১০ ডিসেম্বর ২০১৯
গোয়ালন্দের চরাঞ্চলে শিশুরা শিক্ষাবঞ্চিত

শহরাঞ্চলে ব্যাঙের ছাতার মতো কিন্ডারগার্টেন

গোয়ালন্দের একটি চরে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা : নয়া দিগন্ত -

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চরাঞ্চলের শিশুরা। অথচ শহরাঞ্চলে দিনের পর দিন ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে কিন্ডারগার্টেনের মতো বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ওই বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না এবং মানছেন না কোনো সরকারি বিধিবিধান বলে অভিযোগ উঠেছে। গোয়ালন্দ সদরে যত্রতত্র চোখে পড়ে ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে চটকদার সাইবোর্ড বা ব্যানার।
গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের অনেক এলাকা প্রতি বছরই নদীভাঙনের শিকার হয়। ভাঙন এলাকার মানুষগুলো কৃষিকাজের ওপরই নির্ভরশীল। তাই শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নদীপাড়েই তাদের বসবাস। পদ্মার পাড়ে দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের কুশাহাটা, করনেশন, বেতকা, রাখাল গাছীসহ বেশ কিছু চর এলাকা রয়েছে, যেখানে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় ওই অঞ্চলের শিশুরা শিক্ষাবঞ্চিত হয়ে দিন দিন নিরক্ষর জনগোষ্ঠীেত পরিণত হচ্ছে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে পদ্মার চরে কুশাহাটা এলাকা। ওই চরের প্রায় দুই শতাধিক শিশু সম্পূর্ণ শিক্ষাবঞ্চিত। এ ছাড়া স্বাস্থ্য চিকিৎসা, স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি, অন্ন, বস্ত্র ও আর্থিক সঙ্কটসহ সব ধরনের নাগরিকসুবিধা থেকে বঞ্চিত ওই এলাকার মানুষ। এমনকি কোনো এনজিও কর্মীর পদচারণাও ওই চরাঞ্চলে নেই। ঝড়-বৃষ্টি ও নদীর সাথে যুদ্ধ করেই তাদের জীবন-জীবিকা চালাতে হয়। মাছ ধরা ও কৃষিকাজই তাদের জীবিকা অর্জনের একমাত্র উপায়।
দৌলতদিয়া ক্যানাল ঘাট থেকে ট্রলারে ওই চরে পৌঁছলে শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু নয়া দিগন্তের সংবাদদাতাকে জানায় তাদের আবেগ, দুঃখ ও ক্ষোভের কথা। দেখা যায়, কুশাহাটার জয়পুর মহর আলী সরদারপাড়া, মকবুল ফকিরপাড়া, মাইনদ্দিন ফকিরপাড়া নামে তিন পাড়ার চার দিকে নদীবেষ্টিত কাশবন। একটি মসজিদ ছাড়া এখানে আর কোনো সেবামূলক বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান নেই। সাংবাদিকের আগমন জানতে পেরে প্রায় দুই শতাধিক শিশু ও তাদের অভিভাবকরা মুহূর্তের মধ্যে জমায়েত হয়। তারা দাবি জানায়, তাদের লেখাপড়ার জন্য এই এলাকায় একটি বিদ্যালয় চাই।
ওদিকে গোয়ালন্দ পৌরসভা ও এর আশপাশ এলাকার শহরাঞ্চলের অল্প জায়গাজুড়ে রয়েছে অনেক সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা ধরনের শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা। এ এলাকায় পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও একশ্রেণীর ধনাঢ্যরা ব্যবসা হিসেবে কিন্ডার গার্টেন নামে নানা ধরনের চটকদার বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে বসেছে। শিক্ষার নামে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে তারা ধনী এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ চর এলাকায় যেখানে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই সেখানে তাদের কোনো নজর যায় না।
এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে সামান্য বেতনের অদক্ষ শিক্ষক দ্বারা ওই সব বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালিছে যাচ্ছেন। এতে করে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অবশ্য সবগুলো নয় কিছু ভালো প্রতিষ্ঠানও আছে।
জানা যায়, গোয়ালন্দ পৌরসভা ও উপজেলা কমপ্লেক্সসহ এর আশপাশ এলাকায় ২৫টি কিন্ডার গার্টেন রয়েছে। এ ছাড়াও গাজী সাইফুল ইসলাম বিদ্যানিকেতন, জে বি কিন্ডারগার্টেন, আবুল হাসান কলেজিয়েট স্কুলসহ নতুন করে আরো কয়েকটি বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের হাউলি কেউটিল গ্রামে গাজী সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি নিজ নামে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল শুরুর উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে পাশের ১৭ নম্বর হাউলি কেউটিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৮ নম্বর চর বালিয়াকান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আ: গনি খান বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে তিনটি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই কিন্ডার গার্টেনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে গত ২৪ সেপ্টেম্বর পৃথক তিনটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে স্বাক্ষরকারী প্রধান শিক্ষকরা জানান, তাদের স্কুল থেকে মাত্র ৩০০-৪০০ গজের মধ্যে বাণিজ্যিক ওই কিন্টার গার্টেনটি স্থাপিত হচ্ছে। এতে করে তাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সঙ্কট দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে ওই কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষকরা নানা ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব নিয়ে তাদের ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা শুরু করেছেন।
এ ব্যাপারে চর বালিয়াকান্দী গ্রামের বাবুল মোল্লা, আবুল কালাম, শহিদুলসহ একাধিক অভিভাবক বলেন, তাদের ছেলেমেয়েরা সরকারি স্কুলে ভালোই লেখাপড়া করছিল। বাড়ির কাছে নতুন কিন্ডারগার্টেন হওয়ায় তাদের শিশুরা ওই স্কুলে ভর্তি হওয়ার বায়না ধরেছে; কিন্তু দরিদ্রতার কারণে তারা ওই স্কুলে ছেলেমেয়ে ভর্তি করতে না পারায় সন্তানরা লেখাপড়ায় অমনোযোগী হচ্ছে। এ রকম আরো অনেক স্বল্প আয়ের অভিভাবকের নানা কিন্ডার গার্টেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে শিক্ষা অফিসার আ: মালেক বলেন, চরাঞ্চলে নতুন স্কুল খোলার ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে। তবে যেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সেখানে কোনো অবস্থায়ই নতুন স্কুলের অনুমতি দেয়া যাবে না। গাজী সাইফুল ইসলাম বিদ্যানিকেতনের ব্যাপারে মৌখিকভাবে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তা ছাড়া ওই প্রতিষ্ঠানের রিরুদ্ধে তিনটি বিদ্যালয়ের লিখিত অভিযোগ আছে।

 

 


আরো সংবাদ