১২ ডিসেম্বর ২০১৮

বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে সীমাহীন দুর্ভোগ

-

উখিয়ার পার্শ্ববর্তী তুমব্রু সীমান্তের জিরো লাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জন্যে সেখানে মাচাং ঘর তৈরি করা হয়েছে। বর্ষাকালে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দুর্ভোগ কমাতে এসব মাচাং ঘর তৈরি করে দিয়েছেন ঢাকার কিছু ব্যবসায়ীরা।
প্রথম পর্যায়ে সেখানে ৪৫ পরিবারের জন্য ৯ টি শেড তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে আরো ৬০ ঘর তৈরি করে দিয়েছেন জিরো লাইনে। বর্মানে তুমব্রু সীমান্তের জিরো লাইনে এক হাজার সাত পরিবারের প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ অবস্থান করছে।
জায়গাটি তুমব্রু খাল সংলগ্ন হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে এলাকাটি পানিতে তলিয়ে যায়। আর এতে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়ে রোহিঙ্গারা। গত বছরের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক সহিংসতায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তের জিরো লাইনে ৬ হাজারেও বেশি রোহিঙ্গা এসে অবস্থান নেয়।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের অন্য সব রোহিঙ্গাদের উখিয়া কুতুপালং শিবিরে সরিয়ে নেওয়া হলেও শুধু মাত্র তুমব্রু সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা এখনো সেখানেই রয়ে গেছে। মিয়ানমারে বেশ কয়েকবার জিরো লাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেয়ার আশ্বাস দিলেও এখনো তাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়া হয়নি।
গত ১১ মাসের বেশি সময় ধরে এসব রোহিঙ্গারা জিরো লাইনে কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষার এই সময়ে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ মারাত্নক আকার ধারণ করে। রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ জানান, জিরো লাইনের পশ্বিম পাশে যেসব জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে ৯ টি বড় মাচাং ঘর তৈরি করে দেয় হয়েছে। প্রতি শেডে ৫ পরিবার করে ৪৫ পরিবার থাকতে পারে।
তবে পর্যায়ক্রমে সব রোহিঙ্গাদের জন্য শেড তৈরি করা হবে। ঢাকার কিছু ব্যবসায়ী শেড নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে বলে জানান তিনি। ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গির আজিজ জানান, বর্ষায় রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ নিয়ে প্রশাসন, বিজিবি, ইউএনএইচসিআর, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ সব কতৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে ঢাকার কিছু ব্যবসায়ীর সহায়তায় বাঁশ, বেড়া টিন দিয়ে সেখানে কিছু মাচাং ঘর তৈরি করা হয়েছে।
ফলে কিছুটা হলেও দুর্ভোগ কমবে। জিরো লাইনে ঘরবাড়ি নির্মাণে প্রশাসন ও বিজিবি সহযোগিতা করছে। মাটি থেকে ৫ ফুট উচু করে মাচাং ঘরগুলো তৈরি করেছে রোহিঙ্গাদের থাকার জন্যে। রোহিঙ্গা নুরুল আমিন জানান, গত বছরের আগস্টে জিরো লাইনে আসার পর একবার পানিতে এই এলাকা তলিয়ে গেলে রোহিঙ্গারা চরম কষ্টের মধ্যে পড়ে। সে সময় কয়েকবার এলাকাটি তুমব্রু খালের পানিতে তলিয়ে যায়।
তবে এবার কিছু মাচাং ঘর তৈরি করে দেয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্যে সুবিধা হয়েছে। মাঝে মধ্যে মিয়ানমার সৈন্যরা জিরো লাইনের কাছে ফাঁকা গুলি করে। এতে রোহিঙ্গাদের আতঙ্কে দিন কাটে। সীমান্ত পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে বলে জানান টহলরত বিজিবি সদস্যরা। এদিকে গতকাল (১০ আগস্ট) সরেজমিন বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে ও রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বৃষ্টি আর বাতাসে জবুথবু অবস্থা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। থেমে থেমে বৃষ্টি আর বাতাসের কারণে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা। বর্ষার এই সময়ে বৃষ্টি আর বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় অনেক পরিবার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়ে।
দু চালা ঘর ও ত্রিপলের ছাউনিতে অতি কস্টে রাত ও দিন পার করছে তারা। বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প ডি ১৩ ব্লকের ৭০ বছরের বৃদ্ধা সোনা মেহের নামের এক রোহিঙ্গা নারী জানান, মিয়ানমার সেনারা তার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছে। তিন ছেলে ও তাদের স্ত্রী এবং নাতিসহ তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১৩ জন। বৃষ্টি আর বাতাসে তাদের খুব কষ্ট পোহাতে হয়েছে। মংডু বলিবাজার এলাকার শুকতারা (২৫)ছালামা খাতুন (২৭) নুর হোসেন (২২) হামিদ হোসেন (৩০) এদের সাথে কথা হলে তারা প্রত্যেকে জানান, ডাব্লিউএফপি আমাদের চাউল, তেল ও ডাল দিয়ে সহায়তা করছে ঠিকই কিন্তু আমাদের তো বাজার করে দিচ্ছে না কেউ। তাই অল্প অল্প করে জমিয়ে চাউল বিক্রি করে মাছ ও তরিতরকারি কিনে খেতে হয়। সামনে কোরবান আমাদের ভাগ্যে কী আছে তা আল্লাহই ভাল জানেন। তারা আরো জানান, বৃষ্টি আর বাতাসের সময় আল্লাহকে স্বরণ করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসেছিলাম। তাদের ঘর পাহাড়ের একদম ঢালুতে। তাই যে কোনো মুহুর্তে মাটি পড়ে ঘর ভেঙ্গে পড়তে পারে। বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মাটি ঘরে ঢুকে পড়ে। তখন ঘরের মধ্যে কাদা মাটিতে একাকার হয়ে যায়। ঘরে থাকার উপায় থাকে না।


আরো সংবাদ