২৫ আগস্ট ২০১৯

মিঠাপুকুরে সুদের বেড়াজালে বিভিন্ন গ্রামের অর্ধশতাধিক মানুষ

-

রংপুরের মিঠাপুকুর বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়নের বুজরুক সন্তোষপুর (মরাহাটি) হাটে অর্ধশতাধিক সুদখোর মাহজনের হাতে আটকা পড়েছেন বিভিন্ন গ্রামের সাধারণ মানুষ। এ ইউনিয়নে এমন কোনো সাধারণ পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা সুদের জালে আটকা পড়েনি। এদের মধ্যে একজন আত্মহত্যা করেছেন এবং বেশ কয়েকজন এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।
জানা গেছে, অর্ধশতাধিক সুদখোর মহাজনের বাড়ি উপজেলার ময়েনপুর ইউনিয়নের বাতাসন, গেনারপাড়া, শুকুরেরেহাট ও ফুলচৌকি গ্রামে। তারা মানুষের দৈন্যদশার সুযোগে চেক বন্ধকসহ সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে টাকা দাদন দেন। তাদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে এক হাজার টাকা শতকরা ১০ টাকা হারে মাসিক ১০০ টাকা, ছয় মাসে ৬০০ টাকা, বার্ষিক এক হাজার ২০০ টাকা সুদ হিসেবে কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয়। প্রতি মাসের লভ্যাংশের টাকা পরিশোধ করলে কোনো আপত্তি থাকে না। বছরে দু’বার ছয় মাস অন্তর অর্থাৎ জুন ও ডিসেম্বর ক্লোজিংয়ে মহাজনদের হাতে সুদাসলে টাকা জমা দিতে হয়। কোনো এক কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে সেটি পরের কিস্তিতে এলে পরিণত হয়। পরের ক্লোজিংয়ে তার ওপর সুদ হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, সুদখোরদের খাটানো টাকার শতকরা লভ্যাংশ দাঁড়ায় ১৬০ টাকা।
এ দিকে যারা এসব সুদখোরের কাছ থেকে দাদন নেন তারা কোনোভাবেই মুখ খুলতে রাজি নন। কারণ হিসেবে জানা যায়, এর আগে এ নিয়ে এ এলাকায় সংঘর্ষ হয়েছে। বিষয়গুলো থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়ে ছিল। শেষ পর্যন্ত সুদখোর মহাজনদের পেশিশক্তির কাছে পরাস্ত হন ঋণগ্রহীতারা। দু-একজন মুখ খুললেও নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেন। হাছিয়া গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি সুদখোরের বিরুদ্ধে মুখ খুলে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছেন। বাতাসন গ্রামের সুদখোর হাসমত আলীর কাছ থেকে দাদন নিয়ে শোধ করতে না পেরে পাঁচ বছর আগে আত্মহত্যা করেছেন গেনারপাড়া গ্রামের আউয়াল মিয়া। টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। একপর্যায়ে সুদখোরের লোকেরা হুমকি দিয়ে যায়, টাকা না দিলে তারা তার বোনকে তুলে নিয়ে যাবে। দেনার দায়ে বোনের সম্ভ্রমহানি নিজের চোখে দেখতে পারবেন না বলে আউয়াল মিয়া আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনার পর প্রশাসনের লোকজন, সমাজপতি, জনপ্রতিনিধি ও এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেকেই তার বাড়িতে গিয়েছিলেন।
আরেকজন চক দুর্গাপুর গ্রামের আবু বক্কর দাদনে নেয়া টাকা শোধ করতে না পারায় সুদখোরকে তার বেতনের চেক বইটির সব পাতা স্বাক্ষর করে দিতে বাধ্য হন। চেক বই শেষ হলে আবার তা তুলে স্বাক্ষর করে সুদখোরকে দিতে হবে মর্মে সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরও দেন তিনি। এভাবে চেক বইটি হস্তান্তর করে তিনি দিনের পর দিন সুদ দিয়ে আসছেন। ফলে তাকে চাকরি করে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।
বুজরুক সন্তোষপুর কারামতিয়া ফাজিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যক্ষ আছের আলী নিয়েছিলেন ৩০ হাজার টাকা। সে টাকা বেড়ে হয় প্রায় ৮০ হাজার টাকা। অবশেষে তার চেক বইটি তিনি জমা দিয়েছেন সুদখোর মহাজনের হাতে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার প্রতি মাসের বেতনের টাকা দিয়েও সুদখোরের লভ্যাংশের টাকা পরিশোধ হয় না। ক্রমেই আসল বাড়ছে। এ ছাড়াও ঋণের দায়ে আরো পালিয়ে গেছেন হাছিয়া গ্রামের সাইদুল, আনোয়ার, করিমসহ অনেকেই। এলাকা ঘুরে জানা গেছে, সুদখোরদের কাছ থেকে যারা টাকা দাদন নেন তারা ১০০ থেকে ১৫০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তিবন্ধ থাকেন।
অন্য দিকে সুদখোরেরা বলেন, মানুষের প্রয়োজনের সময় টাকা দাদন দিয়ে আমরা উপকার করছি। স্থানীয় ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প থাকতে সুদখোরদের কাছ থেকে দাদন নেয়ার কারণ জানতে চাইলে এলাকাবাসী জানান, ব্যাংকের টাকা নিতে অনেক ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। বারবার ধরনা দিতে হয়। এনজিওর ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা সংগ্রহ করা অনেক কষ্টসাধ্য ও দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

 


আরো সংবাদ