১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আসামীরা প্রকাশ্যে, আদৌ কি বিচার পাবে শারমিনের পরিবার?

নিহত শারমিন আক্তার মিনু। (মাঝে) আত্মহত্যার আগে শারমিনের লিখে যাওয়া সুইসাইড নোট এবং (ডানে) অভিযুক্ত বখাটে তারেক - নয়া দিগন্ত

বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহননকারী চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার ফরিদ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী শারমিন আক্তার মিনুর মায়ের কান্না আজও থামেনি। ঘটনার ৪ বছর অতিবাহিত হলেও জাল জালিয়াতির মাধ্যমে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছে মামলার মূল আসামী মমিন হোসেন তারেকসহ অন্যরা। পুলিশের পক্ষপাতদুষ্ট অভিযোগ গঠনের কারণে দফায় দফায় তদন্ত কার্যক্রম পরিবর্তন ও আসামী পক্ষের হুমকি-ধমকির ফলে সন্তান হারানোর বিচার চেয়ে ভীতিকর জীবন কাটাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বাদী পরিবার।

জানা যায়, ২০১৫ সালের ২০ আগস্ট শাহরাস্তি উপজেলার আয়নাতলী ফরিদ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী শারমিন আক্তার মিনু বিদ্যালয়ে বিরতির সময় শ্রেণিকক্ষে সহপাঠী বখাটে তারেকের দ্বারা উত্ত্যক্তের শিকার হয়। পরবর্তীতে উত্ত্যক্তকারী তারেকের পরিবারের সদস্যদের হাতে আবারো নাজেহাল হয়ে ক্ষোভে-অপমানে আত্মহত্যা করে শারমিন। ওই ঘটনার পর ৪ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো বিচার না হওয়ায় হতাশ শারমিনের মা শাহিদা বেগম। তবে তিনি এখনো রয়েছেন ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায়।

সরেজমিনে গত মঙ্গলবার হাঁড়িয়া গ্রামে নিহত শারমিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সুনশান নীরবতার মাঝেই চলছে শারমিনের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজন। প্রিয়জন হারানো স্বজনরা ৪ বছরেও ভুলতে পারেননি সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি। সাংবাদিকদের দেখেই দীর্ঘদিনের চাপা কান্না বাঁধ ভেঙ্গে উপচে পড়ে তাদের। পাশে উপস্থিত এলাকার ২/১ জন আড়ালে গিয়ে অশ্রু সংবরণ করছে।

কথা হয় শারমিনের মায়ের সাথে। সংবাদকর্মীদের দেখেই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। শারমিনের ডাক নাম মিনু। কান্না জড়িত কণ্ঠে মিনুর মা বলেন, আমি রাস্তায় বের হই না, স্কুল ড্রেস পরা মেয়েদের দেখলে আমার কলিজা ফেটে যায়। বিকেল হলেই মনে হয় দলবাঁধা মেয়েদের সারি হতে ছুটে এসে স্কুল ব্যাগ খাটে ছুঁড়ে মিনু আমায় ডাকছে- “মা, খেতে দাও” সে আশায় আজো তার পথ চেয়ে আছি। আমি একটু বিচার চেয়েছি, তাও আজ এটা, কাল ওটা। দোষীদের শাস্তি দেখলে আমার মিনুর আত্মা শান্তি পাবে। যাদের কারণে আমার মেয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো আমি তাদের বিচারের আশায় রয়েছি।

মিনুর বড়ভাই প্রবাসী শাহজাহান সোহাগ মোবাইল ফোনে জানান, আমরা ৫ ভাইয়ের একমাত্র বোন মিনু। অনেক স্বপ্ন নিয়ে তাকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলাম মানুষের মতো মানুষ বানাতে। সেই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও ক্যাম্পাসে নিষ্ঠুর পৃথিবীর মানুষরূপী কিছু অমানুষের অমানবিক আচরণের কারণে পৃথিবী ছাড়তে হয় তাকে। চার বছরেও মায়ের চোখের জল শুকায়নি, ন্যায্য বিচার পাওয়ার আশায় প্রতিটি প্রহর গুণছেন তিনি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। আর অপরাধীরা দিব্যি চোখের সামনে ঘুরাফেরা করছে। চার বছরে মামলা তুলে নিতে অনেক অনুরোধ, হুমকি ও প্রলোভন পেয়েছি অথচ শুণ্য বুকের হাহাকার মিটানোর জন্য এতোটুকু সান্ত্বনা দেবার মতো কাউকে পাইনি।

জানা যায়, উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের পন্ডিত বাড়ির প্রবাসী মোহাম্মদ আলীর মেয়ে শারমিন আক্তার মিনু। তাকে প্রায়ই প্রেম নিবেদন ও উত্যক্ত করতো সহপাঠী একই ইউনিয়নের সংহাই গ্রামের প্রবাসী আবু তাহেরের ছেলে তারেক। তারেক কোনোভাবে মিনুকে প্রেমে রাজি করতে না পেরে মা রূপবান বেগম ও বোন কনিকাকে সহযোগিতা করতে বলে।  এ ব্যাপারে ঘটনার ৩ দিন আগে ২০১৫ সালের ১৭ আগস্ট সোমবার বিকেলে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোঃ ইসমাইল হোসেনের নিকট শারমিনের ছোট ভাই নয়ন মৌখিক ভাবে একটি অভিযোগ দেয়। ২০ আগস্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের উপস্থিতিতে ইংরেজি ক্লাস চলাকালে রূপবান বেগম ক্লাসের ভেতরে ঢুকে মিনুকে দাঁড় করায়। পরে তার ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার পরামর্শ দেয়। এ প্রস্তাব মিনু প্রত্যাখ্যান করলে তারা মিনুকে অকথ্য ভাষায় বিভিন্ন প্রকার গালিগালাজ করে। পরে বিরতির সময় রূপবান বেগমের সাথে তার মেয়ে কনিকা এসে আরো অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে। ওই সময় তারেক মিনুকে চড় মারে ও মুখে থুতু দেয়। উপস্থিত অন্যান্য সহপাঠীদের সামনে অপমানিত হয়ে রাগে ক্ষোভে স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে যায় মিনু।

এরপর তাদের বসত ঘরের নিচ তলায় ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে সে। পরিবারের সদস্যরা তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মিনুর আত্মহননের পর তার ঘর হতে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করে পুলিশ। যাতে লেখা ছিলো- ‘মা, ভাইয়া, আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু নিষ্ঠুর পৃথিবীর মানুষেরা আমাকে বাঁচতে দিল না। আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী তারেক, তারেকের মা ও তার বোন কণিকা। আমার মৃত্যুর প্রতিশোধ তোমরা নিও।’

ঘটনার পর মিনুর ভাই শাহাবুদ্দিন নয়ন ৫ জনের নাম উল্লেখ করে শাহরাস্তি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় কেবল অভিযুক্ত তিনজনের মধ্যে বখাটে তারেককে গ্রেফতার করা হয়। মামলার বাদি শাহাবুদ্দিন নয়ন জানান, ধূর্ত তারেকের পরিবার অর্থের বিনিময়ে বয়স কমিয়ে ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করে। তাতে তারেকের বয়স দেখানো হয় ১৭ বছর ৫ মাস ১২ দিন। অথচ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসাপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (রেডিওলজি) ডা. এম মাঈন উদ্দিনের মেডিকেল রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী তারেকের বয়স ২০ বছর। এই ভুয়া জন্মসনদ দিয়ে তারেককে অপ্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে ৩২ দিন কারাবাস শেষে প্রতারণামূলক তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে তার জামিন নেয়া হয়। কিন্তু মিনুর আত্মহত্যায় প্রধান প্ররোচনাকারী বখাটে তারেকের মা রূপবান বেগম ও তার বোন কনিকাকে আজও আটক করা হয়নি।

মিনুর আত্মহননের ৩ দিন পর লিখিত ভাবে প্রতিবেদন দাখিল করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ সিদ্দিকুর রহমান পাটওয়ারী। তার প্রতিবেদনে ইভটিজিংয়ের কোন ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি। ২৩ আগষ্ট ২০১৫ তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আলী আশ্রাফ খানের নিকট ওই প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে তারেক, তার মা রূপবান বেগম ও বোন কনিকার অপরাধ আড়াল করে বিদ্যালয়ে ইভটিজিংয়ের কোন ঘটনা ঘটেনি এবং শারমিন ও তার অভিভাবক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট ইভটিজিং অথবা কোন উশৃঙ্খল আচরণের জন্য তারেকের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি মর্মে উল্লেখ করা হয়।

ভিকটিমের পরিবার আরো জানায়, দক্ষিণ সূচীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে বখাটে আচরণের দায়ে বহিষ্কার হওয়া তারেককে কোন প্রকার ছাড়পত্র (টিসি) ছাড়াই এ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে প্রধান শিক্ষক। ওই ঘটনায় অপরাধীকে বিদ্যালয় হতে বহিষ্কার না করে তার শিক্ষাজীবন অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রধান শিক্ষকের প্রচেষ্টায় লাকসামের একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। জাতির বিবেক খ্যাত শিক্ষকের অপরাধীদের সাথে এমন সখ্যতা ও অপরাধী পরিবারকে বাঁচাতে তার এই কর্মকাণ্ডে একজন শিক্ষকের পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ওই মামলায় শাহরাস্তি মডেল থানার তৎকালীন এসআই মোঃ নিজাম উদ্দিন ২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর তারেক ও তার মা রূপবান বেগমকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র প্রেরণ করে। এতে মামলা থেকে ৩ জন আসামীর নাম বাদ দেয়া হয়। তারা হলো- মৃত আব্দুল জলিলের পুত্র তারেকের বন্ধু আবু রায়হান, ছালেহ আহমেদের পুত্র মোঃ শামীম হোসেন ও তারেকের বোন নুরুন্নাহার আক্তার কনিকা। এরপর গত ৩১ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে অভিযোগ পত্রে তদন্ত কর্মকর্তা পক্ষপাতদুষ্ট তদন্ত করেছেন মর্মে তার দাখিলকৃত চার্জশীটের উপর নারাজি আবেদন করেন বাদিপক্ষ।

এরপর গত ১৬ মার্চ ২০১৬ তারিখ নারাজি আবেদন মঞ্জুর হয়ে মামলাটি বিজ্ঞ আদালত সিআইডিতে প্রেরণ করে। সিআইডি পুনঃতদন্ত শেষে গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিলে আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) আবারো তদন্তের নির্দেশ দেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২০১৭ সালের নভেম্বরে বর্তমানে মামলাটি দুভাগে দুটি চার্জশিট প্রদান করে (যা ৬.১৮ ও ৯.১৮)। এতে তারেক, তার মা রূপবান বেগম ও বোন কণিকাকে আসামী করা হয়। তিন আসামির বিরুদ্ধে আদালত কর্তৃক চার্জগঠন হয়েছে। যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

মিনুর ভাই মামলার বাদি শাহাবুদ্দিন জানান, জামিনে এসে তারেক ও তার মা তাকে প্রতিনিয়ত তাদেরকে হুমকি দিয়ে আসছে। আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারেক জামিন নিয়েছে, তার মা ও বোন প্রকাশ্যে ঘুরছে। তারা জনসম্মুখে বলে বেড়াচ্ছে, মামলা শেষ হয়ে গেছে, কোনো কিছুই হবে না।

শাহাবুদ্দিন আরো জানান, নিজের বোন হারানোর ঘটনার বিচার চেয়ে এখন নিজের জীবন নিয়ে নিজেই শঙ্কায় রয়েছি। ইভটিজিং ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সরকার ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করলেও জামিনে এসে বখাটে তারেক ও অন্য আসামীরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা ও বাদি পরিবারের সদস্যদের মামলা তুলে নেয়ার হুমকি মিনুর মায়ের বিচার পাওয়ার আশা ক্ষীণ করে তুলেছে। ওই ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে স্থানীয়রা।


আরো সংবাদ

ভালো অবস্থানে ইংল্যান্ড ছাত্রলীগের চাঁদাবাজীর খবর টক অব দ্য কান্ট্রি : রিজভী কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের সাথে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি রয়েছে : ইমরান খান মাসিক বেতনের ভিত্তিতে চালক নিয়োগ দিতে নির্দেশ হাইকোর্টের খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে পোস্টার লাগালেন রিজভী মেসির ছোঁয়ায় দ্যুতি ছড়াচ্ছেন সেই আনসো থানায় সেবা নিতে যাওয়া কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয় : নতুন ডিএমপি কমিশনার আজ আফগানিস্তানের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ দেশের চলমান দুর্নীতির মহড়া ভোটবিহীন নির্বাচনের ফসল : চরমোনাই পীর শহর ফরিদপুরে নিষিদ্ধ হচ্ছে ইঞ্জিনের রিকশা চলাচল রাব্বানীর বিরুদ্ধে এবার জবি ছাত্রলীগ নেতার অভিযোগ

সকল