১৯ আগস্ট ২০১৯

মিয়ানমারে মুখোমুখি সু চি ও সামরিক বাহিনী

সামরিক বাহিনীকে দমাতে পারবেন সু চি? - ছবি : সংগৃহীত

মিয়ানমারের বেসামরিক সরকারকে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সাথে সঙ্ঘাতময় অবস্থানে ঠেলে দেয়ার আশঙ্কা নিয়েই পার্লামেন্টের একটি কমিটি চলতি সপ্তাহে দেশটির সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছে।
প্রস্তাবে সামরিক বাহিনী প্রণীত সংবিধানে ৩,৭০০-এর বেশি পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিশালী রাজনৈতিক ভূমিকা হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) ২০১৫ সালে বিপুল নির্বাচনী বিজয় লাভ করে। তারা ওই সময় উচ্চকক্ষের ১৬৮টি আসনের মধ্যে ১৩৫টি, নিম্নকক্ষের ৩২৩টির মধ্যে ২৫৫টিতে জয়ী হয়।
এ ধরনের বিপুল জয়ের পরও সামরিক বাহিনী প্রতিটি কক্ষের ২৫ ভাগ আসন নিজেদের করে নেয় সংবিধানে তাদের জন্য থাকা বরাদ্দকে কাজে লাগিয়ে।

এনএলডি নির্বাচনের সময় সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করেছিল। ২০২০ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি হবে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়।
এনএলডি অনেক দিন ধরেই সংবিধানের ৪৩৬ ও ৫৯ (চ) ধারা পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলে আসছিল। ৪৩৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করতে হলে ৭৫ ভাগ এমপির সমর্থন প্রয়োজন। সামরিক বাহিনীর ২৫ ভাগ সদস্য থাকায় ৭৫ ভাগ এমপির সমর্থন পাওয়া কঠিন বিষয়। ওই ধারায় সামরিক বাহিনীকে কার্যত ভেটো শক্তি দেয়া হয়েছে।
আর ৫৯(চ) ধারায় বলা হয়েছে, দেশের প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই মিয়ানমারে জন্মগ্রহণ করতে হবে এবং তাদের বিদেশী স্বামী/স্ত্রী বা সন্তান থাকতে পারবে না।
দৃশ্যত আং সান সু চিরকে প্রেসিডেন্ট হতে না দেয়ার লক্ষ্যেই সংবিধানে এই ধারা যুক্ত করা হয়েছে। মিয়ানমারের এই নেত্রীর দুই ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক, আরেকজন আমেরিকার। সু চির ব্রিটিশ স্বামী শিক্ষাবিদ মাইকেল আরিস ১৯৯৯ সালে পরলোকগমন করেছেন।
এনএলডি এর ফলে সু চির জন্য স্টেট কাউন্সিল পদ নির্ধারণ করে। এতে করে দেশের রাষ্ট্রপতির পদটি আলংকারিকে পরিণত হয়েছে।

স্টেট কাউন্সিলর পদটি সৃষ্টি করা হয়েছিল সু চির আইনজীবী কো নির পরামশে। কো নি চেয়েছিলেন দ্রুত সংবিধান সংশোধন করতে।
কো নি ২০১৭ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন। ফলে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া থমকে গিয়েছিল।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২০ সালের নির্বাচনে এনএলডিকে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির বিরুদ্ধে নামতে হবে।
নভেম্বরে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এনএলডির ইয়াঙ্গুন ও গুরুত্বপূর্ণ নগরীগুলোতে সমর্থন অব্যাহত রাখলেও জাতিগত সংখ্যালঘু এলাকাগুলোতে তাদের সমর্থন হ্রাস পেয়েছে। সরকারি উদ্যোগ তাদের জন্য কল্যাণকর হয়নি বলেই তারা মনে করছে।

এমন প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংশোধন প্রয়াস কতটা সফল হবে তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
পার্লামেন্টে যদি সংশোধনী প্রস্তাবগুলো পাসও হয়, তবুও এ নিয়ে গণভোট হতে হবে। অর্ধেক ভোটার অনুমোদন করলেই কেবল সংশোধনী প্রস্তাবগুলো কার্যকর করা সম্ভব হবে। কিন্তু মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী শক্তিশালী অবস্থানে থাকার প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষভাবে গণভোট আয়োজন কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মিয়ানমারে ২০০৮ সালে জেনারেলরা যে সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, তাদের তাদের স্বার্থ ব্যাপকভাবে সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল। এখন তাদের স্বার্থ খর্ব করা হলে তারা স্বাভাবিকভাবেই তাতে বাধা দেবে। এতে করে সামরিক বাহিনীর সাথে এনএলডির মুখোমুখি সঙ্ঘাত সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কার সৃষ্টি হবে।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি জাপানি পত্রিকা আসাহি শিমবুনের সাথে দেয়া এক সাক্ষাতকারে মিয়ানমারের সামরিক প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন আঙ হ্লাইঙ বলেছিলেন যে নীতিগতভাবে আমরা সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংবিধানের এমন কোনো পরিবর্তন হওয়া উচিত নয়, যা সংবিধানের মূল বিষয়টিই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তিনি এর মাধ্যমে রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে সামরিক বাহিনীর ভোগ করে আসা ক্ষমতার কথাই বলেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, সামরিক বাহিনীর স্বার্থ খর্ব করা কোনো কিছু তারা মেনে নেবেন না।
অর্থাৎ সামরিক বাহিনী তাদের হাতে থাকা ক্ষমতা হ্রাস করে, এমন কোনো নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক সরকার মেনে নেবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এশিয়া টাইমস/সাউথ এশিয়ান মনিটর


আরো সংবাদ