২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

স্বদেশে ফিরতে চায় না রোহিঙ্গারা

স্বদেশে ফিরতে চান না রোহিঙ্গারা
স্বদেশে ফিরতে চান না রোহিঙ্গারা - ছবি : সংগৃহীত

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) সংস্থার সাক্ষাৎকার দিতে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়।

মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) দুপুর দেড়টার দিকে টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে নির্ধারিত স্থানে সাক্ষাৎকার দিতে আসেন আট-দশ জন রোহিঙ্গা।

সবাই জানিয়েছেন, এখনই তারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে চান না। ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের জন্য ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। স্বেচ্ছায় যারা মিয়ানমারে যেতে ইচ্ছুক তাদের প্রত্যাবাস করা হবে। জোর করে কাউকে পাঠানো হবে না বলে কর্মকর্তারা আশ্বস্থ করেছেন।

এজন্য কাজ করছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ‘ইউএনএইচসিআর’ এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়। এজন্য টেকনাফের কেরানতলীতে একটি ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় আরেকটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে।

এদিকে এরইমধ্যে রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ মিয়ানমারে ফিরতে অনীহা প্রকাশ করেছে। সাক্ষাৎকার দিয়ে বের হয়ে আসার পর আবু সিদ্দিক নামের এক রোহিঙ্গা জানান, ‘যতদিন আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হবে, ততদিন আমরা মিয়ানমারে যাবো না। আমাদের জায়গা-সম্পত্তি যা ছিল, তা ফিরিয়ে দিলে তবেই আমরা যাবো। ওখানে এখনো অত্যাচার চলছে। মিয়ানমারে আমাদের ওপর নির্যাতনের বিচার করতে হবে, আমাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে। এরপরই আমরা সেখানে ফেরত যাবো। এই কথাই আমরা সাক্ষাৎকারে বলেছি।’

একই ক্যাম্পের আরেকজন রোহিঙ্গা মোহাম্মদ আমিন বলেন, ‘আমরা অনেক দুঃখ-কষ্ট স্বীকার করে বাংলাদেশে এসেছি। আমাদের নির্যাতন করা হয়েছে। মা-বোনদের নির্যাতন করা হয়েছে। আমাদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। জমি কেড়ে নেয়া হয়েছে। এই অত্যাচার, নির্যাতেনের বিচার করতে হবে। আমাদের সবকিছু ফিরিয়ে দিতে হবে। নিরপত্তা দিতে হবে। তাহলে আমরা যাবো, না হলে যাবো না।'

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা এক রোহিঙ্গা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘সকালে ইউএনএইচসিআর ও ক্যাম্প ইনচার্জের প্রতিনিধিরা ঘরে এসেছেন। তারা বলেছেন তালিকায় আমার পরিবারের নাম রয়েছে, সাক্ষাৎকার দিতে বিকালে ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য বলেছেন। কিন্তু আমরা মিয়ানমারে ফেরত যাবো না। যেদেশ থেকে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে এসেছি, সেখানে ফিরে যেতে চাই না। নির্যাতনের বিচার পেলেই কেবল ফিরে যাবো।’

নয়াপাড়া শালবাগান ক্যাম্পের (নং-২৬) রোহিঙ্গা হেড মাঝি বলেন, সম্প্রতি মিয়ানমারের এক প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা শিবিরে পরিদর্শনে এসেছিলেন। তাদের সাথে আমাদের কথা হয়। আমরা ৪টি শর্ত ছুড়ে দিয়ে ছিলাম। এছাড়া আমাদের সাথে ডায়ালগ করার কথা রয়েছে। এসব বিষয় সম্পন্ন না হতে রোহিঙ্গারা ফিরবেনা বলেও জানান তিনি।

একাধিক রোহিঙ্গা নেতা ও সাধারণ রোহিঙ্গারা জানান, তাদের পক্ষ থেকে পুনরায় তাদের ন্যায্য অধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এরমধ্যে নাগরিকত্ব প্রদান, নিজ ভিটে জমি ফিরিয়ে দেওয়া, মিয়ানমারে আটককৃতদের মুক্তি, হত্যা, গনধর্ষণ ও বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগের বিচারের দাবী রয়েছে। এসব দাবী পূরণ হলে স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরবে রোহিঙ্গারা।

এছাড়া ক্যাম্প ইনচার্জের পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। এসব লিফলেট বার্মিজ ভাষায় লিখা রয়েছে। লিফলেট সমূহে প্রত্যাবসনের পর এনভিসি কার্ডের মাধ্যমে ছয় মাস পরে নাগরিকত্বের জন্য আবেদনের কথা বলা রয়েছে জানান রোহিঙ্গারা।

টেকনাফের জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচাজ মোহাম্মদ খালেদ হোসেন জানান, আজ সকাল থেকে মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার বিষয়ে মতামত জানানোর কথা ছিল তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে নির্ধারিত স্থানে সাক্ষাৎকার দিতে আসেননি তাদের কেউ। পরে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা তাদের সাক্ষাৎকার দিতে আসার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা করেন। দুপুর দেড়টার পর আট থেকে দশ জন সাক্ষাৎকার দিতে আসেন।

তিনি আরও জানান, যারা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তাদের সবাই মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার বিষয়ে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে সাক্ষাৎকার ঘিরে শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর দেখা গেছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট রাখাইনের ৩০টি নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। পুরনোসহ উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি শিবিরে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

২০১৭ সালে রাখাইনে জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়।


আরো সংবাদ