১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কলাপাড়ায় স্লুইস গেটের মুখে পলি ভরাট পাউবোর শত কোটি টাকার সম্পদ বেদখল

কলাপাড়া পাউবোর স্লুইস গেটে পলি জমে থাকার দৃশ্য : নয়া দিগন্ত -

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত স্লুইস গেটগুলো মুখে পলি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে স্লুইস গেট এলাকাবাসীর কোনো কাজে আসছে না। নষ্ট হচ্ছে স্লুইস গেটের পাকা ভবন। কোনোটির দেয়ালের ইটসহ ছাদের পলেস্তরা পর্যন্ত উধাও হয়ে গেছে। এমনকি ভবন নির্মাণ বা খালাশি বসবাসের জন্য অধিগ্রহণ করা জমি পর্যন্ত বেহাত হয়ে গেছে। আর পলি পড়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে খালগুলো। সরকারের নজরদারির অভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অবৈধভাবে দখল হয়ে গেছে। দীর্ঘ দিনে অরক্ষিত থাকায় এসব ভবনের এখন চরম জীর্ণদশা। পলেস্তরাসহ মূল ভবন পর্যন্ত ধসে পড়ছে। খালাশি ভবন পরিত্যক্ত, বিধ্বস্ত দশায় রয়েছে। একই দৃশ্য ১২টি ইউনিয়ন দু’টি পৌর এলাকায়। বেশির ভাগ স্লুইস গেট নিয়ন্ত্রণ করছে সরকারি দলের একটি প্রভাবশালী মহল। তারা জাল পেতে মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করে স্লুইস।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫৯ বছর আগে ১৯৬০ সালে অর্থবছরে বর্তমান বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, তৎকালীন নাম (ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) উপজেলায় ৯০টি স্লুইস গেট এবং সেখানে বসবাসের জন্য একটি করে বাসভবন নির্মাণ করে। ৯০টি স্লুইস গেট বসবাসের জন্য ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ জায়গা দেয়া হয় বাসভবন নির্মান চলাচল করা জন্য। তখন স্লুইসের সংখ্যা ছিল ১১৯টি। ওই সময় স্লুইস গেটগুলো পুরোপুরি সচল থাকায় সুষ্ঠুভাবে পানি নিষ্কাশন হতো। তখন এলাকায় ব্যাপক ফসলের সমারোহ ছিল। এলাকার কোথাও কোনো জলাবদ্ধতা ছিল না।
সরেজমিন দেখা গেছে, ষাটের দশকের পরে নদী ও খালের লোনা জলের প্রবেশ ঠেকাতে উপজেলায় গোটা উপকূলে করা হয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে মানুষের প্রাণহানি রক্ষায় এবং কৃষিকাজের স্বার্থে এই বাঁধ করা হয়। এর পরই ষাটের দশকের মাঝামাঝি বাঁধের অভ্যন্তরের খালের সাথে পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে করা হয় স্লুইস গেট। এর মধ্যে ড্রেনেজ স্লুইস ও ফ্লাসিং স্লুইসের সংখ্যা ১১৯টি। শতাধিক স্লুইস গেট রক্ষণাবেক্ষণসহ কৃষকের স্বার্থে পানি ওঠানো-নামানোর যথাযথ তদারকির জন্য স্লুইস গেটসংলগ্ন এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করা হয়। নিয়োগ করা হয় খালাশি।
বর্তমানে উপজেলায় বেশির ভাগ স্লুইসের মুখে ও নদী-খাল পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে প্রতি বছর পানি জমে ক্ষতি হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এ এলাকার স্লুইস গেটগুলো পলি জমে মাটির নিচে দেবে যাচ্ছে। পাউবো কর্তৃপক্ষ ওই সব সম্পদ রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানই স্লুইস গেটের দিকে নজর দেয়নি। ফলে কোটি টাকার মূল্যবান জমি স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে নিচ্ছে। প্রতি বছর পাউবোর জমি একসনা বন্দোবন্ত (ডিসিআর) নেয়ার নিয়ম থাকলেও সেটি অজ্ঞাত কারণে বন্ধ রয়েছে; যে কারণে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নের নয়াকাটা স্লুইসের গেটমুখে পলি পড়ে এর সংযোগ খালগুলো বর্তমানে পলি ভরাট হয়ে ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর সংযোগ খালগুলো প্রভাবশালীরা বাঁধ দিয়ে ছোট ছোট মিনি পুকুর তৈরি করা হয়েছে। নয়াকাটা স্লুইস খালটি মিলছে বাবলাতলা স্লুইসের সাথে ও পক্ষিয়াপাড়া স্লুইসের সাথে পানি প্রবহমান ছিল, সেখানে নয়াকাটা স্লুইসের খালটি কিছু অংশ প্রভাবশালীরা খাল দখল করে ছোট ছোট পুকুর তৈরি করা হয়েছে। ফলে এলাকায় দেখা দিয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। আশির দশকের আগে স্লুইস খালাশি ছিল, তখন খালাশিরাই জোয়ার-ভাটায় পানি ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝি সময় স্লুইস খালাশি নিয়োগপ্রক্রিয়া ১৯৯৮ সালে বন্ধ করে দেয় তৎকালীন সরকার। ফলে অবসরে যাওয়ার পর থেকে খালাশি ভবনগুলো পরিত্যক্ত হতে থাকে। একপর্যায়ে সব খালাশির পদ শূন্য হয়ে যায়। অরক্ষিত হয়ে যায় স্লুইস গেট। অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে কৃষকের স্বার্থে করা স্লুইস গেটসহ অভ্যন্তরীণ খালের পানি ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম। এখনই এসব রক্ষায় পদক্ষেপ নেয়াসহ ফের স্লুইস খালাশি নিয়োগ দেয়ার দাবি কৃষকসহ সাধারণ মানুষের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খান মো: ওয়ালিউজ্জামান জানান, কোনো ইউপি চেয়ারম্যান বলেন তার স্লুইস গেট পানি ওঠানো নিয়ে সমস্যা; তা হলে আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি ও পাউবো একজনকে সদস্য সচিব এবং চেয়ারম্যানকে সদস্য ও স্কুলশিক্ষককে সদস্য, কৃষি কর্মকর্তাকে প্রতিনিধি এবং দু’জন কৃষককে সদস্য করে কমিটি গঠন করা হবে। তিনি আরো জানান, পরিত্যক্ত খালাশি ভবনগুলোসহ অধিগ্রহণকৃত জমি উদ্ধারে কাজ করা হবে।


আরো সংবাদ