১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
শিশুরাই মাঝিমাল্লা শিশুরাই যাত্রী

উত্তাল নদী পার হয়ে স্কুলে যায় যমুনা চরাঞ্চলের শিশুরা

যমুনা নদীর ক্যানেলে নৌকা চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে চৌহালীর চরবোয়ালকান্দি চরাঞ্চলের শিশুরা : নয়া দিগন্ত -

খুদে শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা চালিয়ে যমুনা নদীর বিশাল ক্যানেল অতিক্রম করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করে। একেকটি নৌকায় ২০-২২জন করে শিক্ষার্থীকে উঠতে হয়। নৌকার যাত্রীও শিশুরা আবার মাঝিমাল্লাও শিশুরা। সবার গন্তব্য শিক্ষালয়। সিরাজগঞ্জের দুর্গম চৌহালী উপজেলার সদিয়া চাঁদপুর এলাকার চিত্র এটা। যমুনার শাখা নদীর পাশেই বোয়ালকান্দি দাখিল মাদরাসা এবং চরবোয়ালকান্দি ও রেহাইমৌশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যমুনার ভাঙনে বিপর্যস্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে ৪০০ শিক্ষার্থীকে যমুনার ক্যানেল পার হয়ে যেতে হয় স্কুল ও মাদরাসায়। যাতায়াতে একমাত্র ভরসা নৌকা। শিশুরাই নৌকার মাঝিমাল্লা হওয়ায় বর্ষার সময় নৌকা উল্টে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটে। এ ছাড়াও থাকে প্রাণহানির আশঙ্কা। এসব উপেক্ষা করেই যুগ যুগ ধরে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে উত্তাল যমুনার শাখা নদী পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায় যমুনা চরের শিশুরা।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নানা শঙ্কার মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বছরের প্রায় সাড়ে চার মাসই বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করে। কখনো কখনো ঢেউয়ের কারণে নৌকা উল্টে যাওয়ার শঙ্কার সাথে জীবন হারানোর শঙ্কা তো আছেই। তবু ঝুঁকি নিয়েই তারা পৌঁছে শিক্ষাঙ্গনে। আবার ছুটির পর একইভাবে ফেরে বাড়িতে।
চরবোয়ালকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রোজিনা, মুন্নি, আসলাম এবং তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী রেজয়ান ও আসিফ জানায়, প্রতিদিন সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রথম প্রস্তুতি হচ্ছে নৌকা আর বৈঠার খোঁজ করা। এরপর স্কুলের পোশাক পরে বই-খাতা নিয়ে নৌকায় করে বিদ্যালয়ে যাওয়া। মাঝি না পেয়ে নিজেদেরই নৌকা চালাতে হয়। এ জন্য অনেক দিন ক্লাস ধরতে পারে না। বন্ধুদের সাথে নিয়ে নৌকায় চরে আর শুকনো মওসুমে পায়ে হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করে তারা।
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক জানান, উপজেলার সীমান্তবর্তী সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়নের যমুনার পূর্বপারসহ উপজেলার প্রায় ২৫টি বিদ্যালয়ের শিশুদের যাতায়াতের এমন করুণ অবস্থা কয়েক যুগ ধরেই। বৃষ্টি ও রোদ উপেক্ষা করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাথায় নিয়েই কোমলমতি শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। তবে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে একটি বড় নৌকার ব্যবস্থা করলে বর্ষার শুরু থেকে পানি শুকানো পর্যন্ত শিশু শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে সুবিধা হবে।
অন্য দিকে শীতকালে খাল-বিল শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। তখন পড়তে হয় ভিন্ন সমস্যায়। এ সময় কোনো বাহনই চলে না। তখন শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হয় শিক্ষালয়ে। এ জন্য নির্ণয় করে দেয়া হয় স্কুলের নতুন সময়সূচি।
এ বিষয়ে চরবোয়ালকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আহাম্মদ উল্লাহ জানান, যমুনা নদী ভাঙনের কারণে চরাঞ্চলে রাস্তাঘাট নেই বললেই চলে। বর্ষা মওসুমে সমগ্র চরাঞ্চল ডুবে থাকে। যমুনা নদীতে বর্ষার পানি কমলেও খাল-বিল ও শাখা নদীতে পানি না কমায় বছরের বেশির ভাগ সময় নৌকা ছাড়া যাতায়াতের আর কোনো উপায় থাকে না। ছোট্ট নৌকায় চড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করে খুদে শিক্ষার্থীরা। এ কারণে অনেক শিশু এ সময় স্কুলে আসতে চায় না বা তাদের অভিভাবকরাও তাদের পাঠাতে চান না।
চৌহালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মনিরুজ্জামান মনি জানান, বন্যার পানি কমলেও চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা নৌকায় কষ্ট করেই স্কুলে আসা-যাওয়া করে। খুদে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া-আসার চিত্র খুবই ভয়ঙ্কর। এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহলকে অবগত করা হয়েছে।
চৌহালী উপজেলার সদিয়া চাঁদপুর ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম সিরাজ জানান, এখানে একটি কথা প্রচলন আছে ‘বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও’। বন্যার পানি কমে গেলেও যমুনা চরাঞ্চলের খালে পানি রয়েছে। বছরের প্রায় সাড়ে চার মাস শিশু শিক্ষার্থীসহ সবাইকে নৌকায় পারাপার হতে হয়। তিনি খুদে শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য সরকারিভাবে একটি বড় নৌকা সরবরাহের দাবি জানান।


আরো সংবাদ