২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রাজারহাটে তিস্তার ভাঙনে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের অস্তিত্ব বিলীনের পথে

বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের একটি গ্রাম ভাঙার দৃশ্য হনয়া দিগন্ত -

রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে তিস্তা নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বাড়িঘর। হুমকির মুখে পড়েছে বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনা। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ইউনিয়নটি। আতঙ্কে রাত কাটছে তীরবর্তী মানুষের।
সরেজমিন দেখা যায়, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের ডাংরার হাট, পাড়ামৌলা, কালির মেলা, রামহরি, চতুরা, গাবুর হেলান, রতি, তৈয়বখাঁ, বিদ্যানন্দ, চরবিদ্যানন্দ ও রামহরিসহ ১০টি গ্রাম ভাঙনের কবলে পড়েছে। গত দুই সপ্তাহে শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি, বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিদিন বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি, গাছপালা ও ফসলি জমি। অব্যাহত ভাঙনের কারণে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে বুড়িরহাট বাজার, গাবুর হেলান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তৈয়বখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আশ্রয়ণ ভবন, কালিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাঝপাড়া বালিকা মাদরাসা, বুড়িরহাট মসজিদ, বুড়িরহাট রাস্তা ও স্পার বাঁধ, তৈয়বখাঁ গ্রামের তিনটি মন্দির, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার। ভাঙন আতঙ্কে অনেকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যান্য স্থানে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনকবলিত বিভিন্ন স্থানে জিও ব্যাগ ফেললেও ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। প্রতি বছর বন্যার পানি কমতে শুরু করলে প্রকট হয় নদীভাঙন। পাড়ামৌলা গ্রামের আব্দুস সালাম (৬০) বলেন, ‘আর কত, এই নিয়ে সাতবার মোর বাড়িঘর ভাঙ্গিল, এবারে নয়া করি বাড়ি করিম তার কোনো উপায় নাই বাবা।’ একই গ্রামের কাঞ্চন বেওয়া (৫৮) বলেন, ‘স্বামী বাঁচি থাকাকালীন থাকি বাড়ি ভাঙে, এবারো ভাঙছে, কোনো রকম করি বান্ধের রাস্তাত ঘর করি আছি।’ তৈয়বখাঁ গ্রামের নদীভাঙনের শিকার নিতাইচন্দ্র (৫০), বিমল (৬০) ও ফুল বাবুসহ (৫৫) স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর এভাবে চললেও ভাঙন রোধে কর্তৃপক্ষ কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ করছে না। তারা ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
রাক্ষুসী তিস্তার কড়াল গ্রাসে রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের মানচিত্র বদলে গেছে। বিগত এক যুগে তিস্তা কেড়ে নিয়েছে উপজেলার বিদ্যানন্দ ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চার হাজারেরও বেশি পরিবারের ঘরবাড়ি, বসতভিটা ও ফসলি জমি। সর্বস্বান্ত এসব পরিবারের অনেকেই আজ পর্যন্ত মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে তিস্তাপাড়ের সর্বহারা মানুষের নানা কষ্টে দিন কাটছে।
এদিকে তিস্তা নদীভাঙনে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের পাশাপাশি ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের শরিষাবাড়ি বগুড়াপাড়া ও বুড়িরহাট এবং নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ গ্রামেও ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। শরিষাবাড়ি গ্রামের আব্দুস সাত্তার, মোহাম্মদ আলী ও মোক্তার হোসেনসহ চলতি মওসুমে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে জানান, তাদের জায়গাজমি নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পরও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত নদীভাঙন রোধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
তৈয়বখাঁ মৌজার ইউপি সদস্য মণীন্দ্রনাথ বলেন, এই মৌজায় গত এক যুগে ভাঙনের শিকার শত শত পরিবার যাদের নিজের বলতে কিছু নেই, তারা অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে কিংবা রাস্তার ধারে কোনো রকম মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে।
উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম জানান, এক যুগে নদীভাঙনে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের মানচিত্র বদলে গেছে, এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে এক সময় বিদ্যানন্দ ইউনিয়নকে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, এ পর্যন্ত ভাঙন এলাকাগুলোতে প্রায় ১২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণেরও পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

 


আরো সংবাদ