২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

গাজীপুরে খাবারের হোটেলে মধ্যরাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ

গাজীপুরের মহানগরের বোর্ডবাজারে মধ্যরাতে খাবারের হোটেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের অন্তত ১৮ হোটেল কর্মী আহত হয়েছে। এতে পাশাপাশি দু’টি ভবনের নীচ তলার দু’টি হোটেল লন্ডভন্ড হয়েছে। বিস্ফোরণের এ ঘটনার তদন্তের জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, এলাকাবাসী ও আহতরা জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের বোর্ডবাজারে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন চারতলা ভবনের মনসুর সুপার মার্কেটের নীচতলার বাংলার রাঁধুনী নামে একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এ ভবন লাগোয়া অপর একটি তিনতলা ভবনের নীচ তলায় তৃপ্তি হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট।

শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে কাজ শেষে হোটেলের কর্মীরা হোটেল বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এসময় হঠাৎ বাংলার রাঁধুনী হোটেলে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়। বিস্ফোরণে হোটেলের আশেপাশের এলাকা কেঁপে উঠে। ভয়াবহ এ বিস্ফোরণের ঘটনায় ওই দুই হোটেলের আসবাবপত্রসহ কংক্রিটের পিলার ও ছাদের পলেস্তরা খসে টুকরো টুকরো হয়ে প্রায় ১২০ ফুট দূরে ছিটকে পড়ে।

বিস্ফোরণে হোটেল থেকে স্প্রিন্টারের মতো ছিটকে যাওয়া কংক্রিট ও ইটের টুকরোর আঘাতে মহাসড়কের অপর পাশের বোর্ডবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাঁচতলার কাঁচ ও মিনারের মাইক ভেঙে যায়। বিস্ফোরণের ভয়াবহতায় হোটেল দু’টির পাশ্ববর্তী আল আমীন হার্ডওয়্যার, আইএফআইসি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্যাসিফিক রেষ্টুরেন্ট, ভাই ভাই সুপার মার্কেটের কয়েকটি দোকানসহ আশপাশের স্থাপনার জানালার কাঁচ ভেঙ্গে যায় ও ভবনের পলেস্তরা খসে পড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

এ ঘটনায় অন্ততঃ ১৮জন আহত হয়। খবর পেয়ে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। তবে তার আগেই স্থানীয়রা আগুন নেভায় ও আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় তায়েরুন্নেসা মেমোরিয়াল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে যায়। সেখান থেকে আহত ১৮ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহতরা সবাই ওই দুই খাবার হোটেলের কর্মী।

আহতরা হলেন, বাংলার রাঁধুনী হোটেলের ম্যানেজার সুমন (২৬), আল আমীন (৩২), আরিফুল (১৮), জুবায়ের (১৬), নাজমুল (২২), জাহিদ (২৫), আলমগীর (২৭), মারুফ (১৩), মাসুদ (১৮), সুফিয়ান (২২), জাহাঙ্গীর (২০), শুকুর (১৯), রাশেদ (২২), তুহিন (২২)। এদের মধ্যে দ্বগ্ধ তিনজনকে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

রাধুনী হোটেলের রুটির কারিগর মো. জমির উদ্দিন জানান, রাত পৌনে ২টার দিকে তাদের হোটেলের মেঝের নিচ দিয়ে যাওয়া জ্যাম হয়ে থাকা পিভিসির পাইপ পরিস্কার করা হয়। পরে ওই পাইপের মুখটির ঢাকনা লাগানোর সময় হঠাৎ করে প্রচন্ডবেগে গরম বাতাস বইতে থাকে। এক পর্যায়ে ওই বাতাস তাকে ঠেলে নিয়ে হোটেলের ভেতর থেকে বাইরের দিকে ফেলে দেয় এবং বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এসময় তার উপর ইট-সুরকি ও কাঁচের টুকরো তার উপর পড়ে। এতে তিনি আহত হন।

রাঁধুনী রেস্টেুরেন্টের মালিক হাবিবুর রহমান ও তৃপ্তি হোটেলের মালিক রেজাউল ইসলাম জানান, তাদের হোটেলে রান্নায় ব্যবহারের জন্য থাকা গ্যাস সিলিন্ডারগুলো অবিস্ফোরিত অবস্থায় রয়েছে। কোনো বিস্ফোরক পদার্থের কারণে এ ঘটনাটি ঘটেছে বলে তারা দাবী করেন।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও জিএমপি’র গাছা থানার ওসি ইসমাইল হোসেন বলেন, হোটেল দু’টিতে পাইপলাইনের গ্যাসের পাশাপাশি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হতো। বিস্ফোরণের পর সেগুলোকে অক্ষত অবস্থায় ধ্বংস স্তুপে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে ঠিক কীভাবে ওই বিস্ফোরণ ঘটেছে তা তদন্ত শেষে বলা যাবে।

রাঁধুনী রেস্টুরেন্ট ও তৃপ্তি হোটেল থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত না হলেও বিস্ফোরণটি গ্যাস থেকেই হয়েছে। পাশাপাশি তিন ও চারতলা দুটি ভবনের নিচতলায় ওই দুই খাবার হোটেলের মাঝ বরাবার স্যুয়ারেজ লাইন গেছে। ওই লাইন ছিল ঢাকনা দেওয়া।

ধারণা করা হচ্ছে, স্যুয়ারেজ লাইনে ময়লা আটকে গিয়ে সেখানে গ্যাস জমে গিয়েছিল। জমে থাকা গ্যাস কোনো দাহ্য বস্তুর সংস্পর্শে আসায় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু অতিরিক্ত কোনো দাহ্য বস্তু না থাকায় আগুন ছড়াতে পারেনি। এর আগেও শনিবার রাতের এ ঘটনাস্থল হতে কিছুটা দূরে একই স্যুয়ারেজ লাইনে গত রমজানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত কোনো দাহ্য বস্তু না থাকায় আগুন ছড়াতে পারেনি।

ভয়াবহ এ বিস্ফোরণের সংবাদ পেয়ে শনিবার সকালে গাজীপুর মহানগরের পুলিশ কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন এবং বিকেলে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

শনিবার রাতের এ বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তের জন্য ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিনুর ইসলামকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে জেলা প্রশাসকের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান শাহিনুর ইসলাম রবিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে দুই হোটেলের মাঝখান দিয়ে (মেঝের নিচ দিয়ে যাওয়া) স্যুয়ারেজ লাইনে এবং হোটেল দুইটির সামনে থাকা ড্রেনে জমাকৃত গ্যাসের কারণেই এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

অপরদিকে র‌্যাব-১-এর কোম্পানী কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দুপুরে বোম্ব ডিস্পোজাল ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ দলের ছয় সদস্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং বিস্ফোরণ স্থলের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। ওই নমুনা পরীক্ষার পর বিস্ফোরণের প্রকৃতি ও কারণ সম্পর্কে বলা যাবে।


আরো সংবাদ