২৪ অক্টোবর ২০১৯

ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশে হলেও অসত্য বক্তব্য ভারতের

ফেনী নদী
ফেনী নদী - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের অন্যতম ও এ সময়ের বহুল আলোচিত ফেনী নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশে। ভারত অযথা নদীটির উৎপত্তিস্থল তাদের দেশে দাবি করছে। দীর্ঘ সময় ধরে নদীর মিরসরাইয়ের মুহুরী প্রকল্প থেকে খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার আচালং এলকার ভগবান টিলা (বি টিলা) পর্যন্ত অনুসন্ধান করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বলা হতো, ফেনী নদী আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশ ও ভারতকে বিভক্তকারী এই নদীর উৎপত্তি ত্রিপুরা রাজ্যে। অথচ অনুসন্ধানে প্রমাণ হয়, এটি বাংলাদেশের সম্পদ। এর উৎপত্তি মাটিরাঙ্গার ভগবানটিলায়। নদীর ১০৮ কিলোমিটারের কোনো অংশ ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেনি।
সরেজমিন দেখা যায়, মিরসরাইয়ের আমলীঘাট সীমান্তে পাইপ বসিয়ে ভারতের উপেন্দ্রনগরের জন্য পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। রামগড়ের অদূরে সাবব্রুম শহরের পানির সঙ্কট মেটাতে ১৭টি পাইপ বসিয়ে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে অনবরত। নদীর বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেশিন দিয়ে পানি নিচ্ছে ভারত। এ ছাড়া আচালং মৌজায় এক হাজার ৭০০ একর জমি ভারত বেদখল করে রেখেছে।

ফেনী নদী সর্ম্পকে জানতে যাওয়া হয় ফরিদপুরে বাংলাদেশের একমাত্র পানি গবেষণা ইনস্টিটিউটে। আশানুরূপ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নদীর মুহুরী প্রকল্প থেকে ধুমঘাট-আমলীঘাট, রামগড়, পিলাক নদীর পার, মাটিরাঙ্গা আচালং, তাইন্দং এবং সবশেষ ভগবান টিলায় গিয়ে নদীর উৎপত্তিস্থল পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া থেকে শুরু করে একাধিক ভূ-চিত্রাবলীতে এই নদী নিয়ে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এর দূরত্ব নিয়েও নানা রকমের গরমিল রয়েছে এসব গ্রন্থে। বাংলাদেশের অনেক উপনদী, খাল-ছড়া মিলিত হয়েছে ফেনী নদীতে। সেদিক দিয়েও ভারত পিছিয়ে। ফেনী নদীর পানির বেশির ভাগ উৎস বাংলাদেশ। অথচ এই সময়ে আচালং থেকে আমলীঘাট পর্যন্ত প্রায় ৮৬ কিলোমিটারের কোথাও বাংলাদেশীরা নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না। একমাত্র ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ আখ্যা দিয়ে বিএসএফ তটস্থ করে রেখেছে আমাদের সীমান্ত রক্ষী থেকে শুরু করে সাধারণ বাসিন্দাদের। তারা দিব্যি দিনের আলোতেই পানি ‘চুরি’ করে নিচ্ছে। ফেনী নদীর ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। অনেকে মনে করেন, ভারতীয় আগ্রাসন বন্ধ না হলে কিংবা গত শনিবার ভারতের সাথে করা পানি চুক্তি আলোর মুখ দেখলে লাখো মানুষের ভাগ্যাকাশ অমানিশায় ঢেকে যাবে।

পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতিরা বলছে ফেনী নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশে। তারা বলেছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় শ্রেণী নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটিরাঙ্গা ও পানছড়ি উপজেলার মধ্যবর্তী ভগবানাটিলা নামের একটি পাহাড় থেকেই এ নদীর যাত্রা শুরু। পাহাড়ের ছড়া থেকে উৎপত্তির পরপরই নদীটি বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে ভারতের ইজেরা গ্রামে প্রবেশ করে। ইজেরা গ্রাম থেকেই নদীটি ফেনী নদী নামে পরিচিত। দুই দেশের সীমান্ত ঘেঁষে বেশ কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর নদীটি মিরসরাইয়ের আমলীঘাট এক নম্বর করেরহাট ইউনিয়ন দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী উপজেলা ছুঁয়ে মিলিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে।

জানা গেছে, ভারত এ নদীর উৎপত্তি ত্রিপুরা রাজ্যের পর্বত শ্রেণী থেকে হয়েছে বলে দাবি করছে। উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ ত্রিপুরা থেকে উৎপত্তি হওয়ার পর ফেনী নদী ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম হয়ে বংলাদেশে ঢুকেছে। এমনকি বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়, ফেনী নদী ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে প্রবাহিত হয়ে আলীগঞ্জ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে সীমান্তরেখা ৗৈতরি করেছে। এরপর সমতলে নেমে এসে নদীটি চট্টগ্রাম থেকে নোয়াখালীকে আলাদা করে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। ফেনী নদীর প্রবাহপথ চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের আমলীঘাট থেকে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং ইউনিয়নের আচালং সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় স্থানীয় লোকজন জানায়, নদীটির উৎস প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে। জানা গেছে, মাটিরাঙ্গা ও পানছড়ি উপজেলার মধ্যবর্তী ভগবানটিলা নামের পাহাড় থেকে এ নদীর প্রবাহ শুরু।

ফেনী নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত বিরোধ দীর্ঘ দিনের। এবার নদীর পানি চুক্তির কারণে ভারত সব পানি নিয়ে যেতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের নাগরিকরা ফেনী নদীর পানি ছুঁতে গেলেও বাধা দেয় ভারতীয় সীমান্তরী বাহিনী (বিএসএফ)। নো ম্যানস ল্যান্ড আখ্যা দিয়ে বিএসএফ বাংলাদেশীদের এ নদীর পানি ব্যবহার করতে বাধা দিচ্ছে। অথচ ভারতীয়রা দিব্বি ব্যবহার করছে নদীর পানি।

খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম ফরহাদ দাবি করেন, ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল দেশের অভ্যন্তরেই। মাটিরাঙ্গা সদর থেকে ৫৫ কিলোমিটার পূর্বে আচালং তাইন্দং এলাকার কাছাকাছি থেকে নদীর যাত্রা শুরু হয়েছে। রামগড় সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল কাদেরসহ অনেকে জানান, ফেনী নদীর উৎপত্তি মাটিরাঙ্গা-পানছড়ির মধ্যবর্তী ভগবানটিলায়।

মিরসরাই পানিসম্পদ উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা: মো: জামসেদ আলম বলেন, আমরা অনুসন্ধানে জেনেছি, ফেনী নদীর উৎপত্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে। সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে নদীটি রামগড়, মিরসরাই, সোনাগাজী ছুঁয়ে মিলেছে বঙ্গোপসাগরের সাথে। তিনি বলেন, ফেনী নদীর উৎসসহ বেশির ভাগ অংশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হওয়ায় এর পানি এ দেশের উন্নয়নেই ব্যবহার করা উচিত। ভারতের সাথে ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তি হওয়ায় দেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম সেচ প্রকল্প মিরসরাইয়ের মুহুরী প্রকল্প একদিন পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে। ভারত তাদের দেশে নদীর উৎপত্তি বলে চরম মিথ্যাচার করছে।


আরো সংবাদ

সকল