২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

নগরবাড়ী ও বাঘাবাড়ীতে নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ বস্তা সার

তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ
নগরবাড়ীতে খোলা জায়গায় এভাবে রাখা হয়েছে রাসায়নিক সার : নয়া দিগন্ত -

উত্তরাঞ্চলের নগরবাড়ী ও বাঘাবাড়ী নৌবন্দর এলাকায় দেশী-বিদেশী লাখ লাখ বস্তা রাসায়নিক সার খোলা আকাশের নিচে অরক্ষিত অবস্থায় স্ট্যাক (ছাউনি) দিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘ দিন খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় রোদে পুড়ে, কুয়াশা ও বৃষ্টিতে ভিজে সারের গুণগতমান কমে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, প্রতি বস্তা সারের ওজন দুই থেকে তিন কেজি কমে যাচ্ছে। এই সার কিনে কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছেন বলে ডিলাররা জানিয়েছেন। এ দিকে মাসের পর মাস স্ট্যাক দিয়ে রাখা সারের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা যায়, বিসিআইসি আমদানিকারকদের মাধ্যমে চীন, মিসর, সৌদি আরব, তিউনিসিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি সার আমদানি করছে। পরে বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মাধ্যমে ওই সার বাফার গুদামে পৌঁছে দেয়া হয়। সমুদ্রপথে বড় জাহাজে সার আমদানি করা হয়। পরে ছোট জাহাজে সার আনলোড করে বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ী বন্দরে আনা হয়। সেখান থেকে সড়কপথে উত্তরাঞ্চলের ১৪টি বাফার গুদামে সার মজুদের জন্য পাঠানো হয়। বাফার গুদামগুলোতে জায়গা না থাকায় বাঘাবাড়ীর বড়াল নদীর উত্তর-দক্ষিণ পাড়ে এবং নগরবাড়ীতে যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাব্যাপী সারের বস্তা স্ট্যাক দিয়ে রাখা হয়েছে। এতে বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে শুকিয়ে শক্ত ও জমাট বেঁধে সারের গুণগতমান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বাঘাবাড়ী বন্দরের ট্রান্সপোর্ট এজেন্ট ও বিসিআইসির বাঘাবাড়ী বাফার গুদাম সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের পাবনা-সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, বগুড়া, শান্তাহার, জয়পুরহাট, রাজশাহী, নাটোর, রংপুর, লালমনিহাটের মহেন্দ্রনগর, দিনাজপুর, পার্বতীপুর চরকাট, ঠাকুরগাঁও, বিরামপুর ও গাইবান্ধায় বাফার গুদাম রয়েছে। গত বছরের সারে বাফার গুদামগুলো ভরা রয়েছে। ফলে বন্দরে যে পরিমাণ সার আসছে, তা বন্দর এলাকাতেই পড়ে থাকছে। দীর্ঘ দিন পড়ে থাকা সারের কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ দিকে সারের ঝাঁঝালো গন্ধে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
নগরবাড়ী বন্দর সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, চট্টগ্রাম নৌবন্দর থেকে প্রায় দুই হাজার টন রাসায়নিক সার বোঝাই পাঁচটি কার্গো জাহাজ নগরবাড়ী নৌবন্দরে এসে নোঙর করেছে। বেশ কিছু জাহাজ আনলোডের অপেক্ষায় রয়েছে। জাহাজগুলোর গন্তব্য বাঘাবাড়ী নৌবন্দর হলেও যমুনায় নাব্যতা সঙ্কটের কারণে নগরবাড়ীতে ভিড়ছে। এতে নগরবাড়ী বন্দর ফিরে পেয়েছে তার হারানো ঐতিহ্য। এ কারণে বাঘাবাড়ী বন্দরের আমদানি-রফতানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। নিয়মানুযায়ী জাহাজগুলো বন্দরে পৌঁছার পর আনলোড করে সার ট্রাকযোগে বাফার গুদামগুলোতে পৌঁছে দেয়ার কথা। কিন্তু গুদামগুলোতে জায়গা না থাকায় এই সার মাসের পর মাস বন্দরের আশপাশে খোলা জায়গায় পড়ে থাকছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নগরবাড়ী বন্দরে পন্টুন ও জেটি নেই। গড়ে ওঠেনি কোনো অবকাঠামো। শ্রমিকরা বাঁশের মাচা বেঁধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাসায়নিক সারসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী লোড-আনলোড করছেন। পন্টুন না থাকায় জাহাজ নদী পাড়ে ভিড়ছে। শ্রমিকরা পণ্যসামগ্রী নিয়ে বাঁধের ঢালু দিয়ে ওঠানামা এবং মালভর্তি ভারী ট্রাক চলাচল করায় বাঁধের অনেক জায়গায় সিসি ব্লক দেবে ও ধসে গেছে। এতে বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার বস্তা পণ্যসামগ্রী আমদানি-রফতানি হচ্ছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র রাজনৈতিক দলের কথা বলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বস্তা প্রতি দশ পয়সা হারে চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নগরবাড়ী বন্দরে নোঙর করা এমভি আল আমিন কার্গো জাহাজের চালক কাজী নূর বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আট হাজার বস্তা সার নিয়ে এসে ছয় দিন ধরে বাঘাবাড়ী বন্দরে বসে আছি। সার পরিবহন ঠিকাদাররা বলছেন, শিগগিরই জাহাজ থেকে সার আনলোড করা হবে। অথচ বাফার গুদামে পাঠাতে না পারার কারণে দিনের পর দিন এভাবে বসে থাকতে হচ্ছে।
কয়েকজন সারের ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক দিন ধরে সারের বস্তা বাইরে পড়ে থাকায় সার শক্ত ও জমাট বেঁধে যায়। এতে সারের গুণগত মানের কিছুটা পরিবর্তন হয়। কৃষকরা এই সার নিতে চায় না। কৃষকরা দেশী সার কেনার প্রতি বেশি আগ্রহী। অথচ দেশী সার না দিয়ে চীন থেকে আমদানি করা সার তাদের দেয়া হচ্ছে। তবে ডিলাররা বলছেন, বাফার গুদামের সার জমাট বাধা। এ ছাড়া প্রতি বস্তায় সার দুই থেকে তিন কেজি করে ওজনে কম পাওয়া যায়। তবে বিদেশ থেকে আমদানি করা সারের বস্তার ওজন বেশি কম। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
বেড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মসকর আলী জানিয়েছেন, নগরবাড়ী নৌবন্দরে সংরক্ষণাগার না থাকায় রাসায়নিক সার খোলা আকাশের নিচে স্ট্যাক দিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে এভাবে পড়ে থাকায় সারের কার্যক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে। এই সার জমিতে প্রযোগ করে কাক্সিক্ষত ফলন নাও পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ী বন্দরসহ এ অঞ্চলের ১৪ টি বাফার গুদামে প্রায় এক লাখ টন রাসায়নিক সার মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে চান থেকে আমদানিকৃত সার রয়েছে। এই সার বাংলাদেশের কাফকো ও যমুনা সারের চেয়ে অনেক নি¤œমানের। এই নি¤œমানের সার আমদানি ও সরবরাহের ক্ষেত্রে একশ্রেণীর আমদানিকারক, বাফার গুদাম ইনচার্জরা জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

 


আরো সংবাদ