০৯ ডিসেম্বর ২০১৯
বেনাপোল কাস্টম হাউজ

আমদানি বাড়লেও বাড়েনি রাজস্ব

ভারতীয় সংস্থাগুলো শুল্কযুক্ত পণ্যের পরিবর্তে বাংলাদেশে তাদের চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের পণ্য প্রেরণে বেশি আগ্রহী
-

সদ্য সমাপ্ত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টম হাউজে পণ্যের আমদানি বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। তারপরও রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ শুল্ক স্টেশনটিকে। শূন্য শুল্ক ও কম শুল্কের পণ্যের বেশি আমদানি এবং ভারতের নীতিগত কিছু সিদ্ধান্তকে কম রাজস্ব আদায়ের জন্য দায়ী করছেন বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট আমদানি হয়েছে নানা ধরনের প্রায় ২০ লাখ ১ হাজার ৪৬৩ টন পণ্য, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৩ হাজার ৬৫ টন বেশি। ১০ বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এটি ছিল সর্বোচ্চ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পণ্যের মোট আমদানি ছিল ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯৭ টন। তবে বিপরীত চিত্র দেখা যায় রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আদায় বাড়লেও তা ছিল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২২.০৯ শতাংশ কম। মোট ঘাটতি ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, প্রায় ৮৯২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে ৪ হাজার ৯৩১ কোটি ৯০ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ কোটি ১ লাখ টাকা বেশি। ২০১৭-১৮ সালে রাজস্ব আদায় হয় ৪ হাজার ২২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ আমদানি বৃদ্ধি পেলেও কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় হয়নি।
এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, বেনাপোলে নি¤œ শুল্কহারের এবং কম মূল্যের পণ্য আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে অধিক শুল্কহারযুক্ত পণ্যের আমদানি হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর ব্রোকেন স্টোন ও বোল্ডার ছাড়া অন্যান্য পণ্যে আমদানি বেড়েছে ৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকার। কম শুল্কের পণ্য আমদানিসহ বেশ কিছু কারণে আমদানি বাড়লেও ঘাটতি হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে এনবিআরকে ব্যাখ্যা দিয়েছি।
গত ২৪ জুলাই এনবিআরকে আমদানি ও রাজস্ব ঘাটতির সার্বিক বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে চিঠি দিয়েছে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরীর সই করা চিঠিতে দাবি করেন, পেট্রোপোলে কর্মরত ভারতীয় সংস্থাগুলো শুল্কযুক্ত পণ্যের পরিবর্তে বাংলাদেশে তাদের চলমান রামপালসহ বিভিন্ন প্রকল্পের পণ্য যেমন ব্রোকেন স্টোন, বোল্ডার, যন্ত্রপাতি ও লৌহসামগ্রী ইত্যাদি বাংলাদেশে প্রেরণে বেশি আগ্রহী। এর ফলে বাণিজ্যিক ও শুল্কযুক্ত পণ্য প্রেরণে বেশ বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। কম শুল্ক হারের পণ্য যেমন ব্রোকেন স্টোন ও বোল্ডারের আমদানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধরনের পণ্য আমদানি বেশি হলেও শুল্ক কম এসেছে।
অন্যদিকে শূন্য শুল্ক ও কম শুল্কহারের পণ্য যেমন- তুলা, মসুর ডাল ইত্যাদির আমদানি বেড়েছে ৮.২৯ থেকে প্রায় ৩৯৬ শতাংশ। আর ৫ শতাংশের শুল্কহারের পণ্য আমদানি বেড়েছে ১৯২ শতাংশ পর্যন্ত। বিপরীতে আমদানি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে প্রধান রাজস্ব সংশ্লিষ্ট পণ্যÑ পাথর, সিমেন্ট, এসবেস্টসহ সমজাতীয় পণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক, ইলেকট্রিক্যাল মেশিনারি ও ইকুইপমেন্ট এবং লোহা ও স্টিলের তৈরি পণ্য। এসব পণ্য আমদানি হ্রাস পেয়েছে ৬ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত।
চিঠিতে আরো বলা হয়, চাল ছাড়া ২৫ শতাংশ শুল্কহারের পণ্যের আমদানি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে ১৩.৫৩ শতাংশ, যা অব্যাহত থাকলে ২৮২ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হতো। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পণ্যের আমদানি হ্রাস পেয়েছে যেমনÑ ফুটওয়্যার, পারফিউম, কসমেটিকস, শাড়ি, থ্রি-পিস ও মোটরসাইকেল।
এ ছাড়া ভারতীয় দিকে অত্যধিক যানজট ও পর্যাপ্ত ট্রাক সরবরাহ না পাওয়া, স্থলবন্দরের সীমাবদ্ধতা, গত ডিসেম্বরে নির্বাচনের প্রভাব, সাফটা কার্যকর থাকায় বাণিজ্যিক পণ্য চালানগুলো রেয়াতি সুবিধার আওতায় শুল্ককর হ্রাস পাওয়া, বেনাপোলে বিএসটিআই ও বিসিএসআইএর শাখা অফিস না থাকায় পণ্যের মান নির্ধারণে কালক্ষেপণ ও ভারতীয় মুদ্রানীতির সংস্কার এবং ব্যাপকভাবে জিএসটি আরোপিত হওয়ার ফলে স্বাভাবিক আমদানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউজে ব্যবসায়ীদের পক্ষে কাজ করেন ছোট-বড় সাত শ’র বেশি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। তাদের বেশ কয়েজন দাবি করেছেন, বন্দরে পণ্য দীর্ঘদিন আটকে রেখে কাস্টম হাউজ ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করছে। মানুষ এখন বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম পোর্টকে বেছে নিচ্ছে। যারা যেতে পারছেন তারা সেখানে গিয়ে ব্যবসা করছেন, আর যারা যেতে পারছেন না তারা ব্যবসা থেকে সরে যাচ্ছেন।
বিগত ১০ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেনাপোল স্থলবন্দরের শুল্ক স্টেশন এ সময়ের মধ্যে চারবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে। এ সময় ১৫৭ কোটি ২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.০৯ শতাংশ। এরপর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪.০৬ প্রবৃদ্ধিতে ১০৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছিল। অন্যদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর বাদ দিলে সবচেয়ে ঘাটতির বছর ছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছর। ওই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪১৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছিল।
বেনাপোল কাস্টম হাউজে পণ্য আমদানি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বন্দরটি দিয়ে পণ্য আমদানি হয় ১২ লাখ ৭১ হাজার ২৪ টন। ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৯৪২, ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৫, ১৫ লাখ ১৯ হাজার ২২০ ও ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯৭ টন। যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্রোকেন স্টোন ও বোল্ডারসহ পণ্যের মোট আমদানি হয়েছে প্রায় ২০ লাখ ১ হাজার ৪৬৩ টন।

 


আরো সংবাদ