১৯ জুলাই ২০১৯

সুনামগঞ্জের ৭৬ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিক্যাল অফিসার নেই

-

সুনামগঞ্জের ৭৬টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মেডিক্যাল অফিসার না থাকায় জেলা-উপজেলা সদর থেকে বিছিন্ন দ্বীপ সদৃশ হাওরবাসী স্বাস্থ্যসেবা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এই সেøাগানটি আজো বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে স্বপ্নের সুমধুর বুলি হয়ে আছে। দুইতলা ভবন বারান্দার নিচে গ্রামের যুবকেরা তাস, লুডু খেলে অবসর সময় পাড় করে। উপরে দুই ইউনিটে ডাক্তার থাকার ব্যবস্থা, নিচের তলায় দুই পাশে রয়েছে কয়েকটি কক্ষ। তবুও সেখানে ডাক্তার থাকেন না। পাকনা হাওর অধ্যুষিত জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর বিলপাড় হাটিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের দৃশ্য এমনটিই। এই ইউনিয়নে প্রায় ৩৩ হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার একমাত্র স্বাস্থ্যকেন্দ্র এটি। প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা পাওয়া তো দূরের কথা সময় মতো কোনো ভিজিটরই পাওয়া যায় না।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাওরের জেলার বেশির ভাগ উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এমন বেহাল দশা। সুনামগঞ্জে ২২টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ৫৪টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র রয়েছে। ৭৬টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এর মধ্যে চারটিতে মেডিক্যাল অফিসার (এমবিবিএস ডাক্তার) পদায়ন থাকলেও তিনজন ডাক্তার সংশ্লিষ্ট উপজেলা সদর হাসপাতালে কাজ করছেন, অন্য একজন প্রায় আড়াই বছর ধরে বিনা অনুমতিতে দেশের বাইরে আছেন। অর্থাৎ জেলার কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই ডাক্তার নেই।
ফেনারবাঁক ইউনিয়নের বাসিন্দা কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক বছর ধইরা লক্ষ্মীপুর গ্রামে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রডা অইছে, কিন্তু আইজো কোনো ডাক্তার আইছে না। মাঝে মাঝে এক মহিলা আইয়া কিছু সময় থাইক্যা চইলা যায়। এইভাবে এইডা চলতাছে। আমরা গরিব মানুষ, এইখানে চিকিৎসাডা পাইলে কতযে ভালা অইতো কইবার মতো না। দেহেন না লেইখ্যা সরকারে যদি একটা ডাক্তার দেয় আমরা শান্তি পাইমু।’ রুজিনা আক্তার বলেন, ‘ভাই কত কষ্টে আছি, মহিলারার কত রোগ-শোক আছে কয়ন যায় না। মাঝে মাঝে এক আপা আয় কিছু বড়ি-বাড়া নেই হেইডাই কাম অয়। আপা যদি সব সময় থাকতো আমরার জানডা শান্তি পাইতো।’ এভাবেই মনের আকুতি বলছিলেন সেবা নিতে আসা কৃষক নজরুল ইসলাম ও রোজিনা বেগম। উপজেলা সদর ইউনিয়নের কালাগুজা গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ‘সোনার বাংলা দাতব্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রে’ও একজন মেডিক্যাল অফিসার থাকার কথা। কিন্তু এখানেও থাকেন না কোনো ডাক্তার। সেবা নিতে আসা রহিম আলী বলেন, ‘মধ্যে মধ্যে একজন চিকিৎসা সহকারী জামালগঞ্জ থেকে এসে কিছু সময় সেবা দিয়ে যান। আমরার সেলিমগঞ্জ বাজার কাছে থাকায় বেশির ভাগ রোগী ফার্মেসি থেকেই ওষুধ কিনে নিয়ে যায়। সব সময় যদি একজন ডাক্তার থাকত গরিব মানুষের খুবই উপকার হতো।’
দোয়ারাবাজার উপজেলার স্থানীয় একজন গণমাধ্যম কর্মী জানান, লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের এবং সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের একাংশের বাসিন্দারা এখানে জরুরি চিকিৎসা নিতে আসেন। লক্ষ্মীপুর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে কয়েক দিন আগে শিশুর জ্বর ও ডায়রিয়ার ওষুধ দেয়ার জন্য স্বাস্থ কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন একজন অভিভাবক, ভিজিটর আপা বলে দিয়েছেন প্যারাসিটামল ছাড়া আর কিছুই নেই, তিনটা প্যারাসিটামল হাতে তুলে দিয়ে, জ্বর থাকলে তিন বার তিনটা খাওয়ার জন্য বলে দেন ও বাজার থেকে স্যালাইন এনে খাওয়ার জন্য বলেন।
লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপসহকারী মেডিক্যাল অফিসার মো: মনিরুল ইসলাম বললেন, ঝাড়– দেয়া থেকে শুরু করে সব কাজই আমাকে একাই করতে হয়। এখানে মেডিক্যাল অফিসার, ফার্মাসিস্ট ও অফিস সহায়কের পদ থাকলেও সবই শূন্য। ২০১৬’এর শেষের দিকে এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগদান করি, দুই মাস ডা: রাশেদুল হাসানকে পেয়েছিলাম। তিনি চলে যাওয়ার পর আর কেউ এখানে আসেননি। গড়ে প্রতিদিন ৪০-৪৫ জন রোগী আসে। এই ইউনিয়নের ছাড়াও আশপাশের লক্ষ্মীপুর, ভোগলা, সুরমা ও রঙ্গারচরের একাংশের মানুষ এখানে চিকিৎসার জন্য আসে। ওষুধ যা বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা দিয়ে তিন মাস চলে না, শেষের দিকে রোগীকে দেয়া সম্ভব হয় না।
এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা: আশুতোষ দাসকে ফোন দিলে তিনি বলেন, হাওর এলাকায় অনেক ডাক্তার এসে থাকতে চান না। সুনামগঞ্জে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ২২টি, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র ৫৪টি। বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে চাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য, এ ব্যাপারে কাজও চলছে। আশা করি প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই সরকারের আমলেই সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মেডিক্যাল অফিসার নিয়োগ দেয়া হবে।

 


আরো সংবাদ