৃহস্পতিবার ১৪২ জন আক্রান্ত হয়েছেন।


আরো সংবাদ