১৯ জুন ২০১৯

পলিতে ভরাট ও দখলে মুন্সীগঞ্জের শাখা নদীগুলো মৃতপ্রায়

মুন্সীগঞ্জের কালিদাস নদীর বর্তমান অবস্থা। ছবিটি ধলেশ্বরী নদীর প্রবেশদ্বার ফরাজিবাড়ি ঘাট থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত -

পদ্মা মেঘনা ধলেশ্বরী ও ইছামতি নদীবিধৌত মুন্সীগঞ্জ জেলার অভ্যন্তরীণ একাধিক শাখা নদী পলিমাটি জমে ভরাট হয়ে গেছে। প্রকট আকার ধারণ করেছে নাব্যতা সঙ্কট। ফলে একাধিক শাখা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি ডিঙ্গি নৌকাও চলাচল করতে গিয়ে নদীর তলদেশে আটকে যাচ্ছে।
জেলার অভ্যন্তরীণ শাখা নদীগুলো বছরের পর বছর ধরে নৌচলাচলের মাধ্যমে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বছরের পর বছর ধরে পলিমাটি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। আবার যেসব শাখা নদীতে সামান্য পানি রয়েছে সেখানে মৎস্য শিকারের জন্য ঝোপ ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে জেলে সম্প্রদায়। নৌযান চলাচল না করতে পারায় ব্যবসায়ী ও কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ বিকল্প পথ ব্যবহারে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
এলাকাবাসী ও কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার কাটাখালী বাজার থেকে কালীদাস সাগর নামের শাখা নদী দিয়ে রজতরেখা নদী হয়ে একতলা লঞ্চ চলাচল করত মাকহাটি-দীঘিরপাড় নৌরুটে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার চেয়ে সে সময় নৌপথেই চলাচল করত বেশির ভাগ মানুষ। একইভাবে কালীদাস সাগর নামের নদী হয়ে কাটাখালী বাজার ও মুন্সীরহাট হয়ে পৃথক নৌরুটে রজতরেখা নদী দিয়ে চিতলিয়া বাজার হয়ে পদ্মা ও মেঘনা নদীর মোহনা দিয়ে মূল নদীতে চলাচল করত বিভিন্ন নৌযান। পরে পলিমাটি জমে নাব্যতা সঙ্কট দেখা দিলে গভীরতা কমে যায়। ফলে এ শাখা নদীগুলো দিয়ে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। কালীদাস সাগর ও রজতরেখা নদীর মতো নাব্যতা সঙ্কট দেখা দেয়ায় জেলার আরো বেশ কয়েকটি শাখা নদীতে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
অন্য দিকে দীঘিরপাড়-মাকহাটি-আলদীবাজার-টঙ্গিবাড়ী-ঢাকা রুটেও ব্রহ্মপুত্র নদ ও কাজল রেখা নদী হয়ে ধলেশ্বরী-ইছামতি নদীর মোহনা দিয়ে মূল নদীতে বের হয়ে বুড়িগঙ্গা হয়ে ঢাকার সদরঘাটে লঞ্চ চলাচল করত। এ নদীগুলোও পলিমাটিতে ভরাট হয়ে গভীরতা কমে যাওয়ায় নব্বই দশকের আগেই লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর থেকে বর্ষা মওসুমে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও ডিঙ্গি নৌকা চলাচল করলেও শীত মওসুমে এসব নৌযানও চলাচল করতে পারে না।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আশির দশকেও মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার কাটাখালী বাজার থেকে কালীদাস সাগর নামের শাখা নদী দিয়ে রজতরেখা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে একতলা লঞ্চ চলাচল করত মাকহাটি-দীঘিরপাড় নৌরুটে। পলিমাটি জমে নাব্যতা সঙ্কটে গভীরতা কমে যাওয়ায় নব্বই দশকের আগেই এ নদী দিয়ে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। কালীদাস সাগর, রজতরেখা নদীর চিহ্ন থাকলেও মাকহাটি থেকে দীঘিরপাড় পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদটির কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে একই কারণে আলদীবাজার-রহিমগঞ্জ বাজার হয়ে টঙ্গিবাড়ী উপজেলা সদরে প্রবাহিত কাজল রেখা নদী দিয়েও বন্ধ হয়ে গেছে লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার সদরঘাট থেকে ফতুল্লা হয়ে মুন্সীগঞ্জ, তালতলা, সিরাজদীখান, আব্দুল্লাপুর, বেতকা, বালিগাঁও ও ডহুরী নৌরুটে লঞ্চ চলাচল করত। কালের বিবর্তনে পলিমাটি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় শাখা নদীগুলো দিয়ে এখন আর কোনো লঞ্চ চলাচল করে না। তা এখন শুধুই স্মৃতি বা অতীত ইতিহাস হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সিরাজদীখান উপজেলার বালুরচর লঞ্চঘাট ছিল জমজমাট। এখন লঞ্চঘাট তো দূরের কথা এর কোনো চিহ্নও নেই। তালতলা লঞ্চঘাটেরও কোনো অস্তিস্ত খুঁজে পাওয়া যায় না।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, জেলার শ্রীনগর উপজেলাসহ ছয়টি উপজেলার অভ্যন্তরীণ আরো বেশ কয়েকটি শাখা নদীতেও একই সমস্যার কারণে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নদী খনন করতে একাধিকবার নৌ-মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। তারা খনন করার আশ্বাস দিলেও এখনো তা আশ্বাস হয়েই রয়েছে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অসাধু ব্যক্তি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে খনন করার অনুমতি নিয়ে ভরাট ব্যবসায় লিপ্ত হলেও জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে তাদের কোনো সমন্বয় নেই। এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে শাখা নদীগুলো খনন করার অনুমতি দেয়ার জন্য একাধিকবার তাগিদ দেয়া হয়েছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা।
মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা জানিয়েছেন, ধলেশ্বরীর শাখা নদীর একাংশ কাটাখালী এলাকা ঘেঁষা খাল ও কালিদাস সাগর নদী বাঁচাতে ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ পুনঃখননের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার পর পুরোদমে কাজ শুরু হবে। তিনি আরো বলেন, জেলার অন্য অভ্যন্তরীণ শাখা নদীগুলো পুনঃখননের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। শিগগিরই খননের কাজের উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।


আরো সংবাদ