২৯ জানুয়ারি ২০২০

রাজধানীতে দূষিত বায়ুর সাথে বসবাস

-

ঢাকায় বসবাসকারী বেশির ভাগ মানুষেরই চোখ জ্বলছে, শ্বাস নিতে কেমন যেন কষ্ট হচ্ছে। এর কারণ নভেম্বর মাসের আট দিনের বেশির ভাগ সময় ঢাকার বাতাস ছিল সবচেয়ে দূষিত। এই তালিকায় আরো আছে কলকাতা, দিল্লি, করাচি, বেইজিং, উলানবাটোর। এসব শহরের দূষণের মাত্রা সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে যায় প্রায়ই। দুনিয়াব্যাপী বাতাসে দূষণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়াল। কোনো নির্দিষ্ট স্থানের বাতাসের মানের সূচক ২০০-এর বেশি হলে তাকে খুবই অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। ঢাকায় নভেম্বর মাসের এক দিনে বাতাসের গড় মান ছিল ২২০; কিন্তু কারওয়ান বাজারে তা ছিল ভয়াবহ মাত্রায় বেশি, ২৯৮! আন্তর্জাতিক হিসাবে বাতাসে দূষণের মানের এই সূচক ২০০ ছাড়ালে ঘরের জানালা বন্ধ রাখা, সাইকেল না চালানোর পরামর্শ দেয়া হয়। এ ছাড়া মাস্ক ছাড়া বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়। খুব জরুরি না হলে শিশু ও বৃদ্ধদের বাইরে যেতেই নিষেধ করা হয়।
দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯ এর তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে শুধু দূষিত বাতাসের কারণে অন্তত এক লাখ ২৩ হাজার মানুষ মারা গেছে! অন্য এক তথ্য বলছে, বাতাসের দূষণে মৃত্যুর দিক দিয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীতে পঞ্চম। ঢাকা শহরে বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেয়া মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি!
ঢাকার বাতাস দূষণের জন্য মূলত শহরের আশপাশের ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণকাজের ধুলা দায়ী। কিন্তু এসব নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই বলাই ভালো। বিপর্যয় মোকাবেলায় কর্তৃপক্ষের যে উদ্যোগ আয়োজন থাকা দরকার, তা তেমনভাবে নেই। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশও তামিল হয় না এ দেশে। প্রথম দরকার শহরে এবং সারা দেশে প্রচুর পরিমাণ বৃক্ষের সমারোহ এবং বিস্তৃত জলাশয়। তা হলে এসব দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে মোট বন এলাকা দেশের ভূ-ভাগের ৬-৭ শতাংশ মাত্র, যা হওয়া উচিত অন্তত ২৫ শতাংশ। আর নদীমাতৃক বাংলাদেশে এখন পানির বড়ই অভাব। ঢাকা শহরে সামান্য কিছু লেক আছে বটে; কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি নগণ্য। তা ছাড়া এসব লেকের পানিও এমন দূষিত যে সে দিকে তাকাতেও ভয় হয়।
ধানমন্ডি, গুলশান, এমনকি এত ঢোল পেটানো হাতিরঝিলের পানিও ভীষণ দুর্গন্ধ, চরম দূষিত। দূষিত ঢাকা শহরের চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদের পানি। এত দূষিত যেকোনো জলজ প্রাণীও এসব নদনদীতে বাঁচতে পারে না। আলকাতরার মতো কালো রঙ সেই পানির। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ভরাট করা হচ্ছে অন্যান্য জলাশয়, নিচু ভূমি, খাল, নদী। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স তথ্য দিচ্ছে, ২০১০ সালের ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) নির্ধারিত জলাভূমির ২২ শতাংশই ২০১৯ সালের মধ্যে ভরাট করা হয়েছে। তথ্য আরো বলছে, ঢাকার বাতাসে ইটভাটা থেকে ৫৮ শতাংশ, রাস্তা ও মাটির ধুলা এবং মোটরগাড়ির কালো ধোঁয়ায় প্রায় ২৬ শতাংশ দূষণ ঘটে। বাকিটা অন্যান্য বর্জ্য সূত্রে দূষিত হয়।
অন্য দিকে সবুজ গাছের বেষ্টনী কমতে কমতে প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে। গত কয়েক বছরে বনানী থেকে উত্তরা পর্যন্ত এলাকায় লাখ লাখ বৃক্ষ সাবাড় করা হয়েছে উন্নয়নের নামে। অন্যত্রও একই চিত্র। কিন্তু এই নির্বিচার বৃক্ষ নিধনযজ্ঞের সাথে উন্নয়নের সম্পর্ক কেবল লুটপাটের। সব কিছুই হচ্ছে সরকারি উদ্যোগে। কিন্তু বিকল্প কিছুই গড়ে তোলা হয়নি। দূষণের মাত্রা কত ভয়াবহ আকার নিয়েছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। ঢাকায় এখন সুস্থ সবল কোনো গাছ খুঁজে পাওয়া কঠিন। ঢাকা শহরে এবং দেশের জাতীয় সড়কগুলোর পাশের গাছগুলোর মরণদশার শুরু অনেক আগে থেকেই। পাতার ওপর ধুলা জমে প্রথমে তার খাবার তৈরিতে বাধার সৃষ্টি করে। এরপর পানির অভাবে তার খাবারে টান পড়ে আরো বেশি বেশি। এরপর নানা টক্সিক উপাদান গাছের জীবন বিপন্ন করে তোলে।
গাছ কমে গেলে অক্সিজেন তৈরিও কমে যায়। ফলে জীবনদায়িনী অক্সিজেনের অভাবে বিপন্ন হয় অন্য সব প্রাণীও। শিল্পবিপ্লবের পর পৃথিবী এত দূষিত হয়ে উঠেছে যে, তার অস্তিত্বই এখন বিপন্ন। ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে এই গ্রহের তাপমাত্রা। মানুষ তাই শঙ্কিত। জীবের জন্য পানি অপরিহার্য। পানির নিয়মিত সরবরাহ বিঘিœত হলে প্রাণ বিপন্ন হবেই। নগর পরিকল্পনায় তাই জলাশয় ও সবুজ গাছের বেষ্টনী অতি আবশ্যকীয় শর্ত। গাছের নিয়মিত পরিচর্যাও। বৃষ্টির পানি ছাড়াও তাই জলসিঞ্চন নগরকর্তাদের নিয়মিত দায়িত্ব। উপযুক্ত বৃক্ষ নির্বাচন, পরিকল্পিত বৃক্ষায়ণ এবং পরিচর্যা ছাড়া কোনো নগর টিকে থাকতে পারে না। আমাদের দেশে সুপ্রাচীন কাল থেকে শাসকদের অন্যতম কাজ ছিল জলাশয় সংরক্ষণ ও বৃক্ষ পরিচর্যা। মোগল সম্রাটরা হিন্দুস্তানে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায় দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল। বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তুলতে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল প্রাউড লককে। তিনি ছিলেন লন্ডনের কিউ গার্ডেন এবং কলকাতা বোটানিক গার্ডেনের কিউরেটর। এখনো রমনা এলাকায় মিন্টো ও হেয়ার রোডে প্রাউড লকের বৃক্ষসজ্জা কিছুটা টিকে আছে।
নিয়মিত জলসিঞ্চনের জন্য মাটির তল দিয়ে পাইপ বসিয়ে ফোয়ারায় গাছের পাতার ওপর পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়া সারা দুনিয়ায় এক সাধারণ দৃশ্য। এর ফলে একই সাথে অনেক কাজ হয়। ধুলো ধুয়ে যায়, গাছপালা দরকারি পানি পায়, শহরের তাপমাত্রাও কমে। কিন্তু আমাদের নগরপিতারা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন বলেই মনে হয়। নগরবৃক্ষের তালিকা তৈরি করা উচিত বিশেষজ্ঞ দিয়ে। তারাই নকশা করে দেবেন, কোথায় কোন কোন গাছ কেমনভাবে লাগাতে ও পরিচর্যা করতে হবে।

বায়ুদূষণের কারণে মেট্রোরেল-এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জরিমানা

রাজধানীর বায়ুদূষণ করায় মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষকে মোট তিন লাখ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদফতর। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম মেনে ধুলা নিয়ন্ত্রণ না করায় তাদের ওই জরিমানা করা হয়েছে। গত বুধবার দুপুর ১২টায় পরিবেশ অধিদফতরের দু’টি ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর খামারবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে কয়েকটি স্থানে স্তূপ করে মাটি ফেলে রাখতে দেখে। তখন সেখানে কর্তব্যরত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ডেকে আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সারা দিন এভাবে তারা মাটি উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখে। রাতে তা ট্রাকে করে সরানো হয়। প্রায় প্রতিদিনই তারা এভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
নিয়ম অনুযায়ী, এসব অবকাঠামো নির্মাণের স্থানে নির্মাণসামগ্রী ও বালু-সিমেন্ট এবং মাটি ঢেকে রাখতে হয়।
এর আগে গত বছর রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডকে তিন দফা চিঠি দেয় পরিবেশ অধিদফতর। মেট্রোরেল নির্মাণের সময় নিয়ম অনুযায়ী ধুলো নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করে। পরিবেশ অধিদফতরে ওই সংস্থাটির প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সভায় তাদের ধুলো নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলে। এ বছরও এক দফা চিঠি ও সর্বশেষ গত সোমবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায়ও রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে এসব সংস্থাকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। বলা হয়, তাদের সড়কের পাশের মাটি ও নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখতে হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) বেগম রুবিনা ফেরদৌসী বলেন, ‘মেট্রোরেল ও এলিভেটেডে এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষকে আমরা কয়েক দফা ধুলা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠি দিয়েছি। কিন্তু আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে গিয়ে মানমাত্রার চেয়ে বেশি ধুলো পায়; যে কারণে আমরা ওই জরিমানা করেছি।’ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষকে জরিমানা করার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বনানী এলাকা নৌবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ের সামনের স্থানটি পরিদর্শন করে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কোনো একটি এলাকা বাতাসে এসপিএম বা ধূলিকণার পরিমাণ (এসপিএম) প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে সর্বোচ্চ ২০০ মিলিগ্রাম থাকার কথা। মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস প্রকল্প এলাকার আগারগাঁও এলাকায় প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে এসপিএম পাওয়া যায় ৮২০ মিলিগ্রাম, মিরপুর দশ নম্বর গোলচত্বরে ৭৬৪ ও বনানী মোড়ে ৬০৫ মিলিগ্রাম। এই মাত্রায় ধূলিকণা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক।

 


আরো সংবাদ