২৯ জানুয়ারি ২০২০

ঢাকায় পর্যাপ্ত বিনোদনকেন্দ্রের সঙ্কট!

-

নাগরিক কর্মক্লান্ত জীবনে মানুষ যখন হাঁপিয়ে ওঠে তখন মানুষের মন চায় কোলাহলমুক্ত সবুজের সান্নিধ্য। নানা ব্যস্ততার মাঝেও বিনোদনপিয়াসু মানুষ খুঁজে ফেরে একটু প্রশান্তির ছায়া। ঢাকায় ছুটির দিনে কিংবা কাজের ফাঁকে বাইরে ঘুরতে বের হলেই পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। দুই দশক আগেও পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও পার্ক ছিল, যার বেশির ভাগই আজ বিলীন। ফলে কমেছে নগরবাসীর বিনোদনের পরিসর। রাজধানী ঢাকায় মানুষের
তুলনায় বাড়ছে না নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও বিনোদনের পরিবেশ। লিখেছেন সুমনা শারমিন

রাজধানীর জনসংখ্যা দুই কোটি ছুঁই ছুঁই। সময়ের সঙ্গে শহরে জনসংখ্যা, আকাশচুম্বী ভবন যেমন বাড়ছে তেমনই কমছে চার পাশের সবুজ। আধুনিক নগর জীবনে পার্ক ও মাঠকে বলা হয় ‘নগরের ফুসফুস’। কিন্তু রাজধানীতে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্ন পার্ক বা খেলার মাঠের বড়ই অভাব। যে কারণে রাজধানীর শিশু-কিশোররা আবদ্ধ হয়ে পড়ছে শিক্ষালয় ও বাসার চার দেয়ালের মধ্যে।
মানুষই একমাত্র প্রাণী যার বেঁচে থাকা তথা সুস্থ থাকার জন্য শুধু খাদ্য গ্রহণ করলেই চলে না, মনের আহারও চাই তার। সে জন্য মানুষ নিজে কিছু সৃষ্টি করে, তা না হলে অন্যের সৃষ্টি উপভোগ করে। তার চাই নির্মল বিনোদন। এই আনন্দ উপভোগ আবার ঠিক ঘরে বসে পুরোপুরি লাভ করা যায় না। যদিও আধুনিক যুগ তার হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে নানা বিনোদনের অজস্র উপকরণ ও সম্ভার। তবু তার চাই ঘরের বাইরে যাওয়া, দল বেঁধে বিনোদন লাভ করা। ঢাকা মহানগরীতে মানুষের তুলনায় বিনোদনকেন্দ্রের বিরাট ঘাটতি রয়েছে। তাই হাতেগোনা কয়েকটি বিনোদনকেন্দ্রে দলে দলে মানুষ ভিড় জমায়। আর এই ভিড়ের ফলে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে আনন্দদায়ক স্থানগুলো।
একসময়ের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ঘিরে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা শহর ঢাকা এখন ক্রমেই হারাচ্ছে মানুষের বাসযোগ্যতা। প্রায় দুই কোটি মানুষের ভারে অচল রাজধানীতে নেই পর্যাপ্ত আনন্দ আর বিনোদনের পরিবেশ। পর্যাপ্ত খোলা স্থানের অভাবে নগরবাসীর নাভিশ্বাস পরিস্থিতি। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়েও যেন একটি পরিবেশসম্মত বিনোদনকেন্দ্র পাওয়া যায় না। পুরান ঢাকার তুলনায় শহরের অন্য অংশে উন্মুক্ত স্থান বা পার্ক-উদ্যানও তুলনামূলক কম। আর যেটুকুও রয়েছে সেখানে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ প্রবেশ করতে পারে না। আর অন্যগুলোতে অপরিছন্নতা আর নিরাপত্তাহীনতায় চলাচল করা যায় না। রাজধানী ঢাকার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অল্পবিস্তর ফাঁকা জায়গায় মূলত মানুষের বিনোদনের চাহিদাও পূরণ করে থাকে। নগরজীবনে একটু বিশুদ্ধ নির্মল বাতাসের স্বাদ নিতে মানুষ ছুটে যায় বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। সরকারি উদ্যোগে এখন আর বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠে না বললেই চলে। অথচ বিশ্বের প্রায় সব উন্নত শহরে এলাকাভিত্তিক রয়েছে বিনোদনকেন্দ্র। রয়েছে পরিবেশবান্ধব নানা ধরনের বিনোদনের জায়গা। আর এগুলো সম্ভব হয়েছে নগর সরকারব্যবস্থা থাকার ফলে। রাজধানীর সার্বিক দেখভালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হাতে থাকলেও বিভিন্ন দফতরের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে না থাকায় পরিকল্পনামাফিক কাজ তারাও করতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, উন্নত শহরে করপোরেশনের হাতে নগর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ওয়াসার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকে। এরপর স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে করপোরেশন সব ধরনের কাজ সম্পন্ন করে। ১৯৯০ সালে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত নতুন করে কোনো পার্ক-উদ্যানের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়নি। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী ঢাকা শহর ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বড় আকারের উদ্যান ছাড়াও রাজধানীতে সিটি করপোরেশনের হিসাব মতে পার্ক রয়েছে ৪৭টি আর খেলার মাঠ ১০টি। কিন্তু এগুলো কাগজের সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া যায় না। এ হিসাব অনুযায়ী পৌনে চার লাখ মানুষের জন্য একটি পার্ক। আবার এ পার্কগুলোর মধ্যেও ১৭টি বেদখলে।
১৬৬০ সালে মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত রমনা পার্ককে ঢাকার প্রাণ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়ে থাকে। শহরের প্রাণকেন্দ্র অবস্থিত এ পার্ক রাজধানীবাসীর কাছে বিনোদন ও শরীরচর্চার জন্য উত্তম স্থান। কিন্তু এই উদ্যানে তেমন নজরদারি না থাকায় সন্ধ্যার পর নেমে আসে ভীতিকর পরিবেশ। পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ বা ভিক্টোরিয়া পার্ক, বলধা গার্ডেন আর নতুন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, বঙ্গভবন পার্ক, ওসমানী উদ্যান রয়েছে। দক্ষিণে জাতীয় সংসদ ভবন, পশ্চিমে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘গণভবন’ ও উত্তরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র, এর মধ্যখানে অবস্থিত চন্দ্রিমা উদ্যান। সকাল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতেও থাকে চন্দ্রিমা উদ্যানের লেকের পাড়ে বিনোদনপ্রেমী মানুষের ভিড়। অনেকেই বিভিন্ন দিবসে প্রিয়জনকে নিয়ে বেড়াতে আসেন এখানে।
রাজউক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঢাকা শহরের মানুষের তুলনায় বিনোদনকেন্দ্র কম। পরিকল্পনামাফিক উন্মুক্ত স্থান না পাওয়ায় আমরা নতুন করে উদ্যান বা পার্ক নির্মাণ করতে পারি না। তবে রাজউকের যেসব নতুন শহর করা হচ্ছে সেখানে আধুনিক নগর পরিকল্পনার বিষয়টি মাথায় নিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনোদনের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঢাকায় পর্যাপ্ত বিনোদনকেন্দ্র নেই, যা আছে তাও রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। রাজধানীজুড়ে মানুষের তুলনায় খেলার মাঠ বা পার্ক একেবারেই অপ্রতুল। যা আছে, তা-ও দিন দিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। নতুন ঢাকার তুলনায় পুরান ঢাকায় একেবারেরই কম। হাতে গোনা কয়েকটি পার্ক ছাড়া সেখানে উন্মুুক্ত স্থান বা খেলার মাঠ প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। একসময় ধানমন্ডি লেক ছিল শুধু ওই এলাকার মানুষের জন্য। কিন্তু এটি এখন পুরো শহরের চাহিদা পূরণ করে। আমরা আগে দেখেছি খেলার মাঠে গরুর হাট বসত। এখন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। অনেক মাঠে নিয়মিত মেলাও বসে। এর ফলে আমাদের এই শহরে সবচেয়ে বেশি বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। তারা বাসাবাড়িতে অনেকটাই আবদ্ধ থাকে। মহিলাদের জন্য পৃথক কোনো পার্ক নেই। সার্বিকভাবে আমাদের যে কয়টি পার্ক বা বিনোদনকেন্দ্র রয়েছে তা দেখভালের অভাবে দিন দিন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
ফ্ল্যাটজীবনে বন্দী ঢাকার শিশুরা
সুউচ্চ ভবনগুলোর চার দেয়ালে বন্দি রাজধানীর শিশুরা। স্কুল, পড়াশোনা, কম্পিউটার, ভিডিও গেমস আর টেলিভিশনের বৃত্তে বন্দী তাদের শৈশব। খেলার মাঠ, সাঁতার, ক্রিকেট, ফুটবল, মাঠে ছোটাছুটিÑ এগুলো তাদের জন্য টেলিভিশনে দেখা এক বিষয়ের নাম।
রাজধানীতে শিশুদের বিকাশে যে পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা থাকা উচিত, তার ছিটেফোঁটাও নেই। নেই এলাকাভিত্তিক তেমন কোনো খেলার মাঠও। গাছপালার অভাবও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ঘরের কোনায় থাকতে থাকতে তাদের প্রয়োজনীয় মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অত্যন্ত ঘনবসতির এই নগরীতে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা নেই। কয়েকটি নির্দিষ্ট পার্ক আর বিনোদনকেন্দ্র ছাড়া নির্মল পরিবেশ পাওয়ার মতো তেমন কোনো স্থান নেই বললেই চলে। ফলে বিশুদ্ধ নির্মল পরিবেশের অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে শিশু-কিশোররা।
ফ্ল্যাটে বন্দী শিশুরা পড়াশোনার চাপে বিপর্যস্ত। মা-বাবার ইচ্ছা পূরণের জন্য কেউ কেউ গান, নাচ, ছবি আঁকা ইত্যাদি শিখতে যায়। কখনো তা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু বয়স অনুযায়ী বিনোদন, খেলাধুলা এবং সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত থাকার সুযোগ অনেকটাই সীমিত। বন্দী শিশুর শৈশব : শিশুরা বাসা থেকে স্কুলে যায়। বাসায় চার দেয়াল, স্কুলেও তাই। ফলে চার দেয়ালেই বন্দী থাকে শিশুর শৈশব-কৈশোর। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর স্কুলে খেলার মাঠ রয়েছে, আর যেসব শিশুর স্কুলে খেলার মাঠ নেই, তাদের মধ্যে স্কুলে খেলার মাঠ না থাকা শিশুরা তুলনামূলকভাবে নির্জীব এবং তারা বিষণœতায় ভোগে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মাঠ তো শুধু খেলার স্থান নয়, এর সংস্পর্শে থেকে শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে। তারা দেশের পরিবেশকে বুঝতে শেখে, উপলব্ধি করতে শেখে। যারা সেই সুযোগ পায় না, তারা অনেকটা অ্যাকোয়ারিমের মাছের মতো বেড়ে ওঠে। সুস্থ-স্বাভাবিক বৃদ্ধি তাদের হয় না।

 

 


আরো সংবাদ