১২ ডিসেম্বর ২০১৯

ঠাকুরগাঁওয়ে ভূমি রেজিস্ট্রেশন সেবা বিপর্যস্ত : জনদুর্ভোগ

আইনি দুর্বলতা ও সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব
-

আইনি দুর্বলতা, জটিলতা ও সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব, সেই সাথে কিছু মানুষের অনৈতিকতা, ফোরটিসিক্স বা এসএ রেকর্ডের ত্রুটি এবং যুগপোযোগী সরকারি নীতিমালা না থাকায় ভূমি রেজিস্ট্রেশন সেবা বিপর্যস্ত হতে চলেছে ঠাকুরগাঁওয়ে। এতে দিন দিন বেড়েই চলেছে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য।জেলার সাব-রেজিস্ট্রাররা জমি কেনাবেচায় রেজিস্ট্রি করার ক্ষেত্রে শুধু খাস কবলা দলিলে ফোরটিসিক্স রেকর্ড এবং সাথে খারিজ অথবা খাজনা পরিশোধের যেকোনো একটি দেখে থাকেন। অন্য দিকে হেবা, হেবা বিল এওয়াজ ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলসহ অন্যান্য দলিল রেজিস্ট্রি করার ক্ষেত্রে শুধু ফোরটিসিক্স রেকর্ডে মালিকদের নাম উল্লেখ দেখেন তারা। অন্য কিছু দেখেন না। এতে বিপর্যস্ত হতে চলেছে জেলার ভূমি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থাপনা। চরম দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দিনে দিনে বাড়ছে মামলাজট। কারণ ভূমি মালিকানা নির্ধারণে আদালত ও ভূমি রেজিস্ট্রেশনের নিয়মনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ঠাকুরগাঁওয়ে ভূমির মালিকানা নির্ধারিত হয় ১৯১৭ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ (সিএস) রেকর্ডের ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালে প্রকাশিত ফোরটিসিক্স (এসএ) রেকর্ড এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন দলিলাদি, খারিজ ও হাল নাগাদ খাজনা পরিশোধের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ রেকর্ডে প্রথম পাতায় বিভিন্ন দাগের বিপরীতে মালিকদের প্রাপ্য অংশের উল্লেখসহ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দাগ দখলের উল্লেখ থাকে। কিন্তু ফোরটিসিক্স রেকর্ডে প্রথম পাতায় শুধু মালিকদের নাম উল্লেখ থাকে।
এদিকে মামলার দীর্ঘসূত্রতা আর ফোরটিসিক্স (এসএ) রেকর্ডের দুর্বলতায় সুযোগ নিচ্ছে অসৎ, লোভী আর ভূমিদস্যুরা। তারা ওই রেকর্ডে পূর্ব-পুরুষদের নাম আছে এ রকম ওয়ারিশ এবং জের ওয়ারিশদের টাকার লোভ আর বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের জমি থাক বা না থাক অন্য ওয়ারিশের জমিটুকুর বিপরীতে দলিল সৃষ্টি করছে এবং শক্তি প্রয়োগ করে দখল করে নিচ্ছে। এতে প্রকৃত মালিকরা হারাচ্ছে তাদের ভূসম্পত্তি, যতেœ গড়া মার্কেট আর ঘরবাড়ি। আদালত প্রাঙ্গণে বাড়ছে মানুষের পদচারণা আর দীর্ঘশ^াস। নিম্ন আদালতেই মামলার রায় পেতে বছরের পর বছর কেটে যায়। হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টতো আছেই।
এ বিষয়ে শহরের আশ্রমপাড়ার ভুক্তভোগী আব্দুল মজিদ বলেন, ১৯৯০ সালে আমি রেকর্ডীয় মূল মালিকের কাছ থেকে জমি কিনেছি। সে অনুযায়ী খারিজ করেছি আর হাল নাগাদ খাজনা পরিশোধ করছি। কেনার সময় কাগজপত্র দেখেশুনে কিনেছি। অথচ যাদের পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে কিনেছি তাদের নাতি-পুতিরা এখন ফরটিসিক্স রেকর্ডের বলে মালিকানা দাবি করছে। আমার জমি ফাঁকা থাকার কারণে তারা রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে বিভিন্ন দলিল সৃষ্টি করে আমাকে জমি থেকে বেদখল করে ঘরবাড়ি তুলেছে। এই ফোরটিসিক্স রেকর্ডের কারণে রেজিস্ট্রেশনে অত্যধিক সমস্যা হচ্ছে বলে জানান তিনি। রেজিস্ট্রি অফিস কাগজপত্র ঠিকমতো যাচাই না করে শুধু ফোরটিসিক্স রেকর্ডে পূর্ব-পুরুষদের নাম দেখে ওয়ারিশদের জমি থাক বা না থাক রেজিস্ট্রি করে দলিল সৃষ্টি করছে। মূলত ভূমিদস্যুরাই রেকর্ডের মালিকদের ওয়ারিশদের লোভে ফেলে তাদের দিয়ে এসব করাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরবর্তীতে জমি দখল করছে।
এতে প্রকৃত মালিকরা নিরুপায় হয়ে মামলা করছে আর এতে মামলাজট সৃষ্টি হচ্ছে। একই অবস্থায় শহরের শাহাপাড়ার শরিফুল ইসলাম, দক্ষিণ সালন্দরের ফয়জুল ইসলাম ও শাহাপাড়ার মনসুর আলীর।
ঠাকুরগাঁও জেলা জজ কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মহসিন আলী বলেন, আদালত আর রেজিস্ট্রেশন আইনে জমির মালিকানা নির্ধারণ সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। জমির মালিকানার যে ধারাবাহিকতা আছে সেটা সহকারী কমিশনার ভূমি ও সাব-রেজিস্ট্রারকে একই নীতি অনুসরণ করতে হবে। এতে আদালতে ৪০-৫০ শতাংশ মামলা কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বহ্নিশিখা আশা বলেন,ভূমি রেজিস্ট্রেশন আইনটি সংশোধন হওয়া দরকার। এখন প্রয়োজন অনুযায়ী খারিজ দেয়ার ক্ষেত্রে বণ্টক নামা দেখা হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা রেজিস্ট্রার আবু তালেব সরকার জানান, জনদুর্ভোগ কমাতে যুগপোযোগী সরকারি নীতিমালা ও সব ধরনের দলিল সৃষ্টিতে খারিজ, খাজনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফোরটিসিক্স রেকর্ডে পূর্ব-পূরুষের নাম থাকার কারণে আমরা বাধ্য হয়ে রেজিস্ট্রেশন করছি। জমির ওয়ারিশ বেশি থাকলে তারা পারিবারিক বণ্টক করে, খারিজ, খাজনা পরিশোধ করে যদি হস্তান্তর করতে আসে তাহলে মামলা জট থাকবে না। সব ধরনের দলিল সৃষ্টিতে খারিজ, খাজনা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা ভূমি সেবা দিতে গিয়ে অনেক সমস্যার সম্মুুখীন হচ্ছি। জমির অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বাটোয়ারা না থাকা এবং ফোরটিসিক্স খতিয়ানের কিছু ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে একজনের জমি আরেকজনের নামে দলিল সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যে তিনটি ডিপার্টমেন্ট ভূমি সেবা দিয়ে থাকে সেগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করছে সরকার।

 


আরো সংবাদ